• শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads

মতামত

মশারির ভেতরের মশা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ০৫ এপ্রিল ২০১৮

পৃথিবীর সব প্রান্তে মানুষ বসবাস করে। আগের যুগে যখন সীমান্তরেখা ও পাসপোর্ট ভিসা প্রভৃতি ছিল না তখন মানুষ স্বচ্ছন্দে স্থান পরিবর্তন করতে পারত; বসবাসের জন্য অথবা জীবিকার জন্য এক জায়গা ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যেতে তার বাধা ছিল না। বাংলাদেশের মানুষের বহু আগের প্রজন্ম অনেক দেশ থেকে এসে এখানে সংমিশ্রিত হয়ে হয়েছে আজকের বাঙালি। বাঙালি জাতির বড় অংশ হলো ভেডিড বা দ্রাবিড়। এরা এসেছে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে। এর পরের উল্লেখযোগ্য অংশ হলো আল্পীয় আর্য ও মোঙ্গল। আল্পীয় আর্যরা এসেছে ইউরোপ থেকে আর মোঙ্গলরা তিব্বত ও মিয়ানমার থেকে। এ ছাড়া পৃথিবীর অন্য জায়গা থেকেও লোক এসে বাংলাদেশে বসতি গড়েছে।

এ অবস্থা বাংলাদেশের একক বৈশিষ্ট্য নয়। আজকের বিশ্বের সব দেশেই এমন ঘটনা ঘটেছে। এর কারণ হলো, অতীতকালে মানুষ এলাকার দ্বারা চিহ্নিত ছিল না। অতীতকালের মানুষ পুরো পৃথিবীকে তার আবাসস্থল বলে মনে করত। আজকের মানুষ যেমন তার দেশের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে অবাধে যাতায়াত করতে পারে, অতীত পৃথিবীর মানুষ পুরো পৃথিবীকে একটি বাসস্থান ঠাওরে তারা যেকোনো জায়গায় অবাধে চলাফেরা করত। বসতি গড়তে পারত।

জায়গার দখল নেওয়া শুরু হয়ে গেলে এ অবস্থা আর রইল না। এক ব্যক্তির দখল করা জমি তার নিজের বলে দাবি করা শুরু হলে সীমানা টেনে তা চিহ্নিত করা হলো। তার সীমানার মধ্যে অন্যের প্রবেশ নিষিদ্ধ হলো; তার মধ্যে ঢুকতে গেলে তার অনুমতি ও শর্ত মেনে অথবা প্রার্থিত জমিটুকুর জন্য মালিক কর্তৃক ধার্যকৃত দাম পরিশোধ করে ঢোকা যেত।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জমির দখল নিয়ে মানুষের মধ্যে শুরু হলো প্রতিযোগিতা। স্বভাবতই যারা শক্তিশালী, তারা দখল করে কখনো বেশি এবং ভালো জমি। ভালো জমি বলতে ধরা হলো, যে জমিতে বেশি শস্য ও ফলমূল-শাকসবজি সহজে উৎপন্ন করা যায়। ভালো জমি যারা পেল না, তারা তাদের খারাপ জমিতে প্রয়োজনীয় খাদ্য উৎপাদন করতে না পেরে অন্যের দখল করা ভালো জমি উৎপাদিত পণ্য ভাগ দেওয়ার শর্তে তাদের কাছ থেকে বন্দোবস্ত নিতে লাগল। শক্তিশালীদের মধ্যে যারা বেশি উদ্যমী, তারা লোকজন জোগাড় করে বেশি জমি দখলের জন্য বাহিনী গঠন করল এবং তাদের মারপিটে প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করল সশস্ত্র বাহিনী। বাহিনীকে শক্তিশালী করতে তাদের হাতে তুলে দিল নানা কিসিমের অস্ত্র। লড়াইতে জয়ের জন্য অস্ত্রের উন্নতি সাধন এবং নতুন নতুন অস্ত্র উদ্ভাবন করা হতে থাকল। যার বা যাদের থাকল বৃহৎ বাহিনী ও উৎকৃষ্ট অস্ত্র, তারা বহু জনপদ ও তাদের অধীন ভূমি দখল করে হয়ে পড়ল পরাশক্তি। জনপদ ও ভূমি দখল প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত থেমে নেই। প্রতিটি কালপর্বে একটি অথবা একাধিক পরাশক্তি থাকে। প্রাচীন মিসরীয়দের সময় পরাশক্তি ছিল ফারাও বা ফেরাউনরা। তারা বিশাল ভূখণ্ডের মালিক ছিলেন। তারা এতটাই ক্ষমতাদর্পী ছিলেন যে, তারা তাদের ঈশ্বর বলে ভাবতেন এবং তাদের প্রজাদের কাছ থেকে কেবল আনুগত্য নয়, পূজাও দাবি করতেন। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, ফেরাউনদের শাসনামলেই নির্মিত হয় মিসরের পিরামিড, স্ফিংগস ও পাহাড়-খোদা বিশাল সব ভাস্কর্য। তারা মৃতদেহ মমি করে রাখার কৌশলও আবিষ্কার করে।

সাধারণত দিগ্বিজয়ী বীরেরাই বিশাল ভূখণ্ড পদানত করতেন। বিজয়ের পর তিনি হতেন বিজিত ভূমির সম্রাট। অপেক্ষাকৃত ছোট ভূখণ্ডের অধিকারীকে বলা হতো রাজা। সম্রাটের অধীনে অনেক রাজ্য থাকত। রাজ্যের রাজারা কর দিয়ে সম্রাটের অধীনতা স্বীকার করে নিলে তাদের ক্ষমতাচ্যুত করা হতো না। যারা তা করতেন না, তাদের শক্তি বলে উচ্ছেদ করা হতো। এর দৃষ্টান্ত হলো, রাজস্থানের রাজা প্রতাপ সিং এবং বাংলাদেশের প্রতাপাদিত্য। সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় আলেকজান্ডার দি গ্রেট, চেঙ্গিস, হালাকু, তৈমুর, বাবর, নেপোলিয়ন, হিটলার প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য নাম। শিল্প বিপ্লবের পর ইউরোপের কয়েকটি শক্তি নবআবিষ্কৃত উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং তার সংলগ্ন দ্বীপপুঞ্জ, আফ্রিকা ও এশিয়ার প্রায় সব দেশ দখল করে। এদের মধ্যে বেশি ভূখণ্ড দখল করে ব্রিটেন, ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল ও হল্যান্ড। এশিয়ার প্রথম আধুনিকীকৃত জাপানও চীন ও প্রশান্ত মহাসাগরের বহু দ্বীপ দখল করে।

জমি দখলের লড়াই ঐতিহাসিক প্রতিটি কালপর্বেই দেখা যায়। পরাশক্তিতে পরাশক্তিতে যুদ্ধও প্রাচীনকাল থেকেই আছে। অধিকৃত জমিকে বলে উপনিবেশ। উপনিবেশের দখল নিয়ে যুদ্ধে বিগত দু-তিন শতকে ইংরেজ ছিল সব থেকে এগিয়ে। ভারতবর্ষ দখলসহ পৃথিবীর প্রায় সব প্রান্তে তারা উপনিবেশ দখল করতে পারে। এজন্য তখন বলা হতো ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যায় না’। তার এক উপনিবেশে সূর্য ডুবতে বসলে অন্য উপনিবেশে উঠতে শুরু করে।

উপনিবেশ দখল নিয়ে বিংশ শতাব্দীতে দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ হয়। দুটো যুদ্ধেই ব্রিটেন ও তার মিত্ররা জয়ী হয়। তবে দুটো যুদ্ধেই তাদের শক্তি ক্ষয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নতুন পরাশক্তি হয়ে দেখা দেয় ব্রিটেনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের যুদ্ধকালীন মিত্র সোভিয়েত ইউনিয়ন। ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র হলো মুক্তবাজার অর্থনীতি বা (টাকা ও পেশিশক্তির) ‘জোর যার, মুল্লুক তার’ নীতিতে বিশ্বাসী ধনিকগোষ্ঠী পরিচালিত রাষ্ট্র। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভ. ই. লেনিন দ্বারা রুশ বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে মার্কস-এঙ্গেলস উদ্ভাবিত কমিউনিস্ট সাম্যবাদী মতাদর্শ অনুযায়ী শ্রমিক শ্রেণি কর্তৃক পরিচালিত হতে। দুটো শিবির সম্পূর্ণ বিপরীত আদর্শের অনুসারী হওয়ায় তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও বিরোধ ছিল প্রকট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর হিটলার-জার্মানির বর্ণবাদভিত্তিক ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়ে যুদ্ধকালীন মিত্ররা পুনরায় তাদের স্ব-স্ব অবস্থানে ফিরে গেলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দেখা দেয় দ্বন্দ্ব, যার নামকরণ হয় স্নায়ুযুদ্ধ কিংবা ঠান্ডা লড়াই। ঠান্ডা লড়াইকালে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি তাদের দেশের বুর্জোয়া পেটিবুর্জোয়া পৃষ্টপটের পরিবারগুলো থেকে আসা সদস্যদের দ্বারা কুক্ষিগত হয়ে গেলে শ্রমিক শ্রেণির কর্তৃত্ব শেষ হয়ে যায়। গত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে সংশোধনবাদী রুশ নেতৃত্ব সংশোধন ঘটাতে ঘটাতে সমাজকে এমন স্তরে নিয়ে যায় যে, নব্বইয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গর্বাচেভের নেতৃত্বে তারা প্রতিবিপ্লব ঘটিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে কমিউনিস্ট শাসনের অবসান ঘটিয়ে সেখানে মুক্তবাজার অর্থনীতি বা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। যে রাষ্ট্রে ভিক্ষুক ও পতিতা ছিল বহু বহু দশক অনুপস্থিত, বাজার অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার এক মাসের মধ্যে সে দেশে ওই দুই বস্তু হু হু করে বেড়ে চলে। সোভিয়েত ইউনিয়নে সবার খাওয়া-পরা, থাকা ও শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা সব নাগরিকের জন্য নিশ্চিত থাকায় চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, খুন, ধর্ষণ প্রভৃতি অপরাধ- যেসব বাজার অর্থনীতির দেশ যেমন বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন প্রভৃতির বৈশিষ্ট্য- সোভিয়েত রাষ্ট্রে সেসব ছিল অকল্পনীয়। এসব অপরাধ রাশিয়ায় ফিরে আসে। মানুষ দিশেহারা হয়ে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো মাও সেতুংয়ের মৃত্যুর পর সংশোধনবাদীরা চীন দেশের নেতৃত্ব দখল করে। বাজার অর্থনীতিতে প্রত্যাবর্তনের পর চীনের বুর্জোয়ারা ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে তাদের শ্রমিক শ্রেণির মূল্যে ব্যবসায় করে একটি ধনী দেশ হিসেবে চীন নিজেকে ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু চীনা নেতারা রুশদের ন্যায় বলদের মতো কাজ করেনি। কমিউনিস্ট পার্টি রেখেই তারা কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়ায় চীনের বৈষয়িক উন্নতি চোখে পড়ার মতো। যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের আশঙ্কা, চীন এ শতকের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রকে সব দিক থেকে, বিশেষত অস্ত্র ও মহাকাশ দখলে, যাবে ছাড়িয়ে। কমিউনিস্ট নামধারী পার্টিটি যেহেতু তারা রেখে দিয়েছে জ্ঞানী চীনারা হয়তো তখন সাম্যবাদী আদর্শ ফের গ্রহণ করে সকল মানুষের জন্য সমান সুখের সমাজ গড়ে তুলবে। চীনাদের দেখাদেখি তখন, আশা করা অমূলক হবে না, যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপসহ সারা বিশ্বের মানুষ ওই সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রতি ঝুঁকে পড়বে। মহানবী মোহাম্মদ (স.) তো শুধু শুধু বলেননি- প্রকৃত জ্ঞান পেতে হলে চীন দেশে যাও।

কিন্তু সে পর্যায়ে মানবজাতির পৌঁছানোর আগে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাজার পরাশক্তিগুলো তাদের মুনাফার ক্ষেত্র ঔপনিবেশ দখল করতে ও ধরে রাখতে চেষ্টার ত্রুটি করবে না। বাংলাদেশ তাদের একটি শোষণক্ষেত্র বা উপনিবেশ হওয়ায় বাংলাদেশকে ধরে রাখতে তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। বাংলাদেশের অর্থনীতি তাদের দয়া এবং ছাড়নির্ভর হওয়ায় এটি করা তাদের পক্ষে খুব সহজ। তাদের উপমন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূতরা বলে দেয়, বাংলাদেশের কী করা উচিত। তাদের আদেশ-নির্দেশ প্রতিদিনের কাগজ খুললেই মেলে। তাদের আদেশ-নির্দেশ কেবল সরকারি দলের প্রতি থাকে না। বিরোধী দলের কী করা উচিত এবং উচিত নয় তেমন আদেশ-নির্দেশও থাকে একই সঙ্গে। বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী তাদের কথা না শুনে পারে না।

প্রকৃতপক্ষে সকল উপনিবেশের (এ দেশগুলো বর্তমানে ‘স্বাধীন’ বলে হালে এদের নামকরণ হয়েছে নয়া-উপনিবেশ) শাসক গোষ্ঠীটি এদের নিজ হাতে গড়া। গড়ার এই কাজটি ঔপনিবেশিক আমল থেকে চলছে। গড়ার এই মডেলটির রূপরেখা দিয়ে যান দু’শ’ বছর আগে ব্রিটিশ ভারতের সিভিল ও ক্রিমিনাল কোড রচয়িতা টমাস বেবিংটন মেকলে (১৮০০-৫৯)। আইন ও মানবচরিত্র বিষয়ে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন ভারত সরকারের এই উপদেষ্টা ভারতীয়দের জন্য এমন চমৎকার নির্দেশনা নির্মাণ করে যান যা উপমহাদেশের প্রতিটি দেশের সুশীলদের ভেড়া করে রাখার একটি মোক্ষম কৌশল। তার কৌশলটির সারকথা তিনি উল্লেখ করেন এই বলে যে, শিক্ষাব্যবস্থাসহ তার প্রণীত কৌশলটি বাস্তবায়িত হলে ভারতীয়রা রক্তে-মাংসে ভারতীয় থাকলেও রুটি ও মেজাজে হবে ব্রিটিশ (অনুগত)।

হয়েছেও তাই। ব্রিটিশের অনুগত শুধু নয়, অনুরক্ত হওয়ায় তারা ব্রিটিশ সরকারের কূটচাল মেনে বৃহৎ শক্তিমান ভারতবর্ষকে তিন টুকরো করে নিয়েছে (১৯৪৭ ও ১৯৭১)। তিন টুকরো হয়ে তারা একে অপরের সঙ্গে কঠিন শত্রুতায় মেতে উন্নয়নের বদলে যাচ্ছে উচ্ছন্নে। খণ্ডিত অংশগুলোর দুর্বলতার সুুযোগ নিয়ে আজকের সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তি ব্রিটিশের দোসর যুক্তরাষ্ট্র তিন দেশের ইংরেজি শিক্ষিত সুশীলদের ডিভি ভিসার লোভ দেখিয়ে বগলদাবা করে তাদের দিয়ে একতরফা সুবিধার বাণিজ্য ও ঋণদান চুক্তি এবং তাদের সশস্ত্র বাহিনী ও আধা সামরিক এবং পুলিশ বাহিনীর ওপর সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকল্পে সামরিক চুক্তির আওতায় নানা প্রশিক্ষণ চুক্তি স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছে। উৎসাহ বা ইনসেন্টিভ হিসেবে তাদের সম্মুখে যে মুলাটি ঝুলিয়ে রেখেছে তা হলো জাতিসংঘ বাহিনীতে তাদের নেওয়ার প্রতিশ্রুতি!

১৯৭১ সালে আল-বদর, আল-শামস, রাজাকার নামে যাদের আবির্ভাব ঘটানো হয় এবং এরা হলো মেকলে সৃষ্ট ইংরেজি শিক্ষিত রুচি ও মেজাজে ব্রিটিশ অনুগতদের উত্তরসূরি। বলার অপেক্ষা রাখে না, ব্রিটিশ আমলের সুশীলদের মতো এরা সব মশারির ভেতরের মশা। মশারির মধ্যে মশা রেখে যেমন শান্তিতে ঘুমানো ও বিশ্রাম নেওয়া যায় না, সমাজে এদের রেখেও শান্তিতে থাকা যায় না। এরা অবাধে চলতে পারে বলে বাংলাদেশের সেক্যুলার সংবিধান ক্ষত-বিক্ষত। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে রাজাকার অধ্যুষিত এলাকার ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা জর্জরিত। সংসদীয় রাজনীতি অচল। সংসদ নির্বাচনের পরদিন থেকে শুরু হয় সংসদ বর্জন ও সরকার পতনের আন্দোলন। হরতাল ধর্মঘটে হয় আর্থনীতিক জীবন বিপর্যস্ত। শিক্ষা কার্যক্রম বিধ্বস্ত। জাতির অস্তিত্ব হয়ে পড়ে সঙ্কটাপন্ন। পরাশক্তিগুলোর কারসাজিতে এ অবস্থা চলছে চার দশক ধরে। মশারির ভেতরের মশার সংখ্যা দিন দিন শুধু বাড়ছে। লক্ষণীয় হলো, রক্তচোষায় যে মশাটি অধিক পারঙ্গম তাকে ও তার সংস্থাটিকে বেশ কিছুকাল যাবৎ নোবেল পুরস্কার দিয়ে ‘সম্মানিত’ করা হচ্ছে। ‘যুবক’, ‘ডেসটিনি’র মতো কয়েকটি বড় দেশীয় মশারির মশার চেয়ে অধিক ভয়ঙ্কর হলো মশারির ভেতরের বিদেশি মশা যেগুলোর মধ্যে প্রধান হলো, মোবাইল কোম্পানি। ইউরোপ আমেরিকায় মোবাইল কলচার্জ শহরের মধ্যে কথা বললে লাগে না। শহরের বাইরে ও বিদেশে করলে লাগে তিন পয়সা মাত্র মিনিট। অথচ বাংলাদেশে বিদেশি কোম্পানির চার্জ দেশে দেড় থেকে দু’টাকা ও বিদেশে করলে মিনিট দশ থেকে পনেরো টাকা। এখন ভাবুন, এই মশাগুলোর রক্তপান কতটা মারাত্মক। বাংলাদেশের মানুষের সহ্যশক্তি অসীম। যারা মশারির ভেতরের মশা নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী পার করছে।

দেখার বিষয়, বাংলাদেশের মানুষ মশারির ভেতরের মশা আর কতকাল অক্ষত রেখে তার দংশনের জ্বালা মুখ বুজে সয়ে যাবে।

আবদুল মতিন খান

২৯.০৪.১২

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads