• বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads

মতামত

আলোচনা-সমালোচনায় গণমাধ্যম

  • প্রকাশিত ১৯ এপ্রিল ২০১৮

গণতন্ত্রের একটি পূর্বশর্তই হলো, বাক-স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করা। সভা-সমাবেশ, আড্ডা কিংবা ঘরোয়া আলোচনায় বিষয়ভিত্তিক বা অনির্ধারিত নানা দৃষ্টিভঙ্গি, অভিমত, মতদ্বৈততার বহিঃপ্রকাশ তো ঘটেই। এসব আড্ডা বা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বক্তারা অধিকাংশই নিজেদের সংযমের মাত্রা বজায়ে কিছুটা হলেও সচেতন থাকেন। এ ছাড়া এমন গঠনমূলক আলোচনা বা সমালোচনায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের মধ্যেও একটা পারস্পরিক সম্মান রক্ষায় দায়বদ্ধ সম্পর্কও থাকে সাধারণত। মূলত, ভিন্নমতের সংমিশ্রণ হলেও প্রত্যেকেরই জনস্বার্থের একটা লক্ষ্য থাকে। এই বিশ্বায়নের যুগে মিডিয়া তথ্যের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে জন্মলগ্ন থেকেই বস্তুনিষ্ঠ একটা ভূমিকা রেখেও আসছে। প্রায় সব মিডিয়াই ক্ষমতাসীন ও বিরোধীদলসহ অন্য সব দলের সমালোচনা বা গঠনমূলক ব্যাখ্যা-বিবৃতির দ্বারা ব্যক্তি বা দলের সিদ্ধান্তের ত্রুটি-বিচ্যুতি চিহ্নিত করে থাকে। বহু ক্ষেত্রেই মতবিনিময়ের বিষয়টি মিডিয়া বক্তার বক্তব্যের মাধ্যমে বা তাদের লেখনীর দ্বারা জনসমক্ষে আনার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। পক্ষপাতহীন মিডিয়া— দল ও সমাজে গতি-প্রকৃতির ওপর নিয়তই প্রভাব ফেলে আসছে। মূলত, রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রিত সীমারেখায় সংযত রাখার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি মিডিয়াই পালন করে থাকে। যুদ্ধ, সংগ্রাম, আন্দোলন সবকিছুতেই পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবেও মিডিয়ার গুরুত্ব অপরিসীম।

আবার কখনো-বা এই মিডিয়াই অদৃশ্য চাপে পড়ে বা কোনো গোষ্ঠী বা দলের মৌন সমর্থনের কারণে কিংবা ব্যবসায়িক মুনাফা লাভের জন্য নীতিমালার বাইরে এসেও কোনো বিতর্কের জন্ম দেয়। সংক্ষুব্ধ রাজনীতিবিদ, দলছুট নেতা, অরাজনীতিবিদ, কথিত সুশীল বা আদর্শচ্যুত নামধারী বুদ্ধিজীবী কিংবা চমক সৃষ্টিকারী ব্যক্তি, হলুদ সাংবাদিকদের মাধ্যমে ফরমায়েশি বক্তব্য বিবৃতি বা লেখনীর দ্বারা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে ফায়দা লোটারও চেষ্টা করে থাকে। অসচেতন অনেক সাধারণ মানুষ এসব যাচাই না করেই তাদের গল্প-কাহিনীগুলোকে বিশ্বাস করে ভোটের রাজনীতি খেলার দাবার ঘুঁটি হয়ে জ্ঞানশূন্যতার দোটানায় পড়ে নিজেদের বিচার-বুদ্ধিও হারায়। ওদিকে নাটের গুরুরা মঞ্চে পর্দার আড়াল থেকে, বিজয়ের শেষ হাসি হাসার জন্যই নিজেদের তৈরি রাখে।

দেশের স্বার্থে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা বা সমালোচনা- অবশ্যই তা গুরুত্ব রাখে। সাম্প্রতিককালে, ব্যাঙের ছাতার মতো দলের নামে, বেনামে কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থেও বহু পত্রিকা বা চ্যানেলের আবির্ভাব ঘটেছে। পত্রিকা বা চ্যানেলের সংখ্যাধিক্যতার কারণেই— স্পন্সর, বিজ্ঞাপন ইত্যাদি পাওয়ার দৌড়ের ফলে, তাদেরও নীতিমালার সঙ্গে আপস করে অপপ্রচারের ডালপালায় চড়তে হচ্ছে বাধ্য হয়েই।

এখন নীতি ও আদর্শের রন্ধ্রে-রন্র্লেই অনুপ্রবেশ করেছে মিথ্যা সংবাদের একটা ভীতি। সমাজ সচেতন কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক বা বিশ্লেষকরাও হয়ে পড়েছেন আজ কোণঠাসা। মিডিয়ার কথামতো অনুকরণ বা অনুসরণ না করলেও মিডিয়ার কর্ণধাররা অলিখিতভাবেই ওইসব প্রথিতযশা লেখক বা জ্ঞানীদের বয়কট করে বলেও শোনা যায়। হুঁতুম-পেঁচার ডায়রির কপি নকল করে লিখে অখ্যাতরাও মঞ্চ-মাঠ-ময়দানে স্বীকৃতি বাগিয়ে নিয়ে আত্মতুষ্টি লাভ করছে এমন উদাহরণও কম নয়। মূল্যবোধ আর চেতনার অন্ধকার গৃহে আলোর জন্য তখন ছটফট করে মাথাকুটেই মরে। পরিচ্ছন্ন সাংবাদিকতাও তখন কলুষিত হয় নগ্নভাবে, যখনই তারা মাঠে নামে ব্যবসায়িক বা অন্য কোনো গোপন মনোবৃত্তি নিয়ে, যখন ভিন্ন ভিন্ন মেরুতে অবস্থান নেয় গোটা সাংবাদিক কূল। যা প্রায় সবশ্রেণির পাঠকসমাজকেই সহজে প্রভাবিতও করে।

ইদানীংকালে কোনো চমকপ্রদ বা চটকদার খবর ছাপিয়ে বা সম্প্রচার করে কোনো কোনো মিডিয়ার লাইম লাইটে আসার একটা প্রবণতাও লক্ষ করা যায়। সঠিক তথ্যগুলো যদি রাষ্ট্রের তথা জনকল্যাণে কিংবা দুর্নীতি বা অপরাধ নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে হয়, তবে উপস্থাপন বা পরিবেশনের দিকগুলোও কৌশলগত সাংবাদিকতার ভাষায় তার নীতি ও আদর্শের আলোকেই প্রকাশযোগ্য। এমনিতেই এ দেশের রাজনীতিতে যে দোলাচল অবস্থা, এই সুযোগে কেউ যদি আবার নিভু আগুনে ঘি ঢালার ব্যবস্থা করে— তবে সেটাই হবে নিন্দনীয় বা নিকৃষ্টতম কাজ। এই সভ্যসমাজেও প্রতিষ্ঠিত অনেক নাগরিকদেরই ছোট-বড় দোষত্রুটি থাকতেও পারে। সে জন্য, এ দেশে প্রচলিত আইন ও বিচার ব্যবস্থাও তো আছে। উপযুক্ত সাক্ষ্য, দালিলিক প্রমাণের দ্বারা তাদের প্রত্যেককেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানোও যায়। যদি রাষ্ট্রীয় আইন ও বিচারব্যবস্থা নিরপেক্ষতা না হারায়। কিন্তু, মিডিয়া বা সংবাদকর্মীরা যদি অসৎ কোনো উদ্দেশ্যে ঝানু গোয়েন্দার মতো কারো থলের বেড়াল বের করার চেষ্টায় নামে তবে, এটাই ওই মিডিয়ার হীনমানসিকতার পরিচয়ও বহন করবে। অন্যায় বা লঘু অপরাধের বিষয়টিকে অধিকতর কদর্য করার মানসিকতায় যদি কারো পারিবারিক বা বংশগত নাড়ি-নক্ষত্রের কিসসা কাহিনীকে অতিরঞ্জিত করে তার সম্মানকে ধুলোয় লোটানোর প্রচেষ্টা করা হয়, তবে তা হবে মিডিয়ারই এক গর্হিত কাজ। ব্যক্তি অপরাধের বিষয়ে তদন্তের স্বার্থে অত্যাবশ্যক না হলে, এইসব নোংরামি পরিহার করাই উচিত সবারই?

সেলিব্রেটি বা সুশীল ব্যক্তি কিংবা রাজনীতিবিদদের চরিত্র হননে এতটা অমার্জিত হওয়াও, কোনোভাবেই সুস্থ ধারার সাংবাদিকতায় পড়ে না— নিঃসন্দেহে। বাক-স্বাধীনতা যদি তার সংযমের মাত্রা ঠিক রাখতে না পারে, তাহলে গণতন্ত্রের মেরুদণ্ডও সোজা দাঁড়াতে পারবে না কোনোভাবেই। 

আগেকার দিনে মানুষ ভূত-প্রেতকে ভয় পেত বলে জানি। পরে জনগণের সেবক হিসেবে পরিচিত পুলিশ বাহিনীর ওপরও পুরোপুরি কেউ কেন যে আস্থা রাখতে পারছে না। কারণ, স্বাতন্ত্র্য মূল্যবোধ বজায় রেখে এই বাহিনীটির ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখতে প্রায় ক্ষেত্রেই তারা ব্যর্থ হচ্ছে বলেও বিভিন্ন আলোচনায় এমন মন্তব্য শোনা যায়। পক্ষান্তরে, সামাজিক বা রাজনৈতিক কোনো মিথ্যে সংবাদের ভয়ের কারণে যদি, জনগণ কোনো একবার মিডিয়ার সম্প্রচার বা প্রকাশনার ওপর সন্দিহান হয়ে পড়ে, তবে তাদেরও একদিন শেয়ালের হুঁক্কা-হুয়া ডাকের মতো বিদায় ঘণ্টা যেকোনো সময় বেজে উঠতেই পারে। সংগৃহীত কোনো তথ্য-সংবাদ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জানিয়ে বা ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ফায়দা লোটার জঘন্য এই কাজও অনেকেই করে থাকেন বলে শোনা যায়। খবর নাকি কেনাবেচাও হয়, চড়াদামে। অসৎ উদ্দেশ্য বা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশের স্বার্থের বিপরীতে যেকোনো সংবাদ যদি নগ্নভাবে আন্তর্জাতিকীকরণও হয়, তবে সেটাই হবে গুটিকতক নামধারী দু’মুখো নষ্ট মানুষেরই এক কারসাজি। প্রতিহিংসা চরিতার্থের জন্য বেআব্রুকে আমরা অনেক সময় নৃশংসভাবে মাঠে-ময়দানে আরো উলঙ্গ না করা পর্যন্ত শান্ত হই না। এতে রুচিবোধ আর শালীনতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয় প্রতিপদেই।

এই সভ্য সমাজে আমরা এতটা নিচে নেমে যেন না যাই, যা দেখে প্রজন্ম ভুল দিকনির্দেশনায় বিভ্রান্ত কোনো পথে হাঁটে। রাষ্ট্র বা নিজ পরিবারের অভিভাবকদের প্রতি যদি সদস্যদের শ্রদ্ধার জায়গাটি অটুট না থাকে, তবে কী নিয়ে তারা গর্ববোধ করবে?

অপ্রকাশ্যভাবে, যে দলেরই সমর্থক এই সাংবাদিক সমাজের গোষ্ঠীরা হোক না কেন, তাকে অবশ্যই নিরপেক্ষতা বজায় রেখেই জনসম্মুখে নৈতিকতার মানদণ্ডকে টিকিয়ে রাখতে হবে। নতুবা বিতর্কিত হয়ে তাকেই একদিন জনরোষে পড়তে হবে। এ জন্য মিডিয়া বা সাংবাদিকদের আদর্শগত এক নৈতিক ঐক্যবদ্ধতায়ও থাকা আবশ্যক। অনৈতিকতার প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে হলে মিডিয়ার ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা আগাছা-পরগাছা পরিষ্কার করার শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে এখন থেকেই। গঠনমূলক ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় মিডিয়া জগৎ আবার তার পুরনো ঐতিহ্যকে ফিরে পাক, সেটা সবারই প্রত্যাশা।

 

শহীদুল হক বাদল

কবি, প্রকাশক

shahid681966@gmail.com,

 

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads