• বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
সেবা খাতে দুর্নীতির শিকার সাড়ে ৬৬ শতাংশ

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে টিআইবির ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘সেবা খাতে দুর্নীতি : জাতীয় খানা জরিপ ২০১৭’-এর প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়

ছবি: বাংলাদেশের খবর

জাতীয়

সেবা খাতে দুর্নীতির শিকার সাড়ে ৬৬ শতাংশ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ৩১ আগস্ট ২০১৮

দেশের সেবা খাতগুলোতে সেবাপ্রত্যাশী জনগণের অর্ধেকেরই বেশি দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন। সেবা পেতে দিতে হচ্ছে ঘুষ। ২০১৫ সালের তুলনায় ঘুষ দেওয়ার হার কমলেও বেড়েছে সেবা খাতে ঘুষের টাকার মোট অঙ্ক। সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে সাড়ে ৬৬ শতাংশ শিকার হচ্ছেন দুর্নীতির। এ খাতে বেশি দুর্নীতির শিকার হচ্ছে দেশের গ্রামাঞ্চলের মানুষ। যাদের বেশিরভাগই নিরক্ষর ও নিম্ন আয়ের। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পরিচালিত এক খানা জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে টিআইবির ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘সেবা খাতে দুর্নীতি : জাতীয় খানা জরিপ ২০১৭’-এর প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।

গবেষণা প্রতিবেদন সমন্বিতভাবে উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. ওয়াহিদ আলম, প্রোগ্রাম ম্যানেজার ফারহানা রহমান ও ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোহাম্মদ নূরে আলম। টিআইবির জরিপে দুর্নীতির শীর্ষে এবার রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আর ঘুষ গ্রহণের দিক থেকে শীর্ষ রয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। টিআইবি প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী সেবা খাতগুলোর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থায় ৭২ দশমিক ৫, পাসপোর্ট অফিসে ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশ, বিআরটিএ’তে ৬৫ দশমিক ৪ শতাংশ, বিচারিক সেবায় ৬০ দশমিক ৫, ভূমি সেবায় ৪৪ দশমিক ৯, শিক্ষা (সরকারি ও এমপিওভুক্ত)  খাতে ৪২ দশমিক ৯ এবং স্বাস্থ্য খাতে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ সেবাগ্রহীতা দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন। তবে শুধু ঘুষ বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ বিবেচনায় সেবা নিতে গিয়ে বিআরটিএ খাতে সর্বাধিক খানা ৬৩ দশমিক ১ শতাংশ গ্রহীতা ঘুষের শিকার হয়েছেন। এরপর ঘুষ গ্রহণের ক্ষেত্রে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও পাসপোর্ট সেবা খাত। এই দুটো খাতে ঘুষ গ্রহণের হার যথাক্রমে ৬০ দশমিক ৭ ও ৫৯ দশমিক ৩ শতাংশ।

তবে খাতওয়ারি হিসেবে বিভিন্ন খাতে গ্রহীতা প্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ বিবেচনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। ২০১৭ সালের খাতওয়ারি হিসেবে গ্রহীতাপ্রতি গ্যাসের সেবা খাতে গড়ে ৩৩ হাজার ৮০৫ টাকা, বিচারিক সেবা খাতে ১৬ হাজার ৩১৪ টাকা, বীমা খাতে ১৪ হাজার ৮৬৫ টাকা, ভূমি সেবা খাতে ১১ হাজার ৪৫৮ টাকা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা খাতে ৬ হাজার ৯৭২ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। ঘুষ বা নিয়মবর্হিভূত অর্থ প্রদানের মূল কারণ হিসেবে ‘ঘুষ না দিলে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায় না’ এই কারণটি চিহ্নিত করেছেন টিআইবির জরিপে অন্তর্ভুক্ত ৮৯ শতাংশ সেবাগ্রহীতা। যে হার ২০১৫ সালে ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ। এর মাধ্যমে ধারণা করা যায় যে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ তুলনামূলক বৃদ্ধি পেয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে গ্যাস, কৃষি, বিচারিক সেবা, বিদ্যুৎ, বিআরটিএ, স্বাস্থ্য (সরকারি), বীমা ও এনজিও খাতে দুর্নীতি বৃদ্ধির বিপরীতে শিক্ষা (সরকারি ও এমপিওভুক্ত), পাসপোর্ট, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, ভূমি সেবা, কর ও শুল্ক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা খাতে দুর্নীতি কমেছে। তবে ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতির হার ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। আবার ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে কৃষি, বিআরটিএ, বিচারিক সেবা, বীমা, স্বাস্থ্য (সরকারি), গ্যাস ও এনজিও খাতে ঘুষের শিকার খানার হার বৃদ্ধির বিপরীতে শিক্ষা (সরকারি ও এমপিওভুক্ত), পাসপোর্ট, ভূমি সেবা, বিদ্যুৎ, কর ও শুল্ক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকিং খাতসহ ‘অন্যান্য খাত’ (ওয়াসা, বিটিসিএল, ডাকসেবা ইত্যাদি) এ ঘুষের শিকার খানার হার কমেছে। তবে সার্বিকভাবে ঘুষের হার কমলেও দায়িত্ব পালনে অনীহা, অসদাচরণ ও বিভিন্ন ধরনের হয়রানি, প্রতারণা, স্বজনপ্রীতি, প্রভাবশালীর হস্তক্ষেপ প্রভৃতি অনিয়ম-দুর্নীতির হার ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে বেড়েছে। কমেছে আত্মসাৎজনিত দুর্নীতি। পাশাপাশি হয়রানি বা জটিলতা এড়ানো, নির্ধারিত ফি জানা না থাকা এবং নির্ধারিত সময়ে সেবা পাওয়ার জন্য ঘুষ দেওয়া গ্রহীতার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেড়েছে।

প্রতিবেদন প্রকাশের পর টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, ‘ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না- এই মানসিকতা আমাদের মধ্যে চলে এসেছে। যাদের ওপর দায়িত্ব তারা দুর্নীতিকারীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনছেন না। জনগণকে প্রদত্ত অঙ্গীকার সরকার যথাযথভাবে পালন না করায় সমাজের অপেক্ষাকৃত কম সুবিধাভোগী মানুষের ওপর ঘুষের বোঝা ও বঞ্চনা বাড়ছে। ঘুষ ও দুর্নীতি মেনে নেওয়া সার্বিকভাবে আমাদের জীবনের সংস্কৃতিতে পরিণত হচ্ছে, যার ফলে জাতি হিসেবে আমরা আমাদের আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা ও আত্মসম্মানবোধ হারাচ্ছি।’

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কিছু সূচক ও খাতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও সার্বিকভাবে দেশের দুর্নীতির চিত্র উদ্বেগজনক। সরকারি খাতে বেতন-ভাতা বৃদ্ধিতে দুর্নীতি ও ঘুষের পরিমাণ কমে যাবে বলে অনেকের প্রত্যাশা থাকলেও গবেষণার ফলাফল বিবেচনায় আশাব্যঞ্জক কিছু বলা যাচ্ছে না। কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও ঘুষের লেনদেন কমেছে যার পেছনে বর্ধিত বেতন-ভাতাসহ অন্য কারণ থাকতে পারে। কিন্তু যারা দুর্নীতি করে অভ্যস্ত তাদের জন্য বেতন-ভাতা কোনো বিষয় নয়। তারা বেতন-ভাতার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ আয় করেন দুর্নীতি, ঘুষ ও অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে।

বাংলাদেশের সেবা খাতগুলোতে দুর্নীতি প্রতিরোধসহ সুশাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে টিআইবি অবস্থান ও পরিচয় বিবেচনা না করে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদ্যমান আইনের আওতায় এনে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করার সুপারিশসহ সেবা খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধে বিভাগীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করে বেসরকারি এই সংস্থাটি। পাশাপাশি প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা কার্যকর করা প্রয়োজন।

টিআইবি উত্থাপিত অন্যান্য সুপারিশগুলো হলো, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুদৃঢ় নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা, এর ভিত্তিতে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সেবাদানের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নের ভিত্তিতে পুরস্কার ও শাস্তির ব্যবস্থা করা, সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে গণশুনানির মতো জনগণের অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রম বৃদ্ধি করা।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads