• সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads

পর্যবেক্ষণ

যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে যুক্তরাজ্যে অনেক কম অস্ত্রবাজি

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত ২৭ মার্চ ২০১৮

যুক্তরাজ্য আর যুক্তরাষ্ট্র, রাষ্ট্র দুটির নাম কাছাকাছি হলেও চরিত্রগত বিচারে রয়েছে ভিন্নতা। আর এই ভিন্নতার অনেকগুলো সূত্রের মধ্যে একটি হলো দুই দেশের মধ্যকার অস্ত্র সংস্কৃতি। যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহতের ঘটনা নিত্যদিনকার হলেও যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে তা নয়। বিগত বিশ বছরে যুক্তরাজ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যাপক গোলাগুলির ঘটনা মাত্র দুইটি। প্রথমটি 'হাংগারফোর্ড ম্যাসাকার' নামে পরিচিত এবং অন্যটি 'ডানব্লেইন স্কুল ম্যাসাকার'।

হাংগারফোর্ড ম্যাসাকার ১৯৮৭ সালের অগাস্ট মাসের ঘটনা। মাইকেল রায়ান নামের এক বেকার যুবক আত্মহননের আগে একটি হ্যান্ডগান ও দুইটি আধা-স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ব্যবহার করে একজন পুলিশ অফিসারসহ মোট ১৬ জনকে হত্যা করে। সে ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হওয়া ব্যক্তির সংখ্যা ১৫ জন।

অন্যদিকে ডানব্লেইন স্কুল ম্যাসাকার ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসের ঘটনা। অনেকটা রায়ানের অনুকরণে এই ম্যাসাকারের নায়ক থমাস হ্যামিলটন ডানব্লেইন প্রাইমারি স্কুলের একজন শিক্ষককে হত্যা করেন। এছাড়াও স্কুলের ১৬ জন শিশুকে হত্যার পর নিজেও আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। হ্যামিলটন এই কাজে চারটি হ্যান্ডগান ব্যবহার করে, যার সবগুলোই বৈধ ছিল। হ্যান্ডগান চারটির মধ্যে দুইটি ছিল নাইন মিলিমিটার ব্রাউনিং, অন্য দুইটি .৩৫৭ ম্যাগনাম।

১৯৬৯ থেকে লিপিবদ্ধ রেকর্ডে এই দুইটি ঘটনা ছাড়াও তৃতীয় একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়, ২০১০ সালের 'কাম্ব্রিয়া শ্যুটিং'। ওই দিন ১২ জন নিহত হন, আহত হন ১১ জন। হত্যাকারী ডেরিক বার্ড একটি শটগান ও একটি .২২ বোরের রাইফেল দিয়ে ওই হত্যাযজ্ঞ ঘটায়। উল্লেখ্য, ততদিনে হ্যান্ডগান আর স্বয়ংক্রিয় রাইফেল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল যুক্তরাজ্যে। বার্ড যে ত্রিশটি স্পটে এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল পরবর্তীতে, আইন-প্রশাসন অপরাধ সেই জায়গাগুলোতে অনুসন্ধান চালাতে বাধ্য হয়।

হাংগারফোর্ড ম্যাসাকারের পর ১৯৮৮ সালের নভেম্বরে যুক্তরাজ্য সরকার আগ্নেয়াস্ত্র বিষয়ক অপর একটি আইন পাশ করে। এই আইনে আধা-স্বয়ংক্রিয় রাইফেল নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি শটগান মালিকরা তিনটির বেশি কার্তুজসমৃদ্ধ বন্দুক ব্যবহার করতে পারবেন না। আইনটি হাংগারফোর্ড ম্যাসাকারের ১৮ মাস পর কার্যকর হয়।

ডানব্লেইন কেলেঙ্কারির পর নিহত শিশুদের স্বজন ও জনগণের একটি বিশাল অংশ হ্যান্ডগান নিষিদ্ধের দাবি তোলে। তৎক্ষণাৎ তাদের ওই দাবি পূরণ না হলেও ১৯৯৭ সালে টনি ব্লেয়ার সরকার প্রতিযোগীতামূলক খেলায় ব্যবহৃত .২২ বোরের পিস্তলসহ সকল হ্যান্ডগান নিষিদ্ধ করে। ২০১২ সালের অলিম্পিক গেমসের প্রস্তুতি হিসেবে এই আইন সাময়িকভাবে শিথিল করা হয়। এসময় প্রতিযোগীদের অনুশীলন করতে হতো যুক্তরাজ্যের বাইরে।

শিকারের বন্দুক ও শটগান পুরোপুরি নিষিদ্ধ না হলেও এসবের মালিকানার জন্য যুক্তরাজ্য পুলিশের সনদের দরকার হয়। এই সনদের জন্য একজন নাগরিককে প্রতিটি অস্ত্র ক্রয় ও ব্যবহারের পেছনে কারণ দর্শাতে হয়। মজার বিষয়, এ ব্যাপারে 'আত্মরক্ষা একটি অযৌক্তিক কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে ১৯৬৮ সাল থেকে। কিন্তু আইনে তিন বছর বা তার অধিক সাজাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তিকে এই সনদ না দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়। অবৈধ অস্ত্রের মালিকানার জন্য শাস্তি নূণ্যতম ৫ বছর, সর্বোচ্চ ১৪ বছর, জরিমানা এবং আদালতের মর্জির উপর।

আইন সংশোধনের ফলাফল 

বর্তমানে যুক্তরাজ্যে প্রতি এক হাজার নাগরিকের মালিকানায় রয়েছে মোট ৬৫টি আগ্নেয়াস্ত্র। অথচ তাদের প্রতিবেশী দেশ যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি এক হাজার নাগরিকের মালিকানায় কমপক্ষে এক হাজার দশটি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। বন্দুক নিয়ন্ত্রণ অ্যামনেস্টির ব্যাপক প্রচারণার ফলে বন্দুক নিয়ন্ত্রণে ১৯৯৭ সালে আইন সংশোধন করে যুক্তরাজ্য সরকার। এই কাজে মোট ২০ কোটি ডলার ব্যয়ে জনগণের মালিকানাধীন এক লাখ ৬২ হাজার বন্দুক ও ৭০০ টন গোলাবারুদ কিনে নেওয়া হয়।

ফলে লন্ডনের রাস্তায় ছিনতাইকারীর হাতে নিহত হওয়ার সম্ভাবনা কমলেও নিউ ইয়র্কের রাস্তায় নিহতের সম্ভাবনা থেকেই যায়। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক সমীক্ষা অনুযায়ী লন্ডনের রাস্তায় নিহত হবার চেয়ে নিউইয়র্কের রাস্তায় নিহত হওয়ার আশঙ্কা ৫৪ গুণ বেশি। যুক্তরাজ্য সরকারের সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ সালে যুক্তরাজ্যে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের মুখে ডাকাতির ঘটনা ১৫২৮টি এবং অস্ত্র চুরির ঘটনা ১১০টি। এছাড়াও গোলাগুলিতে আহতের সংখ্যা ১২৫০, নিহত ২৬জন।

উল্লেখ্য, যুক্তরাজ্যে অধিকাংশ পুলিশ সদস্য নিরস্ত্র হলেও অস্ত্রধারী পুলিশের সংখ্যা ৬২৭৮। ২০১৭ সালে অস্ত্রধারী পুলিশ অভিযানের সংখ্যা ১৫,৭০৫টি, যার মধ্যে গুলি চালানোর প্রয়োজন পরে মাত্র ১০টি অভিযানে। অথচ ২০০৯ সালেও অস্ত্রধারী পুলিশি অভিযানের সংখ্যা ছিলো ২৩,১৮১টি। পাঁচ কোটি বিশ লাখ জনসংখ্যার দেশ যুক্তরাজ্যে প্রতি বছর গুলিতে নিহত হয় গড়ে ৫০ থেকে ৬০ জন । অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে গুলিতে নিহতের সংখ্যা যুক্তরাজ্যের তুলনায় ১৬০ গুণ বেশি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads