• রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads

মতামত

খেলাপি ঋণের লাগাম টানা জরুরি    

  • প্রকাশিত ১৬ এপ্রিল ২০১৮

আমানত সংগ্রহ করা এবং ঋণ বা অগ্রিম প্রদান করা ব্যাংকের দুটি প্রধান কাজ। মূলত ব্যাংকের আয়ের সিংহভাগ আসে প্রদত্ত ঋণের সুদ থেকে। ঋণ এবং ঝুঁকি পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ঋণ প্রদানে ঝুঁকি থাকবেই। আর ঝুঁকি নিয়েই ব্যাংক কাজ করতে অভ্যস্ত। বাংলাদেশ ব্যাংকের কোর রিস্ক গাইডলাইন মোতাবেক ব্যাংকগুলোকে ছয়টি ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। এই ছয়টি রিস্কের অন্যতম হচ্ছে ক্রেডিট রিস্ক বা ঋণ ঝুঁকি। তাই ঋণ প্রদান করে ঝুঁকি গ্রহণ করার ক্ষেত্রে ব্যাংক সর্বোচ্চ সাবধানতা অবলম্বন করে থাকে। সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও ঋণ খারাপ হতে পারে। ঋণ খারাপ হওয়ার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। যার মধ্যে কিছু হলো ঋণগ্রহীতা নির্বাচনে ভুল করা, যথাযথ পর্যালোচনা না করে ঋণ প্রদান, ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত না করা, গ্রাহক সম্পর্কে যথাযথ খোঁজখবর না নেওয়া, ঋণের জামিনদার নির্বাচনে ভুল করা, ঋণের বিপরীতে যথাযথ জামানত না রাখা, সর্বোপরি ঋণ প্রদানের পরে তদারকির অভাব ইত্যাদি।

উল্লিখিত কারণগুলো ছাড়াও বড় আকারের ঋণ খেলাপি হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণগুলো হচ্ছে ঋণ প্রদানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ঋণ প্রদানে দুর্নীতি, ঘুষ আদান-প্রদান, ইচ্ছাকৃত অনিয়ম অর্থাৎ নিজে সুবিধাপ্রাপ্ত হয়ে ঋণ মঞ্জুর করা ইত্যাদি। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে যে কয়টি বড় ঋণ জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে তার সবকয়টিতে উপরে উল্লিখিত কারণগুলোর কোনো না কোনোটি জড়িয়ে আছে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন। তবে প্রকৃত ব্যবসা মন্দার কারণেও বেশ কিছু ঋণ খেলাপি হয়েছে। যেমন- ভোগ্যপণ্য খাত, রিয়েল এস্টেট খাত, জাহাজভাঙা শিল্প, আমদানি অর্থায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে  দেওয়া ঋণ।

এবারে দেশের ঋণ পরিস্থিতির দিকে একটু নজর দেওয়া যাক। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৯ দশমিক ৩১ শতাংশ। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর শেষে যা ছিল ৬২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা। উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৯৮ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। এটি পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে ডিসেম্বর ২০১৭ শেষে রাষ্ট্রীয় খাতের সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা যা মোট বিতরণ করা ঋণের ২৬ দশমিক ৫২ শতাংশ। বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ। বিদেশি ৯ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা এবং বিশেষায়িত দুটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিই সবচেয়ে বেশি এবং এটি একটি বড় সমস্যা। ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ গ্রহীতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে খেলাপি ঋণ সংস্কৃতি থেকে বের হওয়া দুরূহ হবে। এ বিষয়টি নিয়ে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। অন্যথায় আমাদের ব্যাংক খাত দিনে দিনে রুগ্ণ হতে বাধ্য।

খেলাপি ঋণের কষাঘাতে বেশি জর্জরিত আমাদের সরকারি ব্যাংকগুলো। তবে দিনে দিনে এই রোগ সংক্রমিত হচ্ছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও যা অতিমাত্রায় উদ্বেগের বিষয়। সাধারণত ধরে নেওয়া হয় বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে সুশাসন এবং জবাবদিহিতা অনেক বেশি। তা সত্ত্বেও কেন খেলাপি ঋণ বাড়ছে তার কারণ খুঁজে বের করতে হবে। খেলাপি ঋণের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ২ শতাংশের নিচে, যা থেকে আমাদের ব্যাংক খাত অনেক উপরে অবস্থান করছে। ব্যাংক খাত অর্থনীতির অন্যতম নিয়ামক। এটি যদি সঠিকভাবে চলতে না পারে তাহলে যেকোনো দেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসতে বাধ্য। তাই নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে ব্যাংক খাতটিকে সকল বিতর্কের বাইরে রাখা। খেলাপি ঋণের কারণে আমাদের ব্যাংক ব্যবস্থার কার্যকর বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণে ব্যাংকের ঋণদান সক্ষমতা হ্রাস পাবে ও ব্যাংকের খরচ বাড়বে। ব্যাংকের খরচ বাড়লে তা গিয়ে গ্রাহকের ওপর পড়বে। আমানত ও বিনিয়োগের সুদের হারের ব্যবধান ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার বাংলাদেশ ব্যাংকের যে নির্দেশনা তা পরিপালন করতে গিয়ে ব্যাংকগুলো হিমশিম খাবে। ব্যাংকগুলোর মুনাফার ধারা বজায় রাখতে বাধ্য হয়েই ভবিষ্যতে ঋণের মূল্য তথা সুদের হার বাড়িয়ে দিতে হতে পারে।

আবার সুদের হার বাড়া মানে উৎপাদন ও বিপণন খরচ বাড়া। ব্যবসা-বাণিজ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা আমাদের দেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না। এটি দেশের অর্থনীতির জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মতে খেলাপি ঋণ সমস্যা দূর করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং করপোরেট গভর্নেন্সের উন্নয়ন করতে হবে। এ ছাড়া ব্যাংক খাতের বড় সমস্যা খেলাপি ঋণ কমাতে আইনি সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করে সংস্থাটি। উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হতে যে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়, সেসব শর্ত পূরণ করে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের পথে যাত্রা শুরু করেছে। উল্লেখ্য, উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার জন্য যেসব শর্ত রয়েছে, এর মধ্যে প্রথম হলো মাথাপিছু আয় ১ হাজার ২৪২ মার্কিন ডলার হতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৬১০ মার্কিন ডলার। দ্বিতীয়ত, মানবসম্পদের উন্নয়ন অর্থাৎ দেশের ৬৬ ভাগ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের ৭২ দশমিক ৯ ভাগ মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি হয়েছে। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর না হওয়ার মাত্রা ৩০ ভাগের নিচে হতে হবে। বাংলাদেশে এ মুহূর্তে তা ২৫ ভাগ।

আগামী ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখলে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক উত্তরণ ঘটবে। তবে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের স্তরে চূড়ান্তভাবে উত্তরণ নিশ্চিত করতে পরবর্তী তিন বছরের জন্য নির্দিষ্ট কিছু সূচকে অর্জনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। এই অর্জন ধরে রাখতে ব্যাংক খাতকে বিরাট ভূমিকা রাখতে হবে। এই খাতের তথা আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা বজায় রাখা বিশেষ প্রয়োজন। সবাইকে ব্যাংক খাতের বিধিবিধান মেনে চলতে বাধ্য করা প্রয়োজন। খেলাপি ঋণের চলমান ধারা চলতে দেওয়া যাবে না। খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রয়োজনে বিশেষ কমিশন গঠন করা যেতে পারে। খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোর টার্গেট মাসিক ভিত্তিতে মনিটর করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। খেলাপি ঋণ আদায়কারীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা উচিত। অনিচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ গ্রহীতাদের জন্য পুনরায় ঋণের ব্যবস্থা করে তাদের জন্য নতুন করে ব্যবসার সুযোগ দেওয়া উচিত। ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ গ্রহীতাদের সামাজিকভাবে বর্জন করতে হবে। খেলাপি ঋণ গ্রহীতাদের ক্ষেত্রে চীন যে ব্যবস্থা নিয়েছে আমাদের দেশে সেই রকম কিছু করা যেতে পারে। ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক নিয়োগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে প্রকৃত ব্যাংকার এবং অর্থনীতিবিদদের নিয়োগ দেওয়া উচিত। বর্তমান সময়ে আলোচিত ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের যথাযথ আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। খেলাপি ঋণের রাশ টেনে ধরার সময় সমাগত। তা না হলে আমাদের সব অর্জন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।

 

আনোয়ার ফারুক তালুকদার

ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads