• শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads

মতামত

স্মৃতি-সত্তা ও ভবিষ্যৎ

  • প্রকাশিত ২৩ এপ্রিল ২০১৮

যখন তরুণদের দেখি, তখন মেধাহীন তাদের মনে হয় না। কেননা, ওরা খুব ক্যাজুয়ালি অনেকগুলো অ্যাপস চালায়, দ্রুত অনেক টেনশন মোকাবেলা করে, এই বৈশাখের উৎসবে দিবাগত রাত করে মুখোশ বানিয়ে চলে, কিংবা কোনো কাজ দিলে সবটুকু নিংড়ে দিয়ে তা করার চেষ্টা করে।

ক’দিন আগে, আমাদের এখানে একটা বড় সেমিনার হচ্ছিল। কিছু তরুণ্যশক্তিকে ওই বৈতরণী মোকাবেলায় কাজে নিতে হলো। কাজ তো ম্যানেজমেন্ট, মেধার চেয়ে বোধবুদ্ধির শক্তিটাই তাতে বেশি দরকার হয়। দেখলাম খুব সুচারুভাবে সবটা উঠে গেল। তাতে আরো কিছু দিক খেয়াল করি। ছেলেরা অকুতোভয়ও বটে। লক্ষ্য কাজ, কাজটা করেই ছাড়বে যেন— যেহেতু অর্ডার। এটা ভালো লাগে। এরকম আরো প্রমাণ দেখেছি। আমাদের ছোট্ট একটা লেখালেখির সংগঠনে যখন কোনো কাজ নামে তখনো একই ট্রিটমেন্ট পাওয়া যায়। তখন মনে হয়, যে হতাশাগুলোর মধ্যে আমরা বাস করছি, তার সিমিট্রি বুঝি সর্বদা সঠিক নয়। ওভাবে তা দেখার দরকারও নেই। তবে তারুণ্যই এখন প্রবল শক্তি, এটা বিশ্বাস করতে হয়, অন্তত এই দেশে।

আমাদের আগের সময়টায় প্রচুর মূল্যবোধে-শাসিত সময় ছিল। তাতে আদেশ-নিষেধের প্রবাহ ছিল। একটা বেষ্টনীও থাকত। সে বেষ্টনীটা নানাপ্রকার ট্যাবু দিয়ে ঘেরা। সেটা অতিক্রম করতে চাইলেও সবাই তা পরত না। বিশেষ করে, নিম্ন-মধ্যবিত্ত বা দরিদ্র পরিবারে এসব অমান্য করা খুব কঠিন ছিল। সকলকে সমীহ করা আর মেনে চলার ব্যাপার যেন। এখন তেমনটা নেই। একদম উল্টো। ওই পরিবারের অনেকেই দেশের সীমা ছাড়িয়ে এখন তো বিদেশেও থাকছেন। কাজ করছেন। স্কাইপিতে প্রতিদিন কথা বলছেন, যোগাযোগ করছেন। এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনটায় হয়তো অনেক অন্ধকার দিক আছে কিন্তু ততোধিক আলোও আছে— এটা অস্বীকার করা যায় না। কারণ, পরিবর্তন তো হবেই। সেটা যুগের রথ। তাতে পা চেপে সমাজমনও গড়ে উঠবে। তার বিস্তারও ঘটবে। প্রসারও হবে। উপরে ওঠার জন্য, প্রতিরোধ মোকাবেলা করার জন্য, পরাস্ত করার জন্য— একপ্রকার তৎপরতাও থাকবে। তবে তার ধরন আছে। হয়তো সেটিও ক্রিয়াশীল থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সর্বাংশে মানুষ ভালোটা যাতে ভাবতে পারে, এ সত্য উপলব্ধি করা দরকার। পরিবেশটাও সৃষ্টি করা উচিত। বোধ করি এখন সেটাই বড় কাজ। এটা বুঝি তেমন কঠিন নয় (অনেকাংশে আমরাই তা কঠিন করে ফেলছি)। যেহেতু খারাপটা সঙ্গে সঙ্গে চলে বা বেশি চোখে পড়ে। নিজের জন্য সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে তাৎক্ষণিক মোহে অনেকটা মোহগ্রস্ত হয়ে কেউ কেউ যখন বেপরোয়া হয়, তখন ভালোর বিপরীতে হয়তো তুচ্ছতাটাই গ্রহণ করে। তখন সে সমাজের চোখে স্বার্থ-সুযোগের অংশীদার হয়। অন্যকে বঞ্চিত করে কিছু করার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন সেটা সমাজের চোখে স্বার্থপরের মতো দেখায়। এই মোহগ্রস্ত হওয়াটা সমাজ-অর্থনীতির একপ্রকার বিপরীত সংক্রমণ, এবং সে সংক্রমণ ক্রমশ বিস্তার পেলে ব্যক্তি কালিমালিপ্ত হয়, পিছিয়ে পড়ে, অনেককে ছোটও করে— তাতে ফল তেমন হয় না। বরং ওই ব্যক্তিই পলে পলে অসারত্ব ও পরিত্যক্ত হয়, অনেকের চোখে। তবে সম্পূর্ণত মানুষকে নেগেটিভ বলা যাবে না।

সক্রেটিসের কথা বলি। তার মূল কথা, ‘ন্যায়’। কারণ, ন্যায়ের উজ্জ্বলতা সমাজে অটুট থাকে। কখনো তা টুটে যায় না। মানুষই এর দ্রষ্টা। সক্রেটিস তার সমস্ত কথাই প্লেটোর মধ্য দিয়ে বলে গেছেন। তাতে ‘ন্যায়বিচার’ মানবিক অর্থ পেয়েছে। সেটি মানুষের বুদ্ধিসত্তায় সক্রিয় হয়েছে। কিন্তু প্ররোচনায় তা বিভ্রান্তিকর। এই বিভ্রান্তির সময় কি এখন! বাইরের জৌলুস বা ওপর-চালাকির প্রবৃত্তি কি বেশি চোখে পড়ে? ভালো কাজের ভেতরেও সেটি তো অদৃশ্যমান নয়! বা কেউ ভালো কিছু করলেও অন্যের সাধারণ সংবেদনে তা খুব সুখ বলে খ্যাত হচ্ছে না। এই কি অসুখ! অগভীর সংবেদন। অপোক্ত প্রতিক্রিয়া! সেখানেই আমাদের কৈশোরের ট্যাবুযুক্ত সমাজ জিতে যায়। হয়তো এটি আরেক সংবেদনা— যেখানে সকলেই নিজেকে ভালোবাসে। নিজের সময়টার মধ্যে অন্যকে দেখতে চায়। কিন্তু এখনকার সংবেদন কি গভীর? সবুজ পাতার সবুজ রঙ যে অভিভাবকত্ব নিয়ে প্রকৃতিতে আছে, সেটা কি আমরা চিনি বা চেনাই! নতুন তারুণ্যকে চেনাতে সামর্থ্য হই কি! বলছিলাম, তারুণ্যের শক্তির কথা। ওরা চলক, চালক নয়। চালক চলককে চালায়। তবে চালানোর প্রণালি আছে। দায়বোধ সেখানে গুরুত্বপূর্ণ। চালকের প্রতি তার নিঃশর্ত শ্রদ্ধা থাকা বাঞ্ছনীয়। চলক সেটা চালককে দেবে। দায়িত্ব নিয়েই দেবে। কেন দেবে? সে শ্রদ্ধা তাকে অর্জন করতে হবে। এ শ্রদ্ধা সহজ নয়। ন্যায় বিচারে গড়া। সেটি পেতে চায় চালক। চলকও সে ব্যাপারে যখন নিরুদ্বিগ্ন তখন চালক তা অর্জন করবেন এবং পূর্ণমাত্রার ফিডব্যাক পাবেন।

আমরা সে অভিভাবকত্ব কি নিতে পারছি! ওই ন্যায় বিচারের কাঠামোটি তেমন গভীর কি? বা যতটুকু গভীর হলে তারুণ্যকে টানা সম্ভব, দায়শীল করা সম্ভব, ততটুকু হচ্ছে কি! হচ্ছে না। ফলে, উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছি, করপোরেট প্রভাবিত ‘ব্যর্থতা’ তরুণ প্রজন্মকে চালিয়ে দিচ্ছি। আসলে তার আগেই কি আমরা নির্বাসনে গিয়েছি! সক্রেটিসের ‘নো-দাইসেল্ফ’ সত্যতাটুকু কি তবে পুরনো! তবে কেন চলক বা তরুণদেরকে আমরা শেখাতে পারছি না বা আস্থায় নিতে পারছি না। এখনকার প্রযুক্তির প্রভাব তো আছেই, এক ধরনের অনিবার্যতাও আছে, কিন্তু সব মিলিয়ে সে পরিবেশটি তো আমাদের তৈরি করতে হবে। তরুণদের উদ্যোগী করার পথটুকুর তো বিস্তার ঘটাতে হবে, তা যদি আমরা না-ই পারি তবে মিছেমিছি আমরা কর্মক্ষম তরুণদের দোষ দিচ্ছি কেন!

২.

আজকাল খুব সমারোহে বৈশাখ-বরণ হয়। তারুণ্যের একটা প্রকাশ তো এ বৈশাখ। সক্কলের জন্য নির্বাধ একটি উৎসব এটি। মঙ্গল শোভাযাত্রায় পরিশ্রম করে মুখোশ তৈরি হয়। কত রকমের মুখোশ! আদিম অভিব্যক্তির এক উজ্জ্বল সমাবেশ। এ মুখোশ তৈরিতে তরুণ-তরুণীরা সৃজনশীলতাকে শ্রমের সাথে যুক্ত করে। এর পেছনে কায়িক ও মানসিক ব্যয় অত্যধিক। কিন্তু সবটুকুকে ছাপিয়ে যায় উৎসবের সার্বিক আনন্দ। ব্যবসা হয়তো যুক্ত হয়েছে এখন। কিন্তু শুধু ব্যবসা থাকলে আনন্দটা থাকত না। আমাদের সমাজে এখন তরুণরাই আনন্দ বয়ে আনছে, এভাবে নানা উপায়ে।

‘গ্লোবাল’ কথাটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না, কিন্তু শেকড়ের উৎসমুখের সন্ধানটা কিন্তু কম হচ্ছে না; অন্তত বছরভর কিছু পার্বণ-উৎসবে, এখন। যেমন- বৈশাখ, বইমেলা, বিজয়-স্বাধীনতা উৎসব প্রভৃতি। এক হওয়ার অনমনীয় প্রেরণা। ব্যবসা-বাণিজ্যের বাইরেও প্রাণের টান বেশ। সেটিই বৈশাখের মূল। সেটি না থাকলে এমন অভেদরকমে মিলন হয় কী করে। রমনার বটমূলে, স্মৃতিসৌধে বা শহীদ মিনারের মিলনটা কারো উদ্যোগে ঘটে না। স্বতঃস্ফূর্ত। দলে দলে। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। একটা অংশীদারিত্ব আছে ওতে, যেকোনো উপায়েই হোক— তা গড়ে ওঠে। রিকশাওয়ালার রিকশার চাকায়, কখনো-বা পতাকা বিক্রেতার দোকানে, কখনো-বা অধিক জনসমাগমে হকারদের অধিক বিকিকিনিতে। এভাবে চেতনার স্রোতটা হিসেব করলে কম হয় না কিছু। যখন বৈষম্যহীন, একক, ভোগ-স্বার্থ সমাজপ্রশ্নটি এই মুহূর্তে প্রবল— তখন এ উজ্জীবন কম নয়। সেটি স্বীকারে নিয়েই এক কঠিন বাস্তবকে গ্রহণ করতে চাই আমরা। তবে এই উৎসবের ভেতর থেকে শেকড়ের সন্ধান যে অনেকাংশে বেড়েছে— তা অনস্বীকার্য।

স্বাধীনতা যুদ্ধে অনেক সত্য অর্জনের আগেই আমরা পেয়ে গিয়েছিলাম অনেক কিছু। একদিন যুদ্ধশেষে গ্রামে ফিরে আমার সত্তার অনেক অমীমাংসিত অন্ধকার তখন বুঝিনি। বলতে চাইনি, আমার অর্জনের ইতিহাস ও তার তীব্র মাহাত্ম্যগাথার কথা। সেটি খুঁজে পেতে সময় লাগল এখন অনেক বছর। এই তো এই প্রজন্মে তা পৌঁছেছে যেন কোনো ঘাটে। বৈশাখ, বৈশাখের কবিতা, বৈশাখের লোকগান, মাটির পুতুল, কদমা-বাতাসা কিংবা ওই মঙ্গলযাত্রার মুখোশের জন্তুরা। এখন এদের চেনা যায়। এই তারুণ্যই চিনিয়ে দিচ্ছে। আগে তা থাকলেও এখন বোঝাপড়াটা অন্যরকম। স্বাধীনতার অনতি পরে আমরা কিন্তু আত্মপরিচয়ের অভিমুখটি এভাবে চিনতে পারিনি (ষাটের দশকের বাঙালির ক্রমবিকশিত আত্মপরিচয়ের বিষয়টিও ছিল আলাদা)। এই উৎসবের রঙ অচেনা ছিল। এখন চেনা হলো, শিকড়ে পৌঁছানো গেল। এই স্বাধীন দেশের কারণে। আর গত পঁচিশ বছরের প্রতিরোধী পরিচর্যায়, অনেকটা সকল আনুষ্ঠানিকতাকে ঠেকিয়ে। সময়চিহ্নিত করলে সত্তরের দশকে বৈশাখকে, বিজয় উৎসবকে এত অভাবিতভাবে চিনিনি। এখন চিনি। মঙ্গল শোভাযাত্রা বা রমনার বটমূলকে বিশেষ করে চিনি। কাজটি কিন্তু এই প্রজন্মের! এই গ্লোবাল বিশ্বেও প্রতিরোধকে কেন্দ্র করে। শেকড়কে অধিক সত্যে উপলব্ধির ভেতর দিয়ে। তবে আরো প্রশ্ন, এই চেনার কাজটি কিন্তু সহজ নয়। বস্তুত, যে গ্রাম ফেলে এসেছি, যে উৎসব ছিল কোনো হাটে-বাটে তা আছে শুধু স্মৃতিতে গাঁথা। কিন্তু সেই স্মৃতি ফিরে পাবার জন্য কেউ তো রমনার বটমূলে যায়! সেই মাটির সানকিতে পান্তা-ইলিশ খায়। সেটিও ফেরানো স্মৃতির অনুষঙ্গ। কিন্তু তা এখন স্মৃতি থেকে সত্তায় পরিণত হয়েছে বলেই মনে হয়। সম্মুখে তা আরো ভবিষ্যৎপ্রবর হয়ে উঠবে। এবং তা অতিক্রমণের জন্য দিনে দিনে বৈশাখ রঙ পাল্টাবে। পরিবর্তন আনবে, নতুন প্রজন্ম তা গ্রহণ করবে— শেকড়কে টানবে, পাল্টাবে, বদলাবে এবং মূলে ও সত্যে পৌঁছানোর তাগিদ অনুভব করবে।

তবে সমাজ-মনই সবটুকু গড়ে দেয়, বিশ্বাসে তা সত্য। এক-একটা সময় প্রজন্ম তৈরি হয় সমাজমনের ভেতর থেকে। সমাজের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই তার বীজ। সমাজের আদায়-বিদায়ের কাজটা এক-এক প্রজন্ম এক-একভাবে করে থাকে। সেভাবেই তাদের মন ও মানস তৈরি। সুতরাং আজকের যে উপলব্ধি তা সময়-তরঙ্গের সূত্রে নির্ধারিত।

রবি ঠাকুরের নায়ক মধুসূদন একটা পরিবর্তনের প্রতীক, সে অর্থ চেনে— অর্থ দিয়ে সবকিছু মাপে, এমনকি তার স্ত্রী বিপ্রদাসকেও। তার পরিণতি শেষ পর্যন্ত কিন্তু ভালো হয়নি, আর বিপ্রদাসও মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বেশিদিন থাকতে পারেনি। কিন্তু সমাজের ‘পাপ’ তাকে বহন করেই সামনে চলতে হয়েছে। আজ যে প্রযুক্তির ‘হ্যাফা’ সেটি তো অস্বাভাবিক নয়, তাকে মানিয়ে চলাটাই সমীচীন— তবে তার সহজ পথটা এই তরুণ প্রজন্মই ঠিক করবে, আগামী দিনের জন্য। বোধ করি সে অনুভবটাই আজকের বাস্তবতা ও সম্মুখের চালিকাশক্তি, সন্দেহ নেই।

 

শহীদ ইকবাল

অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads