• মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
চামড়া শিল্প নগরীতে নেই সলিড বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

কোরবানির পশুর চামড়া

সংলক্ষিত ছবি

জাতীয়

চামড়া শিল্প নগরীতে নেই সলিড বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

মুক্তি মিলছে না পরিবেশ দূষণ থেকে

  • কাওসার আলম
  • প্রকাশিত ২৭ আগস্ট ২০১৮

হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে সাভার চামড়া শিল্প নগরী গড়ে তোলা হলেও এখানকার কারখানার সৃষ্ট সলিড (কঠিন) বর্জ্যের কোনো ধরনের ব্যবস্থাপনা নেই। সাময়িক ব্যবস্থাপনা হিসেবে সলিড বর্জ্য চামড়া শিল্প নগরীর ডাম্পিং ইয়ার্ড এলাকায় ফেলা হচ্ছে। এতে ওই এলাকা দুর্গন্ধময় হয়ে পড়েছে এবং তা আশপাশে ছড়িয়ে পড়েছে, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতি সৃষ্টি করছে। এ অবস্থায় সলিড বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা না গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, চামড়া কারখানা থেকে স্ল্যাজ ও তরলজাতীয় বর্জ্যের পাশাপাশি সলিড বর্জ্য সৃষ্টি হয়। স্ল্যাজ ও তরল বর্জ্য পরিশোধনে সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণ করা হয়েছে। নানা জটিলতা শেষে বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে সিইটিপি চালু হয়েছে। কিন্তু কারখানা থেকে উৎপাদিত কঠিন বর্জ্য (যথা- কান, লেজ, শিং, লোম, হাড়, চামড়ার কাটপিস, কাঁচা চামড়ার সঙ্গে মাংসের ঝিল্লি ইত্যাদি) ব্যবস্থাপনার কোনো ব্যবস্থা নেই।

ভরা মৌসুমে সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার টন সলিড বর্জ্য উৎপাদিত হয়। অন্য সময়ে উৎপাদন হয়ে থাকে ৫০০ টন। বিপুল পরিমাণ সলিড বর্জ্য উৎপাদিত হলেও কোনো ব্যবস্থাপনা না থাকায় বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয়ে নির্মিত সিইটিপির কার্যকারিতা এবং পরিবেশবান্ধব চামড়াপণ্য উৎপাদনের বিষয়টি বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় সঠিকভাবে প্রকল্প প্রণয়ন করতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। এ কারণে চামড়া শিল্প নগরীর প্রকল্প তিন দফা সংশোধন করতে হয়েছে। তিনি আরো বলেন, প্রথমে শুধু চামড়া শিল্প নগরীতে প্লট নির্মাণ করে সেগুলো কারখানা মালিকদের বরাদ্দ দেওয়ার কথা ছিল। পরে কেন্দ্রীয়ভাবে বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণে প্রকল্প সংশোধন করা হয়। সিইটিপির সঙ্গে নর্দমার ময়লা পানি পরিশোধন ও কারখানার উৎপাদিত স্ল্যাজ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে তৃতীয় দফা প্রকল্প সংশোধন করা হয়েছে। কিন্তু স্ল্যাজ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি বাস্তবসম্মত নয় এবং এ ধরনের কোনো নজির কোথাও নেই। এ ধরনের একটি প্রকল্পের ডিজাইন ঠিকাদার জমা দিলেও তাতে সন্তুষ্ট হয়নি পরামর্শক কমিটি। ফলে উৎপাদিত কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাভার চামড়া শিল্প নগরীর কারখানার সলিড বর্জ্য উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি। ল্যান্ডফিলে সরিয়ে নিতে ভাড়া, ল্যান্ডফিল ব্যবহারে ভাড়া, বর্জ্যের ড্রেসিংসহ নানা ইস্যুতে আটকে যায় ওই সিদ্ধান্ত। সম্প্রতি একটি যৌথ পরিদর্শন দল আমিনবাজার ল্যান্ডফিল পরিদর্শন করে দেখতে পায়, সেখানে বর্জ্য ফেলার পর্যাপ্ত স্পেস নেই। ফলে আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে না সরিয়ে সলিড বর্জ্য এখন শিল্প নগরীর ডাম্পিং ইয়ার্ডে ফেলা হচ্ছে।

অবশ্য বিকল্প হিসেবে ট্যানারিগুলোর সলিড বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়া ও পুনর্ব্যবহার করে তা থেকে জেলটেইন, আঁঠা, সার উৎপাদনের মতো বাই-প্রোডাক্ট শিল্প স্থাপনেরও চিন্তা-ভাবনা চলছে। এ ধরনের শিল্প স্থাপন করা গেলে এতে যেমন পরিবেশ দূষণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে অন্যদিকে বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করা যাবে। এ ধরনের শিল্প স্থাপনে বেশ কয়েকটি কোম্পানির পক্ষ থেকে আগ্রহও প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু সাভারে যেসব চামড়া শিল্প মালিক প্লট বরাদ্দ পেয়েছেন তারা এজন্য কোনো জায়গা ছেড়ে দিতে রাজি নন। ফলে এটিও ঝুলে রয়েছে।

গত জুলাই মাসে শিল্প সচিবের উপস্থিতিতে শিল্প মন্ত্রণালয়ে চামড়া শিল্প নগরীর কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে রিসোর্স রিজেনারেশন বাংলাদেশ লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদল একটি বিশেষজ্ঞ উপস্থাপনা পেশ করে। বিশেষজ্ঞ দলটি সাভার চামড়া শিল্প নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নানা দুর্বলতা তুলে ধরে। বিশেষজ্ঞ দলটি তাদের মতামতে বলে, সিইটিপি ট্যানারিগুলো হতে নির্গত স্ল্যাজ ও তরল বর্জ্য পরিশোধনে কাজ করছে কিন্তু কঠিন বর্জ্য অস্থায়ীভাবে ডাম্পিং করা হচ্ছে। এই কঠিন বর্জ্যের মধ্যে পরিবেশের অত্যন্ত ক্ষতিকর ক্রোমিয়াম রয়েছে এবং এই কঠিন বর্জ্য দিয়ে মাছ বা খামারের মুরগির খাবার তৈরি করা হচ্ছে, যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। অথচ এ ধরনের বর্জ্য দিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন মূল্যবান উপজাত তৈরি করা সম্ভব। ভিয়েতনাম, ইতালি, পর্তুগালের উদাহরণ দিয়ে বিশেষজ্ঞ দলটি তুরাগ নদীর তীরে বেসরকারি উদ্যোগে একটি প্রতিষ্ঠান চালুর প্রস্তাব দেয়। অবশ্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রস্তাব জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়। কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো সে প্রস্তাব জমা পড়েনি।

রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্প কারখানা সরিয়ে নিয়ে পরিবেশসম্মত উপায়ে উৎপাদনে সহায়তার লক্ষ্যে ২০০৩ সালে সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরা এলাকায় প্রায় ২০০ একর এলাকায় ‘চামড়া শিল্প নগরী-ঢাকা’ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয় শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। তবে দেড় যুগ পেরিয়ে গেলেও এখনো পুরোপুরি সেই নগরী গড়ে তুলতে পারেনি বাস্তবায়নকারী সংস্থাটি। ইতোমধ্যে প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। হাজারীবাগ থেকে সাভারে কারখানা সরিয়ে নিতে শিল্প কারখানার মালিকরা মোটেও আগ্রহী ছিলেন না। নানা ধরনের অজুহাত তুলে বিলম্ব ঘটান তারা। অবশেষে উচ্চ আদালতের নির্দেশে হাজারীবাগের চামড়া কারখানার বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হলে বাধ্য হয়ে কারখানা সরিয়ে নেন মালিকরা। ১৫৪টি শিল্প প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে ১১১টি কারখানা উৎপাদন শুরু করেছে। 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads