• শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
প্রতিবাদ-বিক্ষোভে অচল ঢাকা

শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষর্থী বাসচাপায় নিহত হওয়ার প্রতিবাদে তৃতীয় দিনের মতো মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। কোথাও কোথাও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে, পুলিশও শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয়

ছবি : বাংলাদেশের খবর

জাতীয়

বাস ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ ষ শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও পুলিশ

প্রতিবাদ-বিক্ষোভে অচল ঢাকা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ০১ আগস্ট ২০১৮

রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের কুর্মিটোলায় বাসের রেষারেষিতে দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল মঙ্গলবার তৃতীয় দিনও উত্তাল ছিল রাজপথ। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এ দিন রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করলে কার্যত অচল হয়ে যায় রাজধানীর সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডা, সায়েন্স ল্যাব, কাকরাইল, মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়কে যান চলাচল কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকে।

ঘাতক বাসচালকের দ্রুত বিচার, নৌপরিবহনমন্ত্রীর পদত্যাগ, নিরাপদ সড়কসহ ৯ দফা দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এ দিন ৩টি বাস পুড়িয়েছে, ভাঙচুর করেছে কমপক্ষে ১০টি বাস। রাজপথে শিক্ষার্থীদের অবরোধে দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত কার্যত অচল হয়ে পড়ে নগরী। এরপরও তেমন বাস না ছাড়ায় দুর্ভোগে পড়ে নগরবাসী। বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনরত কলেজ শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ।

এ দিন বেলা ১১টার দিকে ফার্মগেটে সড়কে অবরোধ করে সরকারি বিজ্ঞান কলেজের শিক্ষার্থীরা। ফার্মগেট ওভারব্রিজের নিচে শিক্ষার্থীদের অবস্থানের কারণে প্রায় ২ ঘণ্টা কারওয়ান বাজার

 থেকে বিজয় সরণির দুই পাশে যান চলাচল বন্ধ ছিল। বেলা সাড়ে ১১টায় মিরপুর-১ নম্বর সড়কে অবস্থান নেয় ঢাকা কমার্স কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা দুটি বাসে ভাঙচুর চালায়। মিরপুর-১০ নম্বর চত্বরে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করে। এতে মিরপুর, কাফরুল, আগারগাঁও, পল্লবী, টেকনিক্যাল ও গাবতলী এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বেলা ১১টায় রাজধানীর বিমানবন্দর সড়ক (র্যাডিসন ব্লু হোটেলের সামনে) অবরোধ করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এ সময় বনানী-উত্তরা ও মিরপুর-আবদুল্লাহপুর রুটে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তার উভয় প্রান্তে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। প্রায় ৬ ঘণ্টা পর আশ্বাসের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে নেয়।

উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের শিক্ষার্থীরা দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কাকরাইল মোড়ে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করে এবং একটি বাসে ভাঙচুর চালায়। পুলিশের রমনা বিভাগের ডিসি মো. মারুফ হোসেন সরদার জানান, তারা বুঝিয়ে শিক্ষার্থীদের রাস্তা থেকে সরিয়ে নেন। পরে তারা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করে।

দুপুর ১টার দিকে নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামে। প্রথমে নিজেদের কলেজের সামনের রাস্তায় নেমে তারা যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। পরে শাপলা চত্বরে গিয়ে সেখানে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। এতে সেখানে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশের মতিঝিল বিভাগের সহকারী কমিশনার মিশু বিশ্বাস জানান, পুলিশ দোষী চালকদের গ্রেফতার ও বিচারের মুখোমুখি করার আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থীরা বিকাল দুপুর ২টার দিকে শাপলা চত্বর ত্যাগ করে। কিন্তু তারা চলে যাওয়ার সময় কমলাপুরের দিকে এক ছাত্র মারধরের শিকার হয়েছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়লে আবার উত্তেজনা তৈরি হয়। এ সময় কয়েক শিক্ষার্থী একটি বাসে ভাঙচুর করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ করে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

বাড্ডায় ইস্ট ওয়েস্ট ইউনির্ভাসিটির শিক্ষার্থীরা হাতিরঝিল সংলগ্ন সড়ক অবরোধ করে। তেজগাঁওয়ে নাবিস্কোর সামনে মানববন্ধন করেন সাউথ ইস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা। এ সময় সড়ক অবরোধ করে তারা বিক্ষোভ করে। সেখানে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা ঘটেনি। কাফরুল এলাকায় শহীদ স্মৃতি পুলিশ কলেজের শিক্ষার্থীরা দুপুরে রাস্তা অবরোধ করতে চাইলে তাদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। এ সময় পুলিশের লাঠিচার্জে এক ছাত্র আহত হয়।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর সায়েন্সল্যাব এলাকায় সড়ক অবরোধ করে সিটি কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা। দুপুর দেড়টার দিকে ধানমন্ডি সিটি কলেজের সামনে হিমাচল পরিবহনের একটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধরা। এ সময় পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। এ অবস্থায় সায়েন্সল্যাব, এলিফ্যান্ট রোড, নিউমার্কেট, নীলক্ষেত ও আশপাশের এলাকার যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় শিক্ষার্থীরা বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করে।

ঢাকা বিভাগের ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক দেবাশীষ বর্ধন বলেন, ‘বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বাসে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে যাওয়ার চেষ্টা করি। কাঁটাবন টহল টিমের একটি গাড়ি আগুন নেভাতে যাওয়ার চেষ্টা করলে ছাত্রদের ব্যারিকেডের কারণে সম্ভব হয়নি।’ ধানমন্ডি থানার ওসি আবদুল লতিফ বলেন, ‘একটি বাসে আগুন দেওয়া ছাড়া এই এলাকায় তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।’

দুপুর ১টা থেকে উত্তরার কয়েকটি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা জসীম উদ্দীন মোড়ে অবরোধ করে। এ সময় পুলিশ ও র্যাবের সঙ্গে তাদের কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। অবরোধের ফলে উত্তরা-বিমানবন্দর সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে উত্তরা ইউনির্ভাসিটি, মাইলস্টোন কলেজ, স্কলাসটিকাসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এনা ও বুশরা পরিবহনের দুটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে পুলিশ লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ফায়ার সার্ভিসের ডিউটি অফিসার রাসেল সিকদার জানান, ‘আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের দুটি টিম গেলেও বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বাধা দেয়।’ একই সময় উত্তরার হাউজ বিল্ডিং এলাকায় বিজিএমইএ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পাঁচটি বাস এবং একটি পিকআপে ভাঙচুর করে।

বাস নামাননি মালিকরা : শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে সড়ক আটকে থাকায় রাজধানীবাসীর চলাচল যেমন আটকে গেছে; অন্যদিকে গণপরিবহন না পেয়েও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এ দিন দুপুর থেকে ঢাকার বিভিন্ন সড়কে বাসের সংখ্যা কমে যায়। মিরপুর, শ্যামলী, মহাখালী, বিজয় সরণি, উত্তরা, ফার্মগেট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, হাজার হাজার মানুষ বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। কয়েকটি বাস এলেও তাতে সবাই উঠতে পারছেন না।

দুপুরে মহাখালী ফ্লাইওভারের পাশে উত্তরার বাসের অপেক্ষায় থাকা মো. আবদুল্লাহ বলেন, ‘অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো বাস পাচ্ছি না।’ দুপুরের পর গণপরিবহন কম থাকায় রাস্তাও ছিল অনেকটা ফাঁকা। মিরপুরের বাসিন্দা আশরাফুল আলম বলেন, ‘অন্যান্য দিন গাড়িতে মিরপুর থেকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় যেতে কয়েক ঘণ্টা লাগে। আজ (মঙ্গলবার) মাত্র ২০ মিনিটে বসুন্ধরায় পৌঁছালাম।’

বাস কম থাকার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব এনায়েত উল্লাহ খান বলেন, ‘সড়কে বাস বের করলেই সেগুলো ভাঙচুর করা হচ্ছে। এজন্য সকালে বাস বের হলেও নিরাপত্তার কারণে ওগুলো রাস্তা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভয়ে চালকরা রাস্তায় বাস বের করতে চাচ্ছেন না।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, ‘শিক্ষার্থী মৃত্যুর ঘটনায় আমরাও দুঃখ প্রকাশ করছি, যারা এই ঘটনায় জড়িত তাদের বিচার আমরাও চাই। তাই বলে রাস্তায় কোটি কোটি টাকার গাড়ি বের হলেই সেটা ভাঙবে, এটা কেমন কথা? প্রশাসনও তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।’ সকাল থেকে উত্তরা, ঢাকা কলেজের সামনে, শ্যামলী ও স্টাফ রোডে বহু গাড়ি ভাঙা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

গত রোববার বিমানবন্দর সড়কের কুর্মিটোলা এলাকায় জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর উঠে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই শহীদ রমিজ উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম মিম ও একই কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম নিহত হন। এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মাঝে আহতদের চিকিৎসার সব ব্যয় বহন করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। গত সোমবার রাতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এ কথা জানান।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads