• বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads

ছবি: কাল্পনিক

মতামত

বৌদ্ধিক জাগরণ ও গণজাগরণ

  • প্রকাশিত ২৮ এপ্রিল ২০১৮

চলমান প্রচার-প্রচারণার আচ্ছন্নতা কাটিয়ে লক্ষ করলে দেখা যায়, হাজার বছরের ইতিহাসে আমাদের রাজনৈতিক ঐতিহ্য গৌরবজনক নয়। তবে সংগ্রাম ও যুদ্ধের মধ্য দিয়ে নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অবশ্যই গৌরবজনক। এই গৌরবের বোধ নিয়ে আত্মহারা হয়ে চলা আমাদের জন্য গৌরবজনক নয়। স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর আমরা কি গৌরবজনক ইতিহাস সৃষ্টি করে চলছি?

বাংলাদেশে গণজাগরণ এখন খুব আশা করা হয়। যত্রতত্র গণজাগরণের কথা উচ্চারিত হয়। কিন্তু গণজাগরণ এত সহজ ব্যাপার নয়। সেই ১৯০৫ সাল থেকে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত একটানা প্রায় পৌনে এক শতাব্দী ছিল আমাদের গণজাগরণের কাল। হিন্দু-মুসলমান বিরোধের অপঘাত সত্ত্বেও তখন সম্ভব হয়েছিল ইংরেজ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ, তারপর জমিদারি ব্যবস্থার বিলোপ সাধন, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি।

সব আন্দোলন গণজাগরণের পরিচায়ক নয়। গণজাগরণে দেশব্যাপী জনগণের মহৎ মানবিক গুণাবলির জাগরণ ঘটে, জনগণ মহান কিছু অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয় ও সংগ্রাম চালায়। গণজাগরণে মহান নেতৃত্ব সৃষ্টি হয়, উন্নত চরিত্রবলসম্পন্ন লেখক-শিল্পী-চিন্তক আত্মপ্রকাশ করেন। হুজুগ আর গণজাগরণ কখনো এক নয়। হুজুগে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল হীন স্বার্থ হাসিলের জন্য নানা কৌশলে প্রচার চালিয়ে জনসাধারণকে আন্দোলনে মাতায় এবং কৌশলে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে নেয়। গণজাগরণে ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলেও তার চরিত্র হুজুগ থেকে ভিন্ন। বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় বাংলাদেশে আমরা যদি নতুন রেনেসাঁস ও তার ধারাবাহিকতায় নতুন গণজাগরণ সৃষ্টি করতে পারি, তাহলে বিশ্বব্যাপী আগামী ঐতিহাসিক কালের জন্য বাংলাদেশ অগ্রযাত্রী হয়ে থাকবে।

নবপ্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশে প্রথমে দেখা গেছে স্বতঃস্ফূর্ত স্বার্থান্ধ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। তারপর ১৯৮০’র দশক থেকে তো কেবল হুজুগের পর হুজুগই সৃষ্টি করা হচ্ছে। এই সময়ের ঘটনাবলিতে জনজীবনের মহৎ মানবিক গুণাবলির জাগরণ কোথায়? মহান লক্ষ্য কোথায়? গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতিগঠন, রাষ্ট্রগঠন- এসব ক্ষেত্রে আদৌ কি কিছু অর্জিত হয়েছে? কেবল উৎপাদন ও সম্পত্তি বাড়লেই হয় না; মানুষ তো মানবিক গুণাবলি হারিয়ে চলছে! অসামাজিক কার্যকলাপ, ধর্ষণ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ব্যাপকভাবে চলছে। অবস্থা এমন যে, ‘সমাজে যার ক্ষতি করার শক্তি যত বেশি, তার প্রভাব-প্রতিপত্তি তত বেশি’, মানুষের কল্যাণ করার শক্তি এ সমাজে কোনো শক্তিবলেই স্বীকৃতি পায় না। জাতীয় উন্নতির জন্য উৎপাদন ও সম্পত্তি বৃদ্ধির সঙ্গে নৈতিক উন্নতিও লাগে- জাতিগঠন ও রাষ্ট্রগঠন দরকার হয়। রাষ্ট্র হলো জাতির রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার বাস্তব রূপ এবং জাতির অন্তর্গত জনগণের স্বার্থরক্ষার ও উন্নতির অবলম্বন। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে বাংলাদেশে জাতি ও রাষ্ট্রের রূপ এবং প্রকৃতি কেমন? নতুন শতাব্দীর সূচনাকালে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো বাংলাদেশকে অভিহিত করত ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ বলে। এখন বাংলাদেশ কি সফল রাষ্ট্র? আমি রাষ্ট্র গঠনের দিক দিয়ে বাংলাদেশের কথা বলছি।

নবউত্থানের জন্য গণজাগরণ অপরিহার্য। কিন্তু কিছু লোক গণজাগরণ চাইলেই তো জনগণ ঘুম থেকে জেগে ওঠে না। জনগণের ঘুম ভাঙানো অত্যন্ত কঠিন কাজ। দীর্ঘ সাধনার ব্যাপার। কায়েমি-স্বার্থবাদীরা জনসাধারণকে ঘুম পারিয়ে রাখতে চেষ্টা করছে। প্রচারমাধ্যম এ কাজে তাদের প্রধান অবলম্বন। কার ডাকে কেন সাড়া দেবে জনগণ? হুজুগের পক্ষে অনেকে আছেন, কিন্তু গণজাগরণের পক্ষে শিল্পী, কবি, কুশীলব, বিশিষ্ট নাগরিক, লেখক, চিন্তক, রাজনীতিক কোথায়? সমাজের স্তরে স্তরে জনগণ এখন আছে কায়েমি-স্বার্থবাদী প্রবলদের কঠোর নিয়ন্ত্রণে। দুর্বলদের মধ্যে ঐক্য নেই, ঐক্যের বোধও নেই।

আজকের বাস্তবতায় নতুন গণজাগরণের পূর্বশর্ত হিসেবে প্রথমে দরকার নতুন রেনেসাঁসের সূচনা। রেনেসাঁস ও গণজাগরণ পরস্পর পরিপূরক। এদেশে রেনেসাঁস ছিল, গণজাগরণও ছিল। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে সবার কর্মফলে সে সব শেষ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় আগেকার রেনসাঁস ও গণজাগরণকে ফিরিয়ে আনা কিংবা তার পুনরুজ্জীবন ঘটানো যাবে না। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয় না। সৃষ্টি করতে হবে নতুন কালের নতুন রেনেসাঁস ও নতুন গণজাগরণ।

নতুন রেনেসাঁসের জন্য তথ্যাদির ভিত্তিতে চিন্তাশক্তি ও কল্পনাশক্তি খাটিয়ে অতীতের রেনেসাঁস এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য নতুন রেনেসাঁস- দুটো সম্পর্কেই যথাসম্ভব পরিচ্ছন্ন ধারণা অর্জন করতে হবে। কী ছিল, কী আছে, কী করা যাবে, কী করতে হবে- অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তার স্পষ্ট চিত্র সামনে রাখতে হবে। শুধু চিন্তা দিয়ে হবে না, বাস্তবায়নের জন্য কাজও করতে হবে। চিন্তা ও কাজ দুটোই অপরিহার্য- দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ; কখনো চিন্তার প্রয়োজন বেশি হতে পারে, কখনো কাজের প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, কোনো জাতির শিল্পী-লেখক-চিন্তকরা যখন গতানুগতিকে হারিয়ে যান, তখন সেই জাতির মধ্যে সৃষ্টিশীলতা ও প্রগতিশীলতা দুর্লভ হয়ে পড়ে।

কলকাতার সংসদ ইংরেজি-বাংলা অভিধানে রেনেসাঁস-এর বাংলা দেওয়া আছে ‘নবজন্ম’। কীসের নবজন্ম। জীবন-জগৎ সৃষ্টির নবজন্ম, সভ্যতা-সংস্কৃতির নবজন্ম, জাতিরই নবজন্ম। জীবন-জগৎসৃষ্টিতে নব দেখা দিলে সভ্যতা সংস্কৃতি নবায়িত হয়- জাতিরই নবজীবন লাভ ঘটে। রাতারাতি ঘটে যায় না- কারণ কার্যসূত্র ধরে একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই নবায়ন, নবজন্ম, নতুন জীবন লাভ ঘটে। পুরাতনের গর্ভ থেকেই জন্ম নেয় নতুন। কোনো জাতির জীবনে রেনেসাঁস দেখা দিলে সেই জাতিরই নবজন্ম বা নতুন জীবন লাভ ঘটে। কোনো জাতির সভ্যতা-সংস্কৃতির মধ্য দিয়েই সেই জাতির আত্মশক্তি ও আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পায়।

যে রেনেসাঁস ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীতে সূচিত হয়েছিল এবং ইউরোপ ও অন্যান্য মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং ঊনিশ শতক পর্যন্ত বিকাশশীল ছিল, তার মর্মে ছিল জীবন-জগতের রহস্য জানার এবং সত্য ও ন্যায় সন্ধানের অদম্য স্পৃহা, আর মিথ্যা অন্যায় ও দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্তির প্রবল আকাঙ্ক্ষা। রেনেসাঁসের মনীষীরা তত্ত্বচিন্তা করেছেন ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ জ্ঞানকে অবলম্বন করে। তথ্য অবলম্বন করে তারা সত্য সন্ধান করেছেন। গতানুগতিকে তাদের আস্থা ছিল না- তারা ছিলেন আবিষ্কার-উদ্ভাবনপ্রয়াসী। সর্বোপরি তারা ছিলেন অসাধারণ বৌদ্ধিক চরিত্রবলের অধিকারী। তখনই প্রথম মানুষ মানবীয় মূল্যবোধ, শাস্ত্রনিরপেক্ষ যুক্তি আর নতুন আশা নিয়ে পরকালের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ইহকালের দিকে ভালো করে তাকিয়ে ছিল এবং ঈশ্বরকেন্দ্রিক গির্জাকেন্দ্রিক বাইবেলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির জায়গায় মানুষকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করেছিল। বিজ্ঞানকে প্রাধান্য দিয়ে এগোতে এগোতে মানবজাতির মধ্যে উপলব্ধি জেগেছিল যে, মানুষের শক্তি ও সম্ভাবনা অফুরন্ত ও ক্রমবর্ধমান। তাতে মানুষের চিন্তা ও কর্মের প্রকৃতি বদলে যায়। মানুষ আত্মশক্তিতে আস্থাশীল ও আত্মনির্ভর হতে থাকে এবং ঈশ্বর ও ধর্মগ্রন্থের ওপর নির্ভরশীলতা ত্যাগ করতে করতে নিজেদের শক্তিতে আস্থাশীল হয়। প্রত্যেক জাতি যেমন স্বতন্ত্র, তেমনি প্রত্যেক জাতির রেনেসাঁসও স্বতন্ত্র। প্রত্যেক জাতি যেমন স্বতন্ত্র, তেমনি প্রত্যেক জাতির সভ্যতাও স্বতন্ত্র। রেনেসাঁস এক বিকাশশীল প্রত্যয়। ইতিহাসে যাকে আধুনিক যুগ বলা হয়, রেনেসাঁস হলো সেই যুগের গোটা সময়ের মর্মগত স্পিরিট। রেনেসাঁসের কালে চিন্তার একাধিক ধারা ও চিন্তকদের নানা প্রবণতা ছিল। রেনেসাঁস-বিরোধী চিন্তার ধারাও ছিল। রেনেসাঁস-সাধকেরাও মানবীয় দুর্বলতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন না। আধুনিক যুগের অবক্ষয় সূচিত হলে রেনেসাঁস অবসিত হতে থাকে।

জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্যচর্চা, অধিকার-উদ্ভাবন ও সব রকম মানবীয় কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে অভিব্যক্তি ঘটে রেনেসাঁসের। রেনেসাঁসের প্রেরণাজাত স্বতঃস্ফূর্ত কিংবা সচেতন জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা আর অন্য উদ্দেশ্যে এসবের চর্চা- মোটেই একরকম ব্যাপার নয়। আজকালকার একাডেমিক গবেষণায় রেনেসাঁসের আন্তরিকতা ও অনুসন্ধিৎসা খুঁজে পাওয়া যায় না।

দেশান্তর যাত্রা ও দুঃসাহসী অভিযান- জলপথে ভারতে আসার পথ আবিষ্কার, আমেরিকা, উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরু আবিষ্কার, অস্ট্রেলিয়ার ও অন্ধকারাচ্ছন্ন আফ্রিকার রহস্য সন্ধান, এভারেস্ট অভিযান, মহাকাশ অভিযান ইত্যাদির মর্মেও ছিল রেনেসাঁসের স্পিরিট। মানববাদ, দৃষ্টবাদ, উপযোগবাদ, প্রয়োগবাদ, ধর্মতন্ত্র, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদ ইত্যাদির উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে রেনেসাঁসেরই স্পিরিট অবলম্বন করে। রেনেসাঁসের ধারা ধরেই উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, প্রাণিবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব, জ্যোতির্বিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন ও বিভিন্ন ধারার প্রযুক্তির। বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানমনস্কতা প্রাধান্য বিস্তার করেছে। ইহলৌকিক-উপলব্ধিজাত, মানববাদী শিল্পকলা ও সাহিত্য সৃষ্টির মর্মেও কাজ করেছে জ্ঞাত ও অজ্ঞাত রেনেসাঁসের স্পিরিট।

তখনকার রেনেসাঁস ছিল মধ্যযুগের গর্ভ থেকে আধুনিক যুগকে মুক্ত করার এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে জীবনবাদী নতুন নতুন সৃষ্টি ও আবিষ্কার উদ্ভাবন দিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অবস্থাকে সমৃদ্ধ ও সুন্দর করার আন্দোলন। এর মধ্যে আর্থসামাজিক-রাষ্ট্রিক ব্যবস্থারও পরিবর্তন ঘটেছে। কোনো জাতির জীবনে রেনেসাঁস হলো দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক আন্দোলন যা দ্বারা মানুষের জীবন-জগৎ সৃষ্টিতে মৌলিক পরিবর্তন ঘটে চলে এবং সর্বক্ষেত্রে আঁকা-বাঁকা উঁচু-নিচু পথ ধরে সৃষ্টি ও প্রগতির ধারা বহমান থাকে। রেনেসাঁসে চিন্তার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সাধন করা হয় আর্থসামাজিক-রাষ্ট্রিক অগ্রগতি।

চৌদ্দ শতক থেকে ঊনিশ শতক পর্যন্ত ছয়শ’ বছর নানাভাবে ইউরোপের জাতিগুলোর মধ্যে রেনেসাঁসের স্পিরিট বহমান ছিল। ঊনিশ শতকের শেষে ইউরোপ-আমেরিকার বৃহৎ শক্তিবর্গ যখন কর্তৃত্ব বিস্তারের ও উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় মত্ত হয়ে সংঘাতের দিকে এগিয়ে চলে, তখন তাতে দেখা দেয় ভাটা এবং তা দ্রুত ক্ষয় পেয়ে যেতে থাকে। তাদের মধ্যে তখন সভ্যতা, সংস্কৃতি, প্রগতির তাড়নার চেয়ে ক্ষমতালিপ্সা ও সম্পত্তিলিপ্সা অনেক প্রবল হয়ে ওঠে। ক্রমে অপশক্তি দীর্ঘকালের জন্য শুভশক্তিকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ওই সময়ই সংঘটিত হয় দুই বিশ্বযুদ্ধ ও আনুষঙ্গিক নানা ঘটনা। যুদ্ধের ও আনুষঙ্গিক ঘটনাবলির অভিঘাতে মানুষের জীবনোপলব্ধি ও চিন্তা-চেতনা বদলে যেতে থাকে। দুই বিশ্বযুদ্ধের কালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অপব্যবহার দেখে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন : বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ? মানুষের কি কোনো ভবিষ্যৎ আছে? Has Man a Future নামে বার্ট্রান্ড রাসেলের একটি বই আছে। তবে রাসেল কখনো নৈরাশ্যবাদের দিকে ঝোঁকেননি। চরম অবিমৃষ্যকারিতার পরে মানবপ্রজাতি আবার উঠে দাঁড়ায়- এ প্রত্যয় তার ছিল। সিগমান্ড ফ্রয়েড, ওসওয়াল্ড স্পেংলার, আলবার্ট সুয়েটজার, জন ভিইউ, রবীন্দ্রনাথ, রাসেল, এরিখ ফ্রোম, আইনস্টাইন, সার্ত্রে প্রমুখ মনীষী বিংশ শতাব্দীতেও রেনেসাঁসের স্পিরিট ও পরম আশাবাদ অবলম্বন করে চিন্তা ও কাজ করেছেন। রেনেসাঁসের স্পিরিট লেনিন, মাও সেতুং, গোর্কি, লু সুন প্রমুখের মধ্যেও ছিল। এসব দেখে বলা যায় বিশ শতকের অধিকাংশ সময়জুড়ে রেনেসাঁস প্রসারিত হয়েছিল। রেনেসাঁসের স্পিরিট এখনো বিভিন্ন ভূভাগে কিছু মনীষীর মধ্যে জীবন্ত আছে।

বাংলা ভাষার দেশে ঊনিশ শতকের প্রথম পাদে রামমোহনের (১৭৭২-১৮৩৩) চিন্তা ও কাজের মধ্য দিয়ে সূচিত হয়েছিল রেনেসাঁস। তাতে প্রথমে হিন্দুসমাজে, পরে মুসলমান সমাজে জাগরণ দেখা দিয়েছিল। বেগম রোকেয়ার (১৮৮০-১৯৩১) চিন্তা ও কর্মের মধ্য দিয়ে বাঙালি মুসলমান সমাজে সূচিত হয়েছিল রেনেসাঁস। বাংলা ভাষার দেশে হিন্দু ও মুসলমান ধর্মের সমন্বয়ে কোনো একীভূত ধর্ম কিংবা একীভূত জীবনদর্শন কিংবা একীভূত জাতীয় সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। এক দেশে বসবাস করা সত্ত্বেও হিন্দু সম্প্রদায় ও মুসলমান সম্প্রদায় বিকশিত হয়েছে স্বতন্ত্র মন নিয়ে- স্বতন্ত্র ধারায়। এর মধ্যে কার্যকর হয়েছিল ব্রিটিশ সরকারের Divide and Rule Policy. সাম্প্রদায়িকতাবাদের আবর্তে পড়ে জাতীয়তাবাদী হতে দুই সম্প্রদায়ই ব্যর্থ হয়েছে।

বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের সময় (১৯০৫-১১) সূচিত গণজাগরণের ধারা আঁকা-বাঁকা পথ ধরে চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে বাংলাদেশে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত বহমান ছিল। একাত্তরের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত কালে ঢাকাকেন্দ্রিক জাতীয় সংস্কৃতিতে জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতে রেনেসাঁসের প্রেরণাও বহমান ছিল। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে সার্বিক বিশৃঙ্খলা ও সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতার মধ্যে সে ধারা ক্ষীয়মাণ হয়ে পড়ে। ১৯৭২ সাল থেকে ঢাকাকেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে যে বুদ্ধিজীবীরা নঞর্থক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অত্যন্ত উগ্রতার সঙ্গে কেবল প্রতিবাদ করেছেন, কোথাও সদর্থক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেননি, প্রতিবাদ করে নিজের স্বার্থ হাসিল করে নিয়েছেন, জাতির জন্য তাদের কোনো অবদান আছে কি? যারা সব সময় সাম্রাজ্যবাদী ও সরকারি লাইনে চলেছেন, ব্যক্তিগত স্বার্থের বাইরে জাতির জন্য তারাই বা কী করেছেন? বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর স্বার্থান্ধ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও সাম্রাজ্যবাদী পরিচালনার মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের অবস্থা কেমন? অবশ্য এর মধ্যেও খোঁজ করলে দেখা যায়- বাংলাদেশে ও পশ্চিম বাংলায় নগণ্যসংখ্যক লেখকের চেতনায় রেনেসাঁসের স্পিরিট বহমান আছে। নতুন রেনেসাঁসের দাবি- আধুনিক যুগের অনাচার থেকে মুক্তিলাভ ও নতুন ভবিষ্যৎ সৃষ্টি।

আ বু ল  কা সে ম  ফ জ লু ল হ ক

লেখক : সৃষ্টিশীল চিন্তক

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads