• রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads

মতামত

স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল পহেলা বৈশাখ

  • আতাহার খান
  • প্রকাশিত ১৫ এপ্রিল ২০১৮

আজ পহেলা বৈশাখ। প্রকৃতিতে এখন চঞ্চল আর অস্থিরতার আমেজ। চারদিকের গাছ-গাছালির পাতায় পাতায় সবুজ জমিয়ে বসেছে। এমন পরিবেশে নতুন সূর্যোদয়ের মধ্য দিয়ে পথচলা শুরু হলো নতুন বছর ১৪২৫, বাংলা নববর্ষের। এদিনের সূর্যোদয় পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের কাছে গতানুগতিক মনে হলেও, এই জনপদের মানুষের কাছে সম্পূর্ণ আলাদা আবেগ-অনুভূতি-উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠা একটি মাধুর্যমণ্ডিত দিন। পহেলা বৈশাখ আমাদের একমাত্র উৎসব যেখানে বাঙালি পরিচয়কে সবচেয়ে গুরুত্ববহ করে তোলে। তাই দিনটি একইসঙ্গে শহর ও গ্রামে সর্বজনীনভাবে পালিত হয়। আয়োজন করা হয় নানা ধরনের অনুষ্ঠান আর মেলার। কবে থেকে কোন সুপ্রভাতে প্রথম শুরু হয়েছিল বৃহত্তম এই সাংস্কৃতিক উৎসব, তার সঠিক ইতিহাস জানা না গেলেও মোগল সম্রাট আকবরের পুণ্যাহের ধারাবাহিকতার সঙ্গে নববর্ষের ঐতিহ্যের মিল খুঁজে পান অনেকে। হ্যাঁ, সম্রাট আকবর ‘তারিখ-ই-ইলাহি’ চালু করেছিলেন ৯৬৩ হিজরি অর্থাৎ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে। ৯৬৩ হিজরি সনকে সৌর সনে পরিবর্তিত করে বাংলা সনের উৎপত্তি হয়। বর্ষপঞ্জি সংস্কারের ক্ষেত্রে সম্রাট আকবর সত্যিই দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তার অব্দটি হলো  সৌর অব্দ আর গণনার পদ্ধতিটিও ছিল সৌরভিত্তিক। ঋতুর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অব্দ আবর্তিত হয় এবং এর প্রচলন হয় সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের দিন থেকে। বঙ্গাব্দের শুরু নিয়ে কোনো কোনো পণ্ডিত অবশ্য ভিন্নমত পোষণ করেন। তারা মনে করেন রাজা শশাঙ্কই বঙ্গাব্দের প্রবর্তক। এ নিয়ে আরো একটি মত চালু আছে, সেটি হলো মধ্যযুগে হোসেনশাহীর আমলে প্রচলন ঘটে বঙ্গাব্দের। তিনি বাংলাভাষা উন্নয়নে সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন—এর ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে। কিন্তু বঙ্গাব্দ প্রচলনে তার সংশ্লিষ্টতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা যায়নি। তাই উল্লিখিত ওই দুই মতই ঐতিহাসিক প্রমাণ, যুক্তি, তথ্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের অভাবে হালে পানি পায়নি।

বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম সংস্কার হয় ১৯৫২ সালে ভারতের বিশিষ্ট জ্যোতির্পদার্থবিদ ড. মেঘনাদ সাহার হাত দিয়ে। ১৯৫৭ সালে ভারত সরকার তার এই সংস্কারের সুপারিশ গ্রহণ করেন। ড. সাহার সেই সুপারিশকেই সামনে রেখে ১৯৬২-৬৩ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা বর্ষপঞ্জি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশিষ্ট ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি ১৩৭১ সন থেকে তাদের সুপারিশ কার্যকর করার নির্দেশ দেয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাজউদ্দীন আহমদই প্রথম সরকারি নথিতে স্বাক্ষরসহ বাংলা সন চালুর নির্দেশ দেন। পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে সেই একই কার্যধারা চালু রাখেন। এরপর অনেক পথ-ঘাট পার হয়ে ১৯৮৭ সালে এসে জেনারেল এরশাদ সরকার সব কাজকর্মে ইংরেজি সন-তারিখের পাশাপাশি বাংলা তারিখ লেখার  নির্দেশ দেয় এবং তারা শহীদুল্লাহ কমিটির সুপারিশ গ্রহণ করে বাংলা ক্যালেন্ডার তৈরির নির্দেশও জারি করে। কিন্তু তখন লিপইয়ার নিয়ে দেখা দেয় নতুন সমস্যা। শহীদুল্লাহ কমিটির লিপইয়ার নিয়ে এই অস্পষ্টতা ও সমস্যা দূর করার উদ্যোগ আবারো নেওয়া হয় গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে। বাংলা একাডেমির উদ্যোগে বর্ষপঞ্জি সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি ১৪ এপ্রিলকে বাংলা বর্ষের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ বৈশাখ হিসাবে নির্দিষ্ট করে। এতে  বাংলা ও ইংরেজি সালের তারিখ নিয়ে বাংলাদেশে আর কোনো সমস্যা না থাকলেও বৃহত্তর অর্থে সমস্যা দূর হয়ে গেছে বলা কঠিন। বাংলাদেশের বাইরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আগরতলায় পহেলা বৈশাখ পালিত হয় ১৫ এপ্রিল। একদিন আগে-পিছের এই সমস্যা বহির্বিশ্বেও দেখা যায়। সেখানেও বাংলাদেশি আর ভারতীয় বাঙালিদের মধ্যে পহেলা বৈশাখ পালন নিয়ে বিরাজ করছে সেই একই সমস্যা। আমাদের অজানা, পহেলা বৈশাখ নিয়ে এই জটিলতা আসলেই কি দূর হবে?

দুই.

পহেলা বৈশাখ উৎসবটি কীভাবে বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠল, এ নিয়ে আছে নানা মত। ইরানের নববর্ষ হলো ‘নওরোজ’। তাদের সেই উৎসব প্রাক-ইসলাম থেকে পালিত হয়ে আসছে। ইউরোপীয় ও আমেরিকানরা নিউ ইয়ার্স ডে পালন করে ১ জানুয়ারি। গ্রিক ও রোমানরা নববর্ষ পালন করেন যিশুখ্রিস্টের জন্মের  বহু আগে থেকে। তবে কোনো কোনো পণ্ডিত ও গবেষক মনে করেন, বছরের শেষদিন চৈত্রসংক্রান্তি এবং বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ, এই দুদিন উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানের প্রচলন হয় ইংরেজ আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা চালু হওয়ার পর থেকে। এসব উৎসব হতো জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায়, সঙ্গে থাকত ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ও। সেখানে কবিয়ালদের গান থাকত, থাকত নানা উৎসব আয়োজন। প্রশ্ন উঠতে পারে, পকেটের পয়সা খরচ করে কেন জমিদাররা নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করতেন? হ্যাঁ, উদ্দেশ্য তো ছিলই— সেটি হলো বকেয়া পাওনা ও খাজনা আদায়। আর সময়টাও বেছে নেওয়া হয়েছিল বৈশাখের প্রথম দিনকেই। কারণ তখন ঘরে ঘরে নতুন ফসল উঠত, কৃষকের চোখে-মুখে থাকত আনন্দের ছটা। পহেলা বৈশাখের শুরুটা ছিল এভাবেই। বাংলা একাডেমির বর্তমান ডিজি শামসুজ্জামান খানও তার এক রচনায় উল্লেখ করেছেন, পহেলা বৈশাখের উৎসব প্রথম শুরু হয় ঠাকুর পরিবারের উদ্যোগেই এবং সেখান থেকেই পর্যায়ক্রমে এই উৎসব ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে পহেলা বৈশাখ পালনের প্রথম খবর পাওয়া যায় প্রখ্যাত সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরীর লেখায়। তিনি লিখেছেন, ‘সেদিনের পহেলা বৈশাখে মাহবুব আলী ইনস্টিটিউটের মঞ্চটি আমার চোখের সামনে এখনো জ্বলজ্বল করে ভাসছে। মঞ্চে অন্যান্যের মধ্যে উপবিষ্ট ছিলেন অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ও অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী।’ উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ১৯৫১ সালে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেছিল ‘লেখক-শিল্পী মজলিস’ নামে একটি সংগঠন। অনুষ্ঠানটি করার জন্য চাঁদাও তোলা হয়েছিল। ’৪৭-এর দেশবিভাগের পর ঢাকাকে কেন্দ্র করে যে মুসলিম বাঙালি মধ্যবিত্তের উদ্ভব ঘটে, সেখানে তাদের চিন্তা-চেতনায় এবং ভাবনায় পহেলা বৈশাখ নিয়ে কোনো আগ্রহই ছিল না। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকেই মূলত শুরু হয় সমাজের এই অংশের মধ্যে আত্মপরিচয় সম্পর্কে নতুন জিজ্ঞাসা। তারা পর্যায়ক্রমে শুরু করতে থাকে সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞানের অনুসন্ধান। ভেতরে ভেতরে তাদের মধ্যে পরিত্যক্ত সাংস্কৃতিক আচার-অনুষ্ঠান পুনরুজ্জীবনের আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়ে ওঠে। তার মধ্যে একটি হলো, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের আমলে পহেলা বৈশাখ সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা। সরকারিভাবে এই ছুটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। দ্বিতীয়টি হলো, ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালন করতে বাধা দেওয়া এবং তৃতীয়টি ১৯৬৬ সালে পাকিস্তানি বেতারে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। পর্যায়ক্রমে এ তিনটি ঘটনার মধ্য দিয়ে শিক্ষিত বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়কে তার স্বাধীন সাংস্কৃতিক পরিচয় খুঁজে বের করতে প্রচণ্ডভাবে উদ্বুদ্ধ করে। ১৯৬৭ সালের পর থেকে ছায়ানটের উদ্যোগে রমনা বটমূলে সঙ্গীতায়োজন, আর একে ঘিরে ভ্রাম্যমাণ মেলা এবং ১৯৮৭ সালের পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাত্র-শিক্ষকদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে আয়োজিত মঙ্গল শোভাযাত্রা সত্যিকার অর্থেই পহেলা বৈশাখ উৎসবে নতুন এক মাত্রা যোগ করে। সর্বশেষ অর্জন হলো, স্বাধীন বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে পহেলা বৈশাখকে জাতীয় উৎসব পালনের মর্যাদায় অভিষিক্ত  করা। শুধু সমতল ভূমির বাংলাভাষীরাই নয়, পহেলা বৈশাখ আদিবাসী জনগোষ্ঠীরও উৎসবের দিন। বৈসাবি উৎসব পাহাড়ি আদিবাসীদেরও অন্যতম প্রধান আনন্দোৎসব।

বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনকে ঘিরে বাঙালির যে এত বড় উৎসব-আয়োজন, এর ইতিহাস কিন্তু খুব পুরনো নয়। মধ্যযুগের কবিতায় পহেলা বৈশাখের কোনো উল্লেখ কোথাও নেই। নাগরিকতার ছোঁয়া পেতে এ উৎসবকে অনেক দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। তারপরও কি সেই মর্যাদা আমরা আমাদের কাজের মধ্য দিয়ে সমুন্নত রাখতে পেরেছি? পহেলা বৈশাখের সর্বজনীনতা রক্ষার স্বার্থেই আমাদের এর আরো গভীরে প্রবেশ করতে হবে।

তবে এ কথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, গ্রেগরি প্রবর্তিত বর্ষপঞ্জির আধিপত্য আসলেই অপ্রতিরোধ্য— আমাদের প্রতিদিন তো বটেই, জাতীয় জীবনেও এ পঞ্জিকার অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ়। আমাদের বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বর, আমাদের স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ, আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি— কোথায় নেই এর প্রভাব! সরকারি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে দিন-গণনা শুরু হয় গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জিকা অনুযায়ী। এসব জায়গায় বাংলা সনের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। শুধু একদিনের অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্যেই কি বঙ্গাব্দ বেঁচে থাকবে? এ থেকে কি বেরিয়ে আসা যায় না?

সে যা-ই হোক, ১৪২৫ সনের পথচলা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন জাগে, বছরটি কেমন কাটবে? উত্তর— ভালো। পহেলা বৈশাখের সর্বজনীনতা রক্ষার স্বার্থেই আজ আমাদের এর আরো গভীরে প্রবেশ করতে হবে। আশার বসতি সাজিয়েই আমরা বলতে চাই, আমরা আশাবাদী— বাংলাদেশ আরো উন্নত ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে। এই পথচলায় সঙ্গে থাকবে আমাদের স্বকীয় সাংস্কৃতিক পরিচয়ও।

 

লেখক : বাংলাদেশের খবরের নির্বাহী সম্পাদক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads