• রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads

প্রতিকি ছবি

মতামত

নৈতিক অবক্ষয়রোধে ব্রিটিশ ভাবনা

  • প্রকাশিত ২১ এপ্রিল ২০১৮

ধর্ষণ নিয়ে লিখতেও ইতস্ততবোধ করছি। তথাপিও লিখছি সামাজিক অবক্ষয়রোধের প্রয়াসে ধর্ষণ এবং ধর্ষণ-হত্যার বিষয়ে দু-চার কথা। আমরা প্রতিনিয়তই খবরের কাগজে পড়ছি শিশুধর্ষণ, গণধর্ষণ কিংবা ধর্ষণ-হত্যার সংবাদ। এসবের বিচারও যে হচ্ছে না, তাও কিন্তু নয়; তথাপিও এ অবক্ষয় মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ছড়িয়ে পড়ছে ব্যাধির মতো।

যেই ব্যাধির কথা বলতে গেলেই প্রথমে আসে পর্নোগ্রাফির কথা। যার করালগ্রাসে পড়ে কতিপয় কিশোর-যুবক বেহায়ার মতো আচরণ করছে। হায়েনার মতো ক্ষিপ্রগতিতে অনাচারে জড়িয়ে পড়ছে। মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসছে। ভালো-মন্দ বিচারের ক্ষমতা হারিয়ে অশোভন আচরণ করছে মা-বাবা, শিক্ষক কিংবা পাড়ার ময়মুরব্বিদের সঙ্গে। ফেসবুক এবং ইউটিউবের মতো যুগের মোড়লগুলোর কল্যাণে ‘রিভেঞ্জ পর্নো বা প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি’ ছড়িয়ে দিচ্ছে। যেন এটিই এখন ধ্যানজ্ঞান কিশোরদের কাছে। এসব দেখে দেখে আবার আরেক দল শিখে নিচ্ছে কীভাবে ঘায়েল করতে হবে নারীদের। বশে না এলে কীভাবে প্রতিশোধ নিতে হবে ইত্যাদি রপ্ত করছে। শেষ পরিণাম ধর্ষণ-হত্যাকারী হিসেবে পরিচিতি।

আমরা বুক উঁচিয়ে বলতে পারি, কৈশোর আমাদেরও পাড়ি দিতে হয়েছে। এ ধরনের অনাচারে লিপ্ত হইনি আমরা। তখনকার সময়ের যুব সমাজ কিংবা কিশোর-যুবারা এত বেহায়াপনায় লিপ্ত ছিল না। কালেভদ্রে কেউ পর্নো ছবি দেখলেও সেটি রাখঢাকের মধ্য দিয়েই দেখতে হতো। অবশ্য তখন হাতের কাছে এ ধরনের পর্নোগ্রাফি পাওয়াও যেত না। দেখতে হলে আয়োজন করেই দেখতে হতো। আর সে আয়োজনে বাধা হয়ে দাঁড়াতেন পাড়ার ময়মুরব্বিরা। ফলে অনেক সময় বিপথগামী যুবকদের আয়োজন ভেস্তে যেত। সেই ক্ষেত্রে কিশোর বয়সীদের তো প্রশ্নই ওঠে না। আর হালে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ পরিলক্ষিত হচ্ছে। যুবকদের চেয়ে কিশোররা এগিয়ে আছে বেশি। এর প্রধান কারণই হচ্ছে থ্রি কিংবা ফোর জির কল্যাণ।

বলতে দ্বিধা নেই- খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ আগেও ছিল, কিন্তু সেটি মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েনি। এখন খুন কিংবা ধর্ষণের কৌশল পাল্টেছে। প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হচ্ছে, গণধর্ষণ করা হচ্ছে। এসব হচ্ছে কেন? এসব হচ্ছে ইউটিউবের কল্যাণে। ইউটিউবে আপলোড করতে হবে, তাই নিত্য নতুন কৌশলের প্রয়োজন। মানুষ মরে যায় যাক, তাতে কিছু যায় আসে না। ভিডিও করতেই হবে আগে। ফেসবুকে দিতে হবে, ইউটিউবে দিতে হবে, না হলে যে ক্র্যাডিট নেওয়া যাচ্ছে না। অথচ এই দুটি জিনিস একজন ভালো মানুষের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা বেশিরভাগই অকল্যাণেই ব্যবহূত হচ্ছে।

বছরখানেক আগে একটি জাতীয় দৈনিকের সংবাদ নজর কাড়ে। ব্যথিত হয়েছি সংবাদ পাঠে। যদিও নিজ চোখে অবলোকন করে যাচ্ছি নৈতিকতাবোধের অবক্ষয়, তার ওপর সংবাদপাঠ। দুইয়ে মিলে জানার পরিধি বেশ হয়েছে আর কি!

সংবাদমাধ্যমে জানতে পারি, রাজধানীর ৭৭ শতাংশ স্কুলপড়ুয়া শিশু পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। বেসরকারি একটি সংস্থা ৫০০ শিশুর ওপর জরিপ চালিয়ে এ তথ্য দিয়েছে। অভিভাবকরা যাতে একটু সতর্ক হন, সেই জন্য এ প্রয়াস চালিয়েছে তারা। কিন্তু সংস্থাটি শুধু রাজধানী পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রইল কেন, তা বোধগম্য নয়! জরিপটা মফস্বল কিংবা গ্রামগঞ্জের শিশুদের ওপরও চালাতে পারত। কারণ আমাদের জানা মতে, রাজধানীর চেয়েও এ ব্যাপারে গ্রামের শিশুরা বেশি এগিয়ে। রাস্তাঘাটে কিংবা ঘরের কোনায় অথবা খোলা মাঠ-প্রান্তরে মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে এ কাজটিই করে থাকে সর্বক্ষণ অনেক তরুণ-যুবক। সুযোগটা তৈরি হওয়ার প্রধান কারণ বাবা বা বড় ভাই বাড়ি নেই। তারা বিদেশ থাকেন। ছেলে অথবা ছোট ভাইয়ের জন্য একটি ট্যাব অথবা দামি ফোনসেট পাঠিয়ে দিয়েছেন, যেন তার সঙ্গে ইমু বা স্কাইপির মাধ্যমে কথা বলতে পারেন। সেটি চিন্তা করেই তারা দামি সেট পাঠিয়েছেন। আর ছেলে বা ভাই উপযুক্ত কাজটি করছে দামি ফোনসেট ব্যবহার করে, যা প্রবাসী মানুষটি ঘুণাক্ষরেও জানেন না। প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে কি আমরা যুগের হাওয়া গায়ে না লাগিয়ে পিছিয়ে থাকব? আমরা ইন্টারনেট কিংবা ফেসবুক ব্যবহার করব না? কেন নয়। ব্যবহার করব, তবে অবশ্যই ১৮ বছরের নিচে কারো হাতে ফোনসেট দেব না। শিশুর হাতে ফোনসেট দেখলে কৈফিয়ত চাইব। সেই ক্ষেত্রে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সমাজ সচেতনতা তৈরি করতে হবে। রাষ্ট্রকে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। শুধু সিম নয়, ১৮ বছরের নিচে কেউ ফোনসেট হাতে নিতে পারবে না-এমন আইন করা জরুরি। গণমাধ্যমের আশ্রয় নিতে হবে। উপর্যুপরি বিজ্ঞাপন দিয়ে কিংবা লিফলেট বিতরণ করে শিশুদের সতর্ক করতে হবে। মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তল্লাশি চালাতে পারেন। যেমনটি করা হচ্ছে মাদকদ্রব্য তল্লাশির ক্ষেত্রে। তাতে করে নৈতিক শৃঙ্খলার কিছুটা হলেও উন্নতি হবে আশা করা যায়। ঘুণে খাওয়া সমাজটাকে স্বরূপে ফিরিয়ে আনতে না পারলেও অনেকটাই কাজে দেবে শিশুদের ইন্টারনেট তথা ফোনসেট থেকে দূরে রাখতে পারলে। এখানে যা না বললেই নয়, সেটি হচ্ছে শিশু ইন্টারনেট ব্যবহার করবে বা শিখবে তাতে আপত্তি নেই আমাদের। আপত্তি হচ্ছে, ইন্টারনেটের ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিশুদের প্রতি নজর রাখা। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই মা-বাবা এবং স্কুলশিক্ষকদের সতর্ক কিংবা সচেতন হতে হবে। শিশুদের বই পড়তে উৎসাহিত করতে হবে। খেলাধুলার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। তাহলে হয়তো এ ব্যাধি থেকে রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সম্প্রতি দেশের আনাচেকানাচে ধর্ষণ যেন এক মামুলি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সঙ্গে যোগ হচ্ছে ধর্ষণ-হত্যাও। বিচার চাইলে কিংবা বিচার চাইতে পারে এমন আশঙ্কা হলে ভিকটিমের বিপদ আরো বেড়ে যায় যেন। তখন চিরতরের জন্য স্তব্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। মোটামুটি এ হচ্ছে দেশের বর্তমান চালচিত্র।

আমরা লক্ষ্য করেছি, এমনটি দশ-বারো বছর আগেও ছিল না। যখন দেশের বিভিন্ন বড় শহরে নিষিদ্ধপল্লী নামক স্থানে অসচ্চরিত্রের লোকদের উল্লাসের একটা সুযোগ ছিল। সেই সুযোগ ক্ষীণ হতেই অসচ্চরিত্রের লোকেরা যেমনি হিংস্ররূপ ধারণ করে তেমনি যৌনকর্মীরা দেশের মফস্বল শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। তাতে করে রোগব্যাধি তো ছড়িয়েছেই তার ওপর নৈতিকতার বারোটা বাজিয়েছে।

ব্রিটিশ সরকার বিষয়টি চিন্তা করেই তখন হয়তো দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে নিষিদ্ধপল্লীর ব্যবস্থা করে সামাজিক অনাচার রোধের উদ্যোগ নিয়েছে। সেই নিষিদ্ধপল্লীগুলোর অধিকাংশই নেই এখন আর। ব্যক্তিস্বার্থে যৌনকর্মীদের উচ্ছেদ করে বাহাবা কুড়িয়ে সেখানে দালান গড়ে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়েছেন প্রভাবশালী মহল। একবারও তারা ভাবেনি সমাজের অবক্ষয়ের বিষয়টি। সেই দূরদর্শী চিন্তা মাথায় না নেওয়ার ফসলই হচ্ছে আজকের ধর্ষণ ও ধর্ষণ-হত্যার মচ্ছব।

আ ল ম শা ই ন

লেখক : কথাসাহিত্যিক, বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষক ও পরিবেশবিদ

alamshine@gmail.com

 

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads