• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads

প্রতিকি ছবি

মতামত

কোন পথে বিএনপি

  • প্রকাশিত ১০ এপ্রিল ২০১৮

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ হওয়ার পর কার্যত কাণ্ডারিবিহীন হয়ে পড়ে বিএনপি। যদিও তিনি কারান্তরীণ হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তাতেও বিএনপির নেতৃত্বশূন্যতা কাটেনি। কারণ তারেক রহমান নিজেও আদালতের দেওয়া দণ্ড মাথায় নিয়ে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। এ কারণে সরাসরি দলকে নেতৃত্ব দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। ফলে রাজনৈতিক এবং সাংগঠনিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দলটি এখন বেকায়দা অবস্থায় আছে। বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান ছাড়া দেশের ভেতরে মুক্ত অবস্থায় যেসব সিনিয়র নেতা রয়েছেন, তারা দৃশ্যত ঐক্যবদ্ধ থাকলেও তাদের মধ্যে মতবিরোধের বিষয়টি প্রায়ই প্রকাশ হয়ে পড়ছে।

বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে আছেন প্রায় দুই মাস হতে চলল। এর মধ্যে তার জামিনও হয়েছে। কিন্তু তিনি বের হতে পারেননি। হাইকোর্ট তাকে জামিন দিলেও দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তা স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ। বিএনপি নেতাকর্মীরা তাদের নেত্রীর জামিনের বিষয়ে একরকম নিশ্চিত থাকলেও তা হয়নি। ফলে নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা নেমে এসেছে। খুব দ্রুত যদি তিনি জেল থেকে বের হয়ে আসতে না পারেন, তাহলে বিএনপিতে চরম হতাশা ও বিশৃঙ্খলা নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে।

বেগম জিয়ার জামিন হওয়া না হওয়া নিয়ে চলছে রাজনৈতিক বিতর্ক। বিশেষ করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ এই নিয়ে বাগ্যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, সরকারের ইশারায় বেগম জিয়ার জামিন আটকে আছে। অপরদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, বেগম জিয়ার জামিনের বিষয়টি সম্পূর্ণ আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল, এখানে সরকারের কোনো হাত নেই। সরকারের হাত থাক বা না-থাক জনমনে বেগম খালেদা জিয়ার জামিন না হওয়ার বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। বিষয়টি যেহেতু বিচারালয় এবং বিচারাধীন মামলা সম্পর্কিত, তাই সেদিকে বেশি অগ্রসর না হওয়াই শ্রেয়। তা ছাড়া খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আরো বেশ কয়েকটি মামলা বিচারাধীন আছে এবং সেগুলোর মধ্যে কয়েকটির গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি রয়েছে। ওইসব মামলার মধ্যে একটি হলো কুমিল্লার মামলাটি, এই মামলায়ও তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকের আশঙ্কা, যে প্রক্রিয়ায় বেগম খালেদা জিয়ার মামলা এবং জামিনের বিষয়গুলো এগোচ্ছে, তাতে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি মুক্তি পাবেন কি না তা প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

এসব কারণে বিএনপি এখন মহাসঙ্কটে রয়েছে। চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতিতে এমনিতেই সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, তার ওপর নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয়হীনতা নতুন সমস্যা সৃষ্টি করেছে। চেয়ারপারসন কারারুদ্ধ হওয়ার পর সিনিয়র নেতারা কয়েকটি বৈঠক করলেও তা থেকে ফলপ্রসূ কোনো সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসেনি। নেতারা দলীয় নেত্রীর মুক্তির দাবিতে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলার কথা বললেও কার্যত তা ফাঁকা বুলি হিসেবেই পরিগণিত হয়েছে। বেগম জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিএনপি এখনো পর্যন্ত লিফলেট বিতরণ, প্রতিবাদ-বিক্ষোভ এবং দলীয় কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিং কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ রয়েছে। যদিও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত ১ এপ্রিল বলেছেন, চেয়ারপারসনের মুক্তির জন্য আন্দোলনের বিকল্প নেই; কিন্তু সে আন্দোলন তারা কবে কীভাবে গড়ে তুলবেন তা অনেকের কাছেই বোধগম্য হচ্ছে না।

এটা ঠিক যে, রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে আদালতের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা যায় না। আদালতের বিষয় আদালতেই মোকাবেলা করতে হয়। তবে রাজনীতিতে অনেক কিছুই ঘটে। সে রকম কিছু ঘটনার জন্য যে ধরনের সাংগঠনিক ভিত্তি তথা শক্তি দরকার তা যে বর্তমানে বিএনপিতে অনুপস্থিত, এ কথা অস্বীকার করা যাবে না। এমনিতে বিএনপি একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল, সন্দেহ নেই। সারা দেশে এর রয়েছেন বিপুলসংখ্যক কর্মী ও সমর্থক। কিন্তু একটি শক্ত আন্দোলন গড়ে তুলে দাবি আদায়ে সরকারকে বাধ্য করার মতো শক্তি যে এ মুহূর্তে তাদের নেই, তাও অস্বীকার করা যাবে না। সরকারের দেওয়া মামলার জালে আটকে নেতাকর্মীরা এখন ক্লান্ত, শ্রান্ত। ফলে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে বিএনপিকে আদালতের সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে।

এদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। আসন্ন ওই নির্বাচনে দলটি অংশ নেবে কি না বা নিতে সক্ষম হবে কি না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, শেষ পর্যন্ত বিএনপি সংসদ নির্বাচনে অংশ নাও নিতে পারে। কেননা, শীর্ষ নেতৃত্বের কেউ কেউ বলছেন, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে ছাড়া তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না। আইন অনুযায়ী উচ্চ আদালত যদি বেগম খালেদা জিয়াকে দেওয়া নিম্ন আদালতের দণ্ড স্থগিত না করেন, তাহলে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্য থাকবেন না। সেক্ষেত্রে বিএনপি পড়বে সঙ্কটে। তারা কি নির্বাচন বর্জন করবে, নাকি নেত্রীকে মুক্ত করার আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে অবতীর্ণ হবে তা নির্ভর করছে শীর্ষ নেত্রীর সিদ্ধান্তের ওপর। কেউ কেউ অবশ্য মনে করছেন যে, বিএনপি এখন যা-ই বলুক না কেন, আসন্ন নির্বাচনে তারা অংশ নেবে। ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে যে ভুল তারা করেছে, তার পুনরাবৃত্তি হয়তো আর করবে না। ভেতরে ভেতরে দলটি সে রকম প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে বলেও অনেকে মনে করেন। সেক্ষেত্রে দলের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হতে পারে এবং প্রকারান্তরে তা বিভেদ-বিচ্ছেদে রূপ নিতে পারে বলে রাজনৈতিক বোদ্ধামহলের অনুমান।

এদিকে অতি সম্প্রতি আলোচনায় উঠে এসেছে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতার বিষয়টি। গত ২৭ মার্চ মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। সে অনুযায়ী কারা-কর্তৃপক্ষের অনুমতিও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সাক্ষাতের জন্য রওনা দেওয়ার আগ মুহূর্তে কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ, তাই সাক্ষাৎ কর্মসূচি বাতিল করা হলো। ওইদিন মির্জা আলমগীর সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, বেগম জিয়া অসুস্থ, তার চিকিৎসা প্রয়োজন। তিনি এও দাবি করেন যে, প্রয়োজনে বেগম জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠাতে হবে। যদিও ওই সংবাদ সম্মেলনেই মির্জা আলমগীর তার বক্তব্য সংশোধন করে বলেন, বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে। মুক্ত হওয়ার পর তিনিই সিদ্ধান্ত নেবেন তার চিকিৎসা দেশে করাবেন, না বিদেশে করাবেন।

এদিকে গত ২ এপ্রিল কালের কণ্ঠ এক বিশেষ প্রতিবেদনে লিখেছে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বিদেশে যেতে চাইলে সরকারের অনুমতি মিলতে পারে। তবে তার মুক্তভাবে দেশে অবস্থান নিরাপদ মনে করছে না সরকার। এ জন্য বিদেশে যেতে না চাইলে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি আরো দীর্ঘায়িত হতে পারে। আওয়ামী লীগ ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্রে এমন তথ্য পাওয়া গেছে বলে পত্রিকাটি উল্লেখ করেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা, বেগম জিয়াকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা সরকারের পক্ষ থেকে চালানো হতে পারে। আর এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে বিএনপির শীর্ষপর্যায়ের কোনো নেতার যোগসাজশ থাকতে পারে বলেও তারা মনে করছেন। এ প্রসঙ্গে তারা ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থার সময়ের উদাহরণ টানছেন। সে সময় ওই সরকার ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা বাস্তবায়নের জন্য বেগম জিয়াকেও বিদেশে পাঠাতে চেয়েছিল, যে প্রক্রিয়ার সঙ্গে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়াসহ প্রথম সারির বেশিরভাগ নেতাই সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ঘরপোড়া গরুর সিঁদুরে মেঘ দেখে ভয় পাওয়ার ন্যায় বেগম জিয়ার হঠাৎ অসুস্থতার খবর, পুত্রবধূর লন্ডন থেকে ঢাকায় আসা ও কারাগারে সাক্ষাৎ এবং দলের ভেতর থেকে তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর কথা বলাকে তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা সন্দেহের চোখে দেখছেন। আলাপচারিতায় তারা বলছেন, ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবরা তাদের পুরনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নতুন করে তৎপর হয়ে ওঠাটা বিচিত্র কিছু নয়। সে সঙ্গে আরো নতুন কিছু লোক যুক্ত হয়ে বেগম জিয়াকে মাইনাস করার চক্রান্ত করতে পারে। বলার প্রয়োজন পড়ে না, বিএনপি এখন একটি কঠিন সময় পার করছে। অনেকটা কাণ্ডারিবিহীন নৌকার মতো। তীর দেখা যাচ্ছে, কিন্তু সেখানে নিরাপদে পৌঁছার পথটাই যেন হারিয়ে ফেলেছে। কারাগারের বাইরে থাকা শীর্ষ নেতারা দলটির কর্মকাণ্ডে কাঙ্ক্ষিত গতি আনতে ব্যর্থ হচ্ছেন চরমভাবে। তারপরও মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মনোবল এখনো পর্যন্ত অটুট আছে। তবে বেগম জিয়ার কারামুক্তিতে যদি আরো বিলম্ব হয়, তাহলে তারাও যে হতোদ্যম হয়ে পড়তে পারেন সে আশঙ্কা অমূলক নয়। যদিও বিএনপি নেতারা দাবি করছেন, বেগম জিয়া জেলে যাওয়ার পর দলটি আগের চেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তবে বাস্তবে তাদের এ দাবির কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কর্মীদের ক্ষোভের বিষয়টি প্রতিনিয়ত প্রকাশ পাচ্ছে।

বলা যায়, ত্রিশঙ্কু অবস্থায় আছে বিএনপি। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কি বা বিএনপি কোন পথে যাবে তা হলফ করে বলা যাবে না। ভয়ানক এ সঙ্কট থেকে উদ্ধার পেতে হলে যে ধরনের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সিনিয়র নেতারা তা কতটুকু নিতে পারবেন এবং বাস্তবায়ন করতে পারবেন তার ওপরই দলটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

মহিউদ্দিন খান মোহন

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

mohon91@yahoo.com

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads