• সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads

মতামত

বাঙালির প্রাণের উৎসব বৈশাখ

  • প্রকাশিত ১২ এপ্রিল ২০১৮

বাংলা এবং বাঙালির ঐতিহ্যের প্রতীক, প্রাণের উৎসব ‘বৈশাখ’। বৈশাখ মানেই বাঙালির সর্বজনীন উৎসব। বৈশাখের ছন্দ-উচ্ছ্বাস ‘এসো হে বৈশাখ’ গানটিও যেন মিশে গেছে বাঙালি আর বৈশাখী উৎসবে। পহেলা বৈশাখ মানেই বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, যে উৎসবকে অস্বীকার করা যায় না। কারণ সব জাতি-গোষ্ঠী, মতাদর্শের লোকের কাছেই সমান গুরুত্ব বহন করে এই পহেলা বৈশাখ।

বৈশাখকে ঘিরে বাঙালির চেতনাজুড়ে রয়েছে অন্যরকম আবেগ। উৎসাহ ও দেশীয় সংস্কৃতিকে ধারণ করার আবেগ-অনুভূতি এই বৈশাখী আনন্দকে অর্থবহ করেছে। বৈশাখ মানে উচ্ছ্বাস, উত্তাপ আর উৎসবের আমেজ। চারদিকে সাজ সাজ রব। দেশের সব প্রান্তের মানুষের মনকে আলোড়িত করে, করে উচ্ছ্বসিত। বাংলাদেশের মানুষের বিশ্বাস বৈশাখের আগমন ঘটে শুচি-শুভ্র-নির্মল-পবিত্রতায়। সারা বছরের যত জঞ্জাল ধুয়ে-মুছে নতুন করে স্বপ্নে-উচ্ছ্বাসে দিন শুরু করা। যেখানে নতুন দিনের নতুন ভাবনায় সময়, সমাজ এবং জীবনকে রাঙিয়ে তোলা যায়।

‘মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা,/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।/ রসের আবেশরাশি শুষ্ক করি দাও আসি/ আনো, আনো, আনো তব প্রলয়ে শাঁখ/ মায়ার কুজ্ঝটি-জাল যাক দূরে যাক।/ অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক.../ এসো, এসো, এসো, হে বৈশাখ.../ এসো এসো’— এ গানটি না হলে যেন বৈশাখ পালনে অপূর্ণতাই থেকে যেত। দেশজুড়ে বৈশাখজুড়ে মেলা আর আনন্দ মানেই এসো হে বৈশাখ গানটি।

বছর ঘুরে প্রত্যেক বাঙালির আঙিনায় বৈশাখের আগমন ঘটে আলাদা আবেগ আর দেশীয় চেতনা নিয়ে। বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ পালন যেন দেশীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, যেখানে বিভেদহীন সমাজ গঠনের ডাক দিয়ে যায়। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে শহর, গ্রামগঞ্জে নানা উৎসব-পার্বণের আয়োজনে পরিবেশ থাকে মুখরিত। বৈশাখের এ সর্বজনীন উৎসব দেশের প্রতিটি মানুষকে নানাভাবে ঐতিহ্যের ভাবনায় সমৃদ্ধ করে। উৎসব আর আনন্দ-উল্লাসে মাতোয়ারা বাঙালি জাতি প্রতিটি উৎসবকেই উদযাপন করে একান্ত সামাজিকতায়, আন্তরিকতার সবটুকু বিলিয়ে দিয়ে। বৈশাখের বেলায় এর ব্যতিক্রম তো নয়ই, বরং আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে যায় আমার ঐতিহ্যকে ধারণ করে। বাংলা নতুন বছর মানেই বাঙালির প্রাণের স্পন্দন, সত্য ও সুন্দরের জয়গান।

বৈশাখজুড়ে শুধুই কি আনন্দ উৎসব? মোটেই না, সারা দেশে বৈশাখী মেলায় বাংলার সংস্কৃতি ও লোকশিল্পকে ছড়িয়ে দিতে অবদান রেখে চলেছে এই সর্বজনীন উৎসবটি। বৈশাখ তার আপন ঐতিহ্যকে ছড়িয়ে দেয় স্ব-মহিমায়, প্রতিটি বাঙালির অন্তরে। বৈশাখের আঁকিবুঁকিতে বাঙালি নারী আর শিশুদের নানা রঙের পোশাকের সাজ ও ছেলে-বুড়োদের বৈশাখী পোশাকে চেতনাকে জাগিয়ে দেয় অন্যরকম স্বাদে। বৈশাখী মেলা মানেই বাঙালির সর্বজনীন মিলনমেলা।

পহেলা বৈশাখ উদযাপনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ঢাকা শহরে বৈশাখের প্রথম দিনে মঙ্গল শোভাযাত্রা। বর্তমানে সংস্কৃতির ঐতিহ্য হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে এই শোভাযাত্রা সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে। রমনার বটমূলে অসাম্প্রদায়িক আনুষ্ঠানিকতা বৈশাখ যাপনের গুরুত্বকে বাড়িয়ে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর দেশপ্রেমের এই শোভাযাত্রায় শুদ্ধতা চর্চাকে উৎসাহিত করে, আগামীর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে চলতে পথ দেখায়। যদিও নিরাপত্তার কারণে এবারো এই শোভাযাত্রায় রয়েছে সরকারি নির্দেশনা, রয়েছে বিধি-নিষেধ। এতে উৎসবের সীমাবদ্ধতা এলেও নিরাপত্তার স্বার্থে আমাদের সচেতন ও সোচ্চার হওয়া জরুরি।

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছাত্র-শিক্ষকদের উদ্যোগে ১৯৮৯ সালে মঙ্গল শোভাযাত্রার শুভ সূচনা হয়। বিশাল আয়োজনের এ মঙ্গল শোভাযাত্রায় হাতি, বাঘ, ঘোড়া, পাপেট, ময়ূর, লক্ষ্মীপেঁচা, কুমিরসহ নানা ধরনের মুখোশ শোভা পায়। শিল্পী, কবি-সাহিত্যিকদের স্ব-প্রতিভ পদচারণায় এ দিনটি থাকে উৎসবমুখর। বৈশাখের আগমনে প্রাণের জোয়ার জাগে বাঙালির প্রাণে প্রাণে। ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে পহেলা বৈশাখ বাঙালির মন-মননে অন্যরকম আনন্দ উৎসবের ভাবনাকে নাড়া দিয়ে যায়।

বৈশাখী মেলায় বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে রাখা হয় নাগরদোলা, পুতুলনাচ ও সার্কাসসহ মেলার ক্লান্তি দূর করতে যোগ হয় নানান স্বাদের গান। গ্রাম ও শহরে উৎসবের ভিন্নতা থাকলেও আনন্দের মাত্রাটা সবখানে সমান। বৈশাখ মানে মেলা আর খেলাই নয়, বাঙালির খাবার-দাবারে রয়েছে উৎসবের আমেজ।

পার্বত্য এলাকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও নানা আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয়ে থাকে। বর্ষবরণে চাকমা ও মারমারা উৎসব পালন করে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে। বৈশাখী পূর্ণিমা উদযাপনেও নৃগোষ্ঠীর ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা বহুকাল থেকে পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে আদিবাসী সমাজ এই বৈশাখে ঐতিহ্যবাহী পিঠা উৎসব, খেলাধুলার আয়োজন, বৌদ্ধ মন্দিরে বুদ্ধ প্রণাম, ধর্ম উপদেশ প্রার্থনাসহ নানা ধরনের কর্মযজ্ঞ করে থাকে। অপরদিকে কোঁচ, সাঁওতাল, ওরাও, গারো, ম্রো, মোরাং, মান্দাই, হাজংসহ অন্যান্য আদিবাসী তাদের নিজ নিজ সংস্কৃতি অনুযায়ী বৈশাখ উদযাপন করে থাকে অনেকটা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে। আর এভাবেই এদেশে জাতি-ধর্ম ভেদকে উপেক্ষা করে বৈশাখ হয়ে ওঠে সর্বজনীন উৎসব।

বৈশাখ আসে নতুনের আগমনে, পুরনোকে বিদায় করে বাংলা এবং বাঙালির জীবন ও সময়কে রঙিন-মঙ্গলময় করে দিতে। যত পাপ-তাপ-গ্লানি মুছে দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে বৈশাখ। বাঙালি সারা বছরের জীর্ণতা শেষে নতুন দিনের প্রত্যাশায় বরণ করে নেয় বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ, নববর্ষকে। পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রেরণা। শত ব্যস্ততায়ও মহাকালের চিরায়ত নিয়মে বৈশাখ বরণে, নববর্ষের উদ্দীপনায় মেতে ওঠে বাংলার সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। বৈশাখ যে বাঙালির সর্বজনীন উৎসব, তার প্রমাণ এই বৈশাখের প্রথম দিন এবং বৈশাখ বরণে সবার অংশগ্রহণে আনুষ্ঠানিকতা। বলতে দ্বিধা নেই, পহেলা বৈশাখই হতে পারে বাঙালির জাতীয় উৎসবের দিন, যার উৎসব হিসেবে কোনো আলাদা ভিন্নতা নেই। সবার জন্য এই উৎসব একই অনুপ্রেরণায় উজ্জীবিত।

বাংলা নববর্ষ আসে বারোটি মাসের তেরো পার্বণ নিয়ে। এই বারো মাস নিয়েও রয়েছে নামকরণের ঐতিহ্যগাথা কথকতা। বছরের পহেলা মাস বৈশাখকে ঘিরে যতটা উত্তাপ, অন্য মাসগুলোতে তেমনটা না হলেও ষড়ঋতুর বৈচিত্র্যে ভরপুর বাংলায় বারোটি মাসে উৎসবের কমতি থাকে না। বাংলা আর বাঙালি মানেই উৎসব-আমুদে উল্লসিত জাতি। ঐতিহ্যকে লালন করে এ জাতি বিশ্বের দরবারে তাদের গৌরবগাথাকে তুলে ধরে আপন স্বকীয়তায়।

বৈশাখ আসে নতুনের আগমনে, পুরনোকে বিদায় করে বাংলা এবং বাঙালির জীবন ও সময়কে রঙিন-মঙ্গলময় করে দিতে। অবিরাম শুভ কামনায় বাংলা নববর্ষ মঙ্গলময় হোক, সত্য-সুন্দরের চর্চায়। সত্য আর সুন্দরের জয়গানে আমাদের আগামী দিনগুলো পূর্ণতা পাক সুখ-সমৃদ্ধিতে। শুভ হোক আসন্ন বাংলা নতুন বছর— ১৪২৫।

 

সফিউল্লাহ আনসারী

সংবাদকর্মী

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads