• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads

মতামত

আশার আগুন জ্বালো

  • প্রকাশিত ২০ এপ্রিল ২০১৮

রাজশাহী অঞ্চলের নাটোরে খোলাবাড়িয়া একটি গ্রামের নাম। গ্রাম তো গ্রামই। গ্রামের নাম তো নামই। নামের কোনো পরিবর্তন হয় না বলেই জেনে এসেছি। কিন্তু এবারের গল্পে ঘটেছে তার ব্যতিক্রম। গ্রামের এক বৃক্ষপ্রেমিক আফাজ পাগলা একসময় বাড়ির পাশে পাঁচটি ঘৃতকুমারীর গাছ রোপণ করেন। এই ঘৃতকুমারী গাছই বদলে দিয়েছে গ্রামটির নাম। বদলে দিয়েছে গ্রামের আর্থিক অবস্থা। খোলাবাড়িয়া এখন ঔষধিগ্রাম নামেই অধিক পরিচিত। আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে সেই আফাজ পাগলার ঘৃতকুমারীর চারা বদলে দিয়েছে গ্রামবাসীর দৃষ্টিভঙ্গি। ঔষধিগুণসম্পন্ন গাছের বদৌলতে বদলে গেছে পুরো গ্রামবাসীর জীবনযাত্রা। বদলে গেছে তাদের চিন্তা-চেতনা ও কর্ম। গ্রামের ১৬শ’ পরিবার এখন ঔষধি গাছের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে। গ্রামের চারপাশে এখন বিঘার পর বিঘা জমিতে ঘৃতকুমারীর চাষাবাদ চলছে। যাদের জমিজমা নেই তারাও বাড়ির আঙিনায় যেখানে সুযোগ আছে সেখানেই চাষ করছেন ঘৃতকুমারীর। এই গ্রামে মোট ২৫ হেক্টর জমিতে ঔষধি গাছের চাষাবাদ হয়। আশ্চর্য এই ঔষধিগ্রামের মোড়ে মোড়ে গড়ে উঠেছে ভেষজ উদ্ভিদ বিক্রির দোকান। শুধু নামে ঔষধি গ্রাম নয়, গ্রামের মানুষের জীবন-জীবিকার একমাত্র মাধ্যম এখন ভেষজ চাষাবাদ। বাণিজ্যিক সুবিধার জন্য সেখানে গড়ে উঠেছে ‘ভেষজ বহুমুখী সমবায় সমিতি’। সমিতির মাধ্যমে ক্রেতা-বিক্রেতা আর উৎপাদনকারীর সমন্বয়ে জমে উঠেছে ভেষজ বিপ্লব। আফাজ পাগলার ভেষজ প্রেমের অনুসারী হয়ে গ্রামের সবাই এখন ভেষজচাষি। গ্রামের নারীরা একাজে অনেক এগিয়ে। ঔষধি গাছের চাষাবাদের জন্য এ গ্রামের নারীদের বলা হয় ‘বনজ রানী’। এই গ্রামের মাটিরও নাম দেওয়া হয়েছে ‘ভেষজ মাটি’। আফাজ পাগলার ১৭ কাঠা জমিতে ৪৫০ প্রজাতির ভেষজ নার্সারি গড়ে তোলা হয়েছে। গ্রামে এ রকম আরো আছে আটটি নার্সারি। এসব নার্সারিতে আছে বাসক, সাদা তুলসী, উলট কম্বল, চিরতা, নিম, কৃষ্ণতুলসী, রামতুলসী, ক্যাকটাস, সর্পগন্ধা, মিশ্রিদানা, হরীতকী, লজ্জাবতীসহ হরেক রকমের ঔষধি গাছ। গ্রামটিতে ৫০০ কৃষক সব সময় ভেষজ চাষাবাদ করেন। কৃষকদের স্বার্থে সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ‘ভেষজ গাছ-গাছড়া উৎপাদন সমবায় সমিতি’। জানা গেছে, দেশে প্রায় ১শ’ কোটি টাকার ঔষধি কাঁচামালের স্থানীয় বাজার রয়েছে। এই ঔষধি গ্রামই এ চাহিদার অধিকাংশের জোগান দেয়। ঔষধি গ্রামের এই ভেষজ চাষাবাদ এখন ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবেশী গ্রামগুলোতেও। ভেষজ গাছ-গাছড়ার চাষাবাদে আফাজ পাগলার এই দৃষ্টান্ত এখন সবার জন্য অনুসরণীয়।

২.

ঔষধি গ্রামের পর শুনুন একটি মুড়ি গ্রামের গল্প। মুড়ি ভাজাকে উপজীব্য করে জীবিকা নির্বাহ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ। এদের মধ্যে নারীরাই উল্লেখযোগ্য। দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে অনেক মুড়িভাজা পেশাদার রয়েছে, যাদের বিছিন্নভাবে পাওয়া যায়। কিন্তু গ্রামের অধিকাংশ মানুষই এমন পেশার ওপর নির্ভরশীল, এমন গ্রাম খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। একটি নয় দুটি নয় ঝালকাঠির দপদপিয়া ইউনিয়নের রাজাখালী, দপদপিয়া, তিমিরকাঠি, ভরতকাঠি ও জুরাকাঠি-এই পাঁচটি গ্রামের অধিকাংশ মানুষ মুড়ি তৈরির ওপর জীবিকা নির্বাহ করে। এই গ্রামগুলোতে রাতদিন চলে মুড়ি তৈরির ব্যস্ততা। এই দপদপিয়ায় বছরে প্রায় দুই কোটি টাকার মুড়ি উৎপাদন হয়। তথ্যে জানা গেছে, একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ দৈনিক দুই মণ মুড়ি ভাজতে পারেন। এই গ্রামগুলোতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পালাক্রমে মুড়ি ভাজার কাজ করেন। মুড়ি তৈরিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে অনেক পরিবার দেখেছে সচ্ছলতার মুখ। তাই ওই গ্রামগুলোয় মুড়ি ভাজা এখন একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে। একই স্থানে সমজাতীয় পেশা জনপ্রিয় হলে সে পেশাকে কেন্দ্র করেই শিল্পের জন্ম হয়। আমাদের জীবন-জীবিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এসব শিল্প দেশজ স্বনির্ভরতার প্রতীক। তবে এ শিল্পেরও অনেক সমস্যা আছে। মেশিনের মাধ্যমে সার মিশ্রিত মুড়ি অপেক্ষাকৃত কম খরচে তৈরি করে কম মূল্যে বাজারজাত করার কারণে এই গ্রামবাসীর রোজগারের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও সার মিশিয়ে তৈরি মুড়ি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে এই মুড়ি গ্রামকে বাণিজ্যিক মুড়ি উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কথা ভাবা যেতে পারে। আমরা প্রত্যাশা করব, মুড়ি গ্রামগুলোকে বাণিজিকীকরণ করে আরো অধিক উৎপাদন এবং এ পেশায় ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসবেন।

৩.

এবার বলব বৃক্ষপেমিক অলির স্বপ্নভুবনের গল্প। তিনি ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জের আলাউল হক অলি। এই বৃক্ষপ্রেমিকের নেশায় পেশায় জড়িয়ে আছে গাছ। প্রায় ৬০ বিঘার বিশাল এলাকায় তার বৃক্ষ উদ্যান। তার এই উদ্যানই এখন হাজার মানুষের কর্মক্ষেত্র। ফুল, ফল আর ঔষধি সব রকমের গাছই আছে তার সংগ্রহে। তার উদ্যানের আছে বিশাল রেকর্ড। তার বাগানে ফলেছে ৮-১০ কেজি ওজনের বেল, ৫০০ গ্রাম ওজনের কামরাঙা, প্রমাণ সাইজের লেবু, বিশালাকৃতির জাম, জামরুল, আতা, কদবেলসহ নানান রকমের দুষপ্রাপ্য আম, কাঁঠাল আর পেয়ারা। দোফলা, ত্রিফলা, বারোমাসি বিভিন্ন ধরনের আমের সংগ্রহ আছে তার কাছে। স্বাদে, গন্ধে, বর্ণে সব ভিন্ন ভিন্ন। আছে খাজাভোগ, কনে চাহনি, রাজদেশি, চিনি চমক, গোলাপবাস, মোহনভোগ, গোপালভোগ, ল্যাংড়া, ফজলিসহ নানা বিরল প্রজাতির আমগাছ। ফলের ম ম গন্ধে ভরপুর তার বৃক্ষ উদ্যান। অলি দেশ ও বিদেশ থেকে নানান প্রজাতির ফলদ, বনজ আর ঔষধি বৃক্ষ সংগ্রহ করেছেন বিভিন্ন উপায়ে। বিচিত্র চিন্তার এই সৃজনশীল কৃষক বৃক্ষের সঙ্গে ভালোবাসায় নিমগ্ন অহর্নিশ। তার উদ্যানে আছে দেশি জাতের দারুচিনি, তেজপাতা, আমলা, খয়ের, হরীতকী, গোলমরিচ, চন্দন, কাঠবাদাম, কাউফল, পেস্তা, চালতা, আতা, লুকলুকি, সফেদা, জলপাই, আমলকী, জাম্বুরাসহ বিদেশি জাতের বেদানা, কফি, রিটা, লবঙ্গ ও মাল্টাসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। তার এই উদ্যান যেন পাখিদের অভয়ারণ্য। অমৃত স্বাদ আর গন্ধসুধায় ভরপুর অজস্র খাবারের কারণে শুধু পাখি নয়, মৌমাছি আর প্রজাপতিরও এক বিচিত্র ভুবন এই উদ্যান। এখানে প্রায় হাজার দুয়েক বুনো কবুতর বাস করে নির্ভয়ে। তার সঙ্গে আছে পেঁচা, চড়ুই, ফিঙে, কোকিল, চিল, বকসহ হরেক রকমের পাখি।

অলি সাহেব আবার ওই পাখিগুলোর খাদ্য আর নিরাপত্তার বিষয়ে খুবই যত্নশীল। ওরা যেন তার মেহমান। তাই বাসা বাঁধার সুবিধার্থে তিনি গাছের উঁচু ডালে মাটির হাঁড়ি-পাতিল বেঁধে রাখেন। তা ছাড়া এত বড় উদ্যানের খাবার তো ফ্রি-ই থাকছে। এসবের পাশাপাশি অলি সাহেবের রয়েছে বেশ কয়েকটি পুকুর। সেখানে চলছে রকমারি মাছের চাষ। পাশাপাশি গবাদিপশুর খামারে আছে গরু, ছাগল, ভেড়া আর মহিষ। আলাউল অলি শুধু নিজের বাগানের যত্ন করেই ক্ষান্ত নন। রকমারি গাছের চারা বিনামূল্যে বিতরণ করেন আত্মীয়-স্বজন আর পাড়া-প্রতিবেশীর মাঝে। একজন অলির একান্ত চেষ্টায় গড়ে ওঠা উদ্যান হতে পারে আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস। কমবেশি আমাদের প্রত্যেকের বাড়ির আঙিনাজুড়ে বৃক্ষ রোপণের সুযোগ নিতে পারি। বৃহৎ উদ্যান না হলেও নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে পারলেই তো লাভ। কেননা আমাদের পরিবেশ রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদেরই। 

 

এস এম মুকুল

সাংবাদিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads