• বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads

প্রতীকী ছবি

মতামত

বাজার অর্থনীতির ধর্মই হলো অসমতা সৃষ্টি করা

  • আবু আহমেদ
  • প্রকাশিত ১০ মার্চ ২০১৮

সংবাদমাধ্যমে বড় করে খবর বের হয়েছে, বাংলাদেশে অর্থনীতিতে আয়ের বণ্টনে অসমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পূর্বে যে অসমতাটুকু ছিল তাও এখন ভেঙে পড়ছে। ধনীরা অতি তাড়াতাড়ি আরো ধনী হচ্ছে, গরিবেরা আরো গরিব না হলেও তাদের ভাগ্যে জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির অতি ক্ষুদ্র অংশ পড়ছে। সরকারি পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের উপরের ১০% লোকের হাতে মোট আয়ের ৩৮% প্রবাহিত হয়। টপ ৫%-এর হাতে কত পার্সেন্ট আয় প্রবাহিত হয় সেটা আজো পরিসংখ্যান ব্যুরো হিসাব করেনি। সেইখানে আয়ের অসমতা আরো প্রকট। মধ্যবিত্ত শ্রেণি বড় হচ্ছে সত্য। তবে মধ্যবিত্তের থেকে সুপার রিচ বা অতি ধনীতে উন্নীত হওয়ার সংখ্যা খুবই নগণ্য। আর নিম্নমধ্যবিত্তরা যেখানে ছিল সেখানেই আছে। তাদের ভাগ্যে অর্জিত জাতীয় আয়ের কোনো হিস্যাই পড়ছে না। ক্ষেত্রবিশেষে নিম্নমধ্যবিত্ত আরো পিছিয়ে পড়ে দরিদ্রদের কাতারে এসে শামিল হচ্ছে। বাজার অর্থনীতিতে অ্যাসেট বা সম্পদের মালিকানাই আয় প্রবাহের ক্ষেত্রে পার্থক্যটা গড়ে দেয়। যাদের হাতে উৎপাদনের তিনটি উপাদান আছে তারাই তাড়াতাড়ি ধনী হয়। এই তিনটি উপাদান হলো জমি, পুঁজি এবং ব্যবস্থাপনা। তবে পুঁজি হলো অনেক শক্তিশালী। পুঁজির জোগাড় হলে অন্য দুটো উপাদান পুঁজির মালিকের কাছে এসে যায়। যেহেতু সৃষ্ট এই অর্থনীতিতে মুক্তভাবে বেচাকেনা করা যায় সেইজন্য পুঁজির মালিক সহজেই ভূমির মালিকও হয়ে যায়।

শেষ পর্যন্ত অর্থনীতি ক্যাপিটালিস্টদের বা পুঁজিপতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এবং যেহেতু তারাই নির্ধারণ করে পণ্যের মূল্য এবং শ্রমিকের মজুরি সেই জন্য আয়ের সিংহভাগ তাদের দিকেই প্রবাহিত হয়। যুক্তি আছে, ধনী লোকেরা তাদের ধনকে আরো বেশি উৎপাদনের কাজে লাগাবে, তাতে কর্মসংস্থান হবে এবং আয় প্রবাহ সবার দিকে প্রবাহিত হবে। কিন্তু বাস্তবে এই সুন্দর যুক্তির প্রতিফলন দেখা যায় না। ধনীরা তাদের অর্থকে বা সম্পদকে আরো বেশি উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানে ব্যয় না করে প্রাচুর্যের ভোগে, অর্থবাজারে অপচয়ে ব্যয় করে। তারা অর্থকে আরো উৎপাদনে ব্যবহার করলেও কর্মসংস্থানে অর্থব্যয় করে না। যে অর্থনীতিতে দুর্নীতি আছে সেই অর্থনীতিতে কিছু লোকের পক্ষে অতি ধনী হওয়া অনেক সহজ হয়। সব বাধা তারা অর্থ ব্যয় করে সরিয়ে দেয়। ফলে তাদের কাজকর্মকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কেউ থাকে না। রাষ্ট্র তাদের পক্ষে চলে যায়। একসময় বিভিন্ন ভাষায় এবং বিভিন্ন প্রকারে রাষ্ট্র নিজেই তাদের পক্ষে অবস্থান নেয়। রাষ্ট্রীয় শক্তি গরিবদেরকে রক্ষা না করে শুধু কতিপয় ধনীদেরকে রক্ষা করে। এর কারণ হলো রাষ্ট্র অর্থের কাছে বিক্রি হয়ে যায়। এই অবস্থায় ধনীদের কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত উৎপাদন ব্যবস্থা একচেটিয়া (Monopoly) রূপ গ্রহণ করে। মনোপলিস্ট ইচ্ছেমতো পণ্যের মূল্য হাকায়। এবং ভোক্তারা সেই মূল্য দিতে বাধ্য হয়। অর্থনীতিতে কিছু বিলিয়নিয়ার্স তৈরি হয়ে যায়। এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে সেইসব বিলিয়নিয়ার তাদের পক্ষে অনেক কল্পকাহিনী প্রচার করতে থাকে। অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ ঘটে ব্যাংকের মাধ্যমে। অতি ধনীরা ব্যাংকেরও মালিক হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তারা অর্থপ্রবাহের মূল প্রবাহগুলোকেই নিয়ন্ত্রণ করে। গরিব এবং মধ্যমশ্রেণি হয়ে পড়ে ব্যাংকের ডিফল্টারস আর ধনীরা হয়ে পড়ে ব্যাংক ঋণের গ্রাহক। বড় গ্রাহকরা ব্যাংকের ঋণ ফেরত দেয় না। তাদের ঋণকে অবলোপন করতে হয় ব্যাংক অন্য সূত্র থেকে যে লাভ করে সেই লাভকে কু-ঋণের বিপরীতে প্রতিস্থাপন হিসেবে দেখিয়ে। আর ব্যাংক যদি এরপরও লাভ করতে পারে সেই লাভের সিংহভাগের মালিকও হয় সেই ধনীরা যারা অন্য ব্যাংকে ঋণখেলাপি। কারণ হলো, এক ব্যাংকে তারা ঋণখেলাপি বটে, তবে তাদের ব্যাংকে তারা বড় শেয়ারহোল্ডার। আবার বীমা ব্যবসার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। একই পরিবার বীমা ব্যবসারও মালিক। যেসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থপ্রবাহ ঘটে ওইগুলোয় যদি সমান্তরাল ও উল্লম্ব মালিকরা কেন্দ্রীভূত হয় তাহলে ওই অর্থনীতি আরো অতি দ্রুত ওইসব লোকদের হাতে কেন্দ্রীভূত হবে যারা আর্থিক কোম্পানিগুলোর মালিক। সম্প্রতি ব্যাংক কোম্পানির অ্যাক্টে পরিবর্তন এনে পরিবারভিত্তিক মালিকানাকে আরো উৎসাহিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের সম্পদের কেন্দ্রীভূত হওয়ার ধরন দেখে মনে হবে সরকারও বড় লোকদের সঙ্গে। বড় ব্যবসাগুলো সরকারি আনুকূল্য ছাড়া পাওয়া যায় না। আবার সরকারি সমর্থনে যেসব ব্যবস্থা সমাজের সুপিরিয়ররা পেয়ে থাকে ওইগুলোতে লাভও অনেক বেশি। বলা চলে, সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত বড় পুঁজির ব্যবসাগুলোতে প্রতিযোগিতা নেই বললেই চলে। ওইগুলো একচেটিয়া মুনাফা করে যাচ্ছে এবং ওইগুলোর বিক্রয় মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে জনকল্যাণকে অবহেলা করা হয়। উদাহরণ হলো বিদ্যুৎ খাত। যারা অতি বিত্তবান এবং রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত এবং সম্পর্কিত তারাই পাবলিক প্রপার্টিজগুলোকে দখল করছে। ওইগুলোকে তারা শুধু নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছে। উদাহরণ হলো নদী দখল, বন দখল, ঘাট দখল, বাজার দখল- বাহুবলে ওরাই এগিয়ে যারা রাজনৈতিক সাইনবোর্ডের অধীনে কাজ করে। সমাজের অন্য লোকেরা শুধু ভোক্তা হয়ে নিরীহ লোকদের মতো জীবনযাপন করে। রাষ্ট্র যদি অতি ধনীদের পক্ষ নেয় তখন বইতে বর্ণিত বাজার অর্থনীতিও কাজ করে না। পুঁজির চাপই সব অর্ডারকে তছনছ করে দেয়। এক ধরনের নীতি- নৈতিকতাহীন সমাজ গড়ে ওঠে যেখানে ভোগবাদকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে দেখা হয় এবং মানবজীবনের অভীষ্ট লক্ষ্য হিসেবে ভোগবাদকে প্রচার করা হয়। সেই ভোগবাদও আবার কিছুসংখ্যক লোকের জন্য। সমাজের উঁচু ১০% লোকদের জন্য। সত্য হলো, অন্য ৯০% লোক এদের ভোগবাদের জন্য অর্থ জোগায়। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্র এগিয়ে আসে বলে বলা হয় বাজার অর্থনীতির সাহিত্যগুলোতে। কিন্তু বাস্তবতা হলো রাষ্ট্র অতি দুর্বলভাবে এগিয়ে এলে সেইসব পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী শ্রমিক-মজুর-কারিগরের উপরে উঠতে পারে না। বলা হয়, বাংলাদেশে পিছিয়ে পড়া লোকদের জন্য রাষ্ট্র শিক্ষাকে মুক্ত করে দিয়েছে। বিনা অর্থ ব্যয়ে তাদের ছেলেমেয়েরা স্কুলে পড়তে পারে। বেতন-বইয়ের জন্য কোনো অর্থ ব্যয় করতে হয় না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সম্পূর্ণ ফ্রি শিক্ষাও ফ্রি শিক্ষা নয়। এ শিক্ষাটাও অনেকে নিতে পারছে না। পারলে ঢাকা শহরে এত রিকশাচালক আজো কোথা থেকে আসে! এদের জন্য কি সরকারি ফ্রি শিক্ষাটা ছিল না? না, এরা ইচ্ছেকৃতভাবেই ওই শিক্ষা থেকে দূরে ছিল? সরকারি শিক্ষা ফ্রি, তবে বই-বেতনের ক্ষেত্রে। শিক্ষা এখন বাণিজ্যে প্রবেশ করেছে। এবং ওই বাণিজ্য সরকারি উদ্যোগের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও প্রবেশ করেছে। ফলে আরো অনেক ছাত্র প্রাইমারি স্কুলের পড়াটাও শেষ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে সক্ষম হচ্ছে না। শিক্ষায় অসমতা আয়বৈষম্যকে আরো প্রকট করে তুলেছে। শিক্ষার মানে যখন অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে শ্রেণি-বিভাজন হয় তখন গরিবের সন্তানরা হেরে যায়। শিক্ষা এখন দুই প্রকার। উৎকৃষ্ট শিক্ষা ও নিকৃষ্ট শিক্ষা। সরকারি ব্যবস্থাপনায় যে শিক্ষা বিতরণ করা হচ্ছে এবং যে শিক্ষার অধিকাংশ গ্রাহক হলো বিনা ফির গরিব ছাত্র, তারা নিকৃষ্ট শিক্ষাটাই পাচ্ছে। অন্যদিকে সুপার রিচরা বিদেশি সিলেবাসের অধীনে বাজারের জন্য দামি শিক্ষাটা অর্থের বিনিময়ে অনেকটা শিখে নিচ্ছে। আজকে নিয়োগের ক্ষেত্রে দেখা হয় কী পড়েছে সেটা তো বটেই, তবে কোথায় পড়া হয়েছে সেটা তো অবশ্যই। তাহলে বিনামূল্যের সরকারি শিক্ষা কি অর্থ ব্যয়ের শিক্ষার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে! শিক্ষার বৈষম্যের মাধ্যমে গরিবদের জন্য উপরে ওঠাকে আরো কঠিন করা হয়েছে।

বাজার অর্থনীতি তার চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই গরিব লোকদের স্বার্থের বিরোধী। আর বাজার অর্থনীতি যদি রাষ্ট্র কর্তৃক অনিয়ন্ত্রিত থাকে তাহলে কখনো কখনো এই নিয়মের অর্থনীতি দানবে রূপান্তর হয়। তখন একচেটিয়া পুঁজির কষাঘাতে গরিব লোকেরা শোষিত হতে পারে। এটা ঠিক, বাজার অর্থনীতি যদি দ্রুতগতিতে বিকাশ লাভ করে তখন গরিবদেরও জীবনযাত্রার মান বাড়ে। তবে তারা দৌড়ে একেবারে পিছনে পড়ে থাকে। তারা এভাবেই শূন্য হয়ে মজুর-শ্রমিক-কারিগরে পরিণত হয়। সমাজের বিভাজন বাড়তেই থাকে। সমাজ হয় দুই শ্রেণির, বড়জোর তিন শ্রেণির। সুপার রিচ, উচ্চমধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত আর গরিব এই শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। গরিবের পক্ষে রাষ্ট্রের শক্ত অবস্থানই কেবল অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads