• রবিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৯, ৩ ভাদ্র ১৪২৫
ads

মতামত

মার্কিন সংরক্ষণবাদ মোকাবেলায় এশীয়দের করণীয়

  • প্রকাশিত ২৪ এপ্রিল ২০১৮

লি জং-হুয়া

খুব সম্ভবত গত পাঁচ দশক ধরে এশিয়ার অর্থনীতি রফতানিসংশ্লিষ্ট উন্নয়ন মডেলের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। যার ফলে অর্থনৈতিক রূপান্তর ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদী প্রতিশ্রুতির বাস্তবানের ফলে অন্যান্য দেশও পাল্টা জবাব দেওয়ার ভরবেগে আছে। গত বছর ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) চুক্তি থেকে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে অবাধ বাণিজ্য চুক্তির পুনঃমধ্যস্থতা এবং চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আমদানিকৃত ওয়াশিং মেশিন, সোলার প্যানেলসের ওপর ‘প্রতিরক্ষা’ শুল্ক বৃদ্ধি করেছে। সম্প্রতি হোয়াইট হাউজ জাতীয় নিরাপত্তা বলিষ্ঠ করার প্রয়াসে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানির ওপর শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। মেধাস্বত্ব চুরির অভিযোগের বিপরীতে মূলত চীনা পণ্যের ওপর শাস্তিমূলক বাড়তি শুল্ক আরোপের লক্ষ্যে এই ঘোষণা এসেছে।

যে দেশটি ১৯৩০-এর দশকের পর থেকে মুক্ত বাণিজ্যে চ্যাম্পিয়নের আসন ধরে রেখেছে সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটা বিস্ময়কর বিপর্যয়। ট্রাম্পের পূর্বসূরিদেরও কেউ কেউ অবশ্য রক্ষণশীল নীতি গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু সেসব ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ রাখা হয়েছিল। হার্ভার্ডের ডানি রড্রিক যেমনটা বলেছেন, ‘ট্রাম্পের বাণিজ্যিক রক্ষণশীলতায় সম্ভবত একতরফা আবেশ রয়েছে, যেমনটা তার বিদঘুটে মুখোভঙ্গির মধ্যে লক্ষ করা যায়।’

ট্রাম্পের এসব কাজ মার্কিন শিল্প খাতকে যতটা কম প্রশ্নবিদ্ধ করবে, ততটাই মঙ্গল। তবে সেই সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। উদাহরণস্বরূপ, ইস্পাতশুল্ক এ খাতের অল্প সংখ্যক শ্রমিকের জন্য সহায়ক হলেও নির্মাণ, জ্বালানি তথা তেল, গ্যাস এবং অটোমোবাইল খাতের শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী উৎপাদন শিল্পের পতনকে বিপরীত দিকে প্রত্যাহারের কোনো উপায়ই এই ধরনের ব্যবস্থায় নেই। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে শুল্ক খুব বেশি কিছু বয়ে আনবে না— যদিও ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টারা মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ‘শূন্য অঙ্কের খেলা’ যার মাধ্যমে ছোট পরিসরের বাণিজ্য ঘাটতি মোকাবেলা করা সম্ভব। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতির প্রকৃত কারণ হচ্ছে সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্যহীনতা— যেমন, অত্যধিক গৃহস্থালির খরচ এবং রাজস্ব ঘাটতি। তাই এই ভারসাম্যহীনতার অবসানে শুল্ক খুব বেশি কিছু করতে পারবে না। বরং ট্রাম্পের ট্যারিফ কৌশলে কেবল বাণিজ্য যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে।

গ্লোবাল টাইমসের মতে, চীনের রাষ্ট্রীয় মুখপাত্র বাণিজ্য যুদ্ধের ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাণিজ্য সীমাবদ্ধতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিমান আমদানি অথবা কৃষিপণ্য যেমন- সয়াবিন আমদানি সীমিত করতে পারে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোও বাণিজ্যযুদ্ধের শঙ্কা প্রকাশ করে প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম ট্যারিফ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত, তারা হুইস্কি এবং মোটরসাইকেলসহ আমেরিকান পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে রেখেছিল।

যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইউরোপীয় গাড়ির ওপর আরোপিত শুল্কের জবাব ছিল এটি। এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইস্পাত আমদানিকারক এশিয়ার দেশ, যেমন- ভারত, ইন্দোনেশিয়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত ইস্পাতের সম্ভাব্য সঙ্কট মোকাবেলার জন্য বিকল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা চিন্তা করছে। ট্রাম্প যখন দাবি করেন যে, ‘বাণিজ্যযুদ্ধে জয় পাওয়াটা খুব সহজ’- তাই তিনি হয়তো সহজে তার কৌশল থেকে পিছু হঠবেন না। তবে চরম সত্যটি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কর্তৃক স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বাণিজ্যযুদ্ধে কেউ বিজয়ীরূপে নিজের উত্থান ঘটাতে পারবে না।’

বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যযুদ্ধ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এবং বৈশ্বিকভাবে পণ্য সরবরাহের চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে আমদানি পণ্যের দাম বাড়বে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই ধরনের পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী ও ভোক্তা চরম ক্ষতির মুখে পড়বেন। রফতানিনির্ভর এশিয়ার অর্থনীতির মডেল খ্যাত ভিয়েতনাম, যার জিডিপির ৯০ শতাংশ, মালয়েশিয়ার ৭১ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ৪৫ শতাংশ এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ এশিয়ার উদীয়মান দেশগুলোর অর্থনীতিতে কঠিন আঘাত হানবে। 

এশিয়ার অর্থনীতির ঝুঁকি কমানোর স্বার্থে অবাধ বাণিজ্য সংরক্ষণে আরো সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। একসঙ্গে কাজ করার লক্ষ্যে এশিয়ার দেশগুলো জি-২০ এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো অর্থনৈতিক জোট গঠন করতে পারে। এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য কৌশল মনিটরিং করা সহজ হবে। বাণিজ্যসংক্রান্ত দুশ্চিন্তা লাঘবের পাশাপাশি অন্যের মাথায় কাঁঠাল ভাঙার মতো ধ্বংসাত্মক প্রবণতাও রোধ করা যাবে। সাফল্যের সম্ভাবনাকে তুলে ধরার জন্য এশিয়ান অর্থনীতির বাজার থেকে রক্ষণশীল সব ব্যবস্থা দূর করতে হবে। দামে ভর্তুকিস্বরূপ ডাম্পিং প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। চীন যদিও অবৈধ বাণিজ্য কৌশল, রফতানি সহায়তা, মুদ্রা ম্যানিপুলেশন, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরি এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরে চাপ দেওয়ার কারণে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে— এ ক্ষেত্রে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাণিজ্য উদারীকরণের লক্ষ্যে এশিয়ার দেশগুলো অঞ্চলভিত্তিক সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে।

ইতোমধ্যে আসিয়ানের দশটি দেশ অন্য ছয়টি দেশ অস্ট্রেলিয়া, চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে একযোগে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করতে সম্মত হয়েছে। এই ধরনের চুক্তি আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উল্লেখযোগ্য সম্ভাব্যতার আরো একটি চুক্তি হলো টিপিপি যেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এশিয়া-প্যাসিফিকের সাতটি দেশ (জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ব্রুনাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনাম) ইতোমধ্যে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, যাদের সম্মিলিত জিডিপির পরিমাণ বৈশ্বিক মোট জিডিপির সাড়ে ১৩ শতাংশ এবং সংগঠনটির সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির পথ এখনো খোলা আছে। এবং দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন এবং শ্রীলঙ্কা সম্ভাব্য সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অন্যদিকে চীন যদি টিপিপিতে যোগদান করে, এবং যুক্তরাষ্ট্র ফিরে আসলে এই চুক্তির ইতিবাচক পরিসর আরো বিস্তৃত ও শক্তিশালী হবে। 

অর্থনীতি চাঙ্গা রাখার স্বার্থে এশিয়ার দেশগুলোকে প্রবৃদ্ধির অভ্যন্তরীণ চালিকাশক্তিগুলোকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। সেজন্য ভোগ ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বৈদেশিক নির্ভরশীলতা হ্রাস করতে হবে। বিশেষ করে, তাদের উচিত হবে, এমন সব নীতি অনুসরণ করা যা গুণগত কাজের পরিবেশ তৈরি করবে এবং ক্ষুদ্র পরিসরেও সঞ্চয় প্রবণতার বিস্তৃতি ঘটাবে। একই সময়ে, দেশগুলোর উচিত হবে পণ্য, শ্রম ও আর্থিক বাজারে রক্ষণশীলতা পরিহার করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ গড়ে তোলা। উচ্চ-উৎপাদনশীল পরিষেবা খাত, যেমন— স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, টেলিযোগাযোগ এবং আর্থিক সেবা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর মাধ্যমে লক্ষ্যে পৌঁছানো সহজ হবে।

খুব সম্ভবত, ট্রাম্প প্রশাসন একটি ধ্বংসাত্মক রক্ষাকবচ হাতে নিয়েছে। কিন্তু প্রতিশোধ নেওয়ার পরিবর্তে এশিয়ার অর্থনীতির উচিত হবে নিজস্ব উন্নয়ন মডেলগুলোর পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে মার্কিন শুল্কের হুমকি মোকাবেলা করা। সেজন্য তাদের নিজস্ব সমৃদ্ধি ও স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানো প্রয়োজন।

অনুবাদ : মো. রাশিদুল ইসলাম

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক একত্রীকরণ শাখার সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads