• শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads

ছবি: সংগৃহীত

মতামত

আইনি সহায়তা ও  সীমাবদ্ধতা

  • প্রকাশিত ২৮ এপ্রিল ২০১৮

তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিনমজুর আক্কাস মণ্ডলের স্ত্রী জামেনা খাতুনকে প্রচণ্ড মারধর করে প্রতিপক্ষের লোকজন। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল থেকে গুরুতর জখমের সনদ দেওয়া হয়। কিন্তু মামলা করেননি আক্কাস মণ্ডল। এ প্রসঙ্গে আক্কাস মণ্ডল জানান, ‘দ্যাহেন, আমি মামলা-মোকদ্দমার কিছুই বুঝি না। শুনেছি থানায় গেলে অনেক টাকা-পয়সা লাগে। তা ছাড়া মামলার বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই। সে কারণে থানায় মামলা করতে যাইনি।’ অজ্ঞতার কারণে আক্কাস মণ্ডল থানায় মামলা না করায় কোনো বিচার পাননি। তিনি আইন সহায়তা কেন্দ্রের কথা জানেন না।

শ্রীসুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস। বসবাস করেন কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম শিমুলিয়ায়। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি আর উৎকৃষ্ট নীতিকে পুঁজি করে বেঁচে আছেন। সুভাষ চন্দ্রের বৈষয়িক সম্পত্তি বেদখল হয়ে গেছে। আজ তিনি সব কিছু হারিয়ে সহায়-সম্বলহীন। নিজের খাবারটুকুও সংগ্রহ করা এখন তার জন্য কঠিন একটি কাজ। অথচ তার নিজের জমি রয়েছে, যা অন্যরা দখল করে খাচ্ছে। নিজের বাস্তুভিটায় অন্যের বসবাস। শুধু অর্থাভাবে তিনি মামলা করে অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারছেন না। তাই তিনি আইনজীবীর শরণাপন্ন হন তার প্রাপ্য বুঝে পাওয়ার আইনি লড়াই শুরু করার জন্য। কিন্তু টাকা-পয়সা না হলে কি আর মামলা হয়? মামলার বহু স্তর। প্রত্যেক স্তরে প্রয়োজন অর্থের। তবেই প্রতিকার। অবশেষে তিনি বাংলাদেশ সরকারের আইনগত সহায়তা কেন্দ্রে আবেদন করেন আইনগত সহায়তা লাভের জন্য। তার আবেদনটি বিবেচনায় নিয়ে আইনগত সহায়তা কেন্দ্র থেকে মামলাটি আদালতে দায়ের করা হয়েছে। শ্রীসুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস আগে জানতেন না, তার মতো গরিব মানুষ বিনাপয়সায় মামলা দায়ের করে আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ পেতে পারেন।

আইনের দৃষ্টিতে দেশের সব নাগরিকই সমান। প্রত্যেকেই ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারী। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিককে এ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের দরিদ্র বিচারপ্রার্থীরা অনেক সময় টাকা-পয়সার অভাবে মামলা পরিচালনা করতে পারে না। এতে তারা নিজেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। কোনো ব্যক্তি যেন ন্যায়বিচার প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত না হয় সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আর্থিকভাবে অসচ্ছল, সহায়সম্বলহীন এবং নানাবিধ আর্থসামাজিক কারণে বিচারপ্রাপ্তিতে অসমর্থ বিচারপ্রার্থীর ন্যায়বিচায় নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় ২০০০ সালে, কানাডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সির সহযোগিতায়। সরকার দরিদ্র বিচারপ্রার্থীদের জন্য আইনগত সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০’ পাস করে। এ আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য সরকার সারা দেশের বিভিন্ন জেলায় পৃথক পৃথক জেলা আইন সহায়তা অফিস স্থাপন করেছে এবং অফিসগুলো কার্যকরের জন্য প্রতিটি অফিসে একজন সহকারী জজ পদমর্যাদার কর্মকর্তা নিয়োগসহ প্রতিটি অফিসে তিনজন করে কর্মচারী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

আর্থিকভাবে অসচ্ছল, সহায়-সম্বলহীন ও নানাবিধ আর্থসামাজিক কারণে বিচার প্রাপ্তিতে অসমর্থরা আইনগত সহায়তা পাবেন। কর্মক্ষম নন, আংশিক কর্মক্ষম, কর্মহীন বা বার্ষিক ৭৫ হাজার টাকার ঊর্ধ্বে আয় করতে অক্ষম মুক্তিযোদ্ধা, বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন এমন কোনো ব্যক্তি, দুস্থ মা, পাচারের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও শিশু, এসিডদগ্ধ নারী ও শিশু, আদর্শ গ্রামে বসবাসরত ব্যক্তি, অসচ্ছল বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্ত বা দুস্থ মহিলা, উপার্জনে অক্ষম বা সহায়-সম্বলহীন প্রতিবন্ধী, বিনাবিচারে কারাগারে রয়েছেন, হয়রানির শিকার হয়ে কারাগারে আছেন, কোনো কারণে বিচার বিলম্বিত হচ্ছে অথচ আসামিকে কারাগারে দিন কাটাতে হচ্ছে, স্বামী পরিত্যক্ত অথচ অধিকার আদায়ের জন্য মামলা করার আর্থিক সামর্থ্য নেই, নিজের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের শিকার হয়েছেন অথচ মামলা করার আর্থিক সামর্থ্য নেই এমন সব ব্যক্তি, মহিলা ও শিশুদের আইনগত সহায়তা দেয় সরকার।

এ ছাড়া আর্থিক অসচ্ছলতার দরুন আদালতে অধিকার প্রতিষ্ঠা বা আত্মপক্ষ সমর্থন করতে অসমর্থ ব্যক্তি, বিনাবিচারে আটক এমন ব্যক্তি যিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও আদালত কর্তৃক আর্থিকভাবে অসহায় বা অসচ্ছল বলে বিবেচিত ব্যক্তি এবং জেল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আর্থিকভাবে অসহায় বা অসচ্ছল বলে সুপারিশকৃত কোনো ব্যক্তিও আইনের অধীনে আইনগত সহায়তা পাওয়ার অধিকারী। সর্বোপরি আর্থিকভাবে অসচ্ছল, সহায়সম্বলহীন, নানাবিধ আর্থসামাজিক এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অসচ্ছলতার কারণে অধিকার প্রতিষ্ঠার মামলা পরিচালনায় অক্ষম ব্যক্তিরা আইনগত সহায়তা পাবেন।

আইনগত সহায়তা পাওয়ার জন্য প্রতিটি জেলার জেলা আইনগত সহায়তা কমিটির কাছে আবেদন জানানো যাবে। দেশের ৬৪ জেলায় আইন সহায়তা কমিটির কার্যালয় গঠন করার বিধান থাকলেও অধিকাংশ জেলায় এ কার্যালয় নেই। কোনো আসামি কারাগারে থাকলে তার স্বজনরা এ আবেদন করতে পারবেন। অথবা আদালতের অনুমতি নিয়ে আটক আসামি নিজেই আবেদন জানাতে পারবেন।

আইনি সহায়তাপ্রাপ্তির যোগ্যতাসম্পন্ন যে কোনো ব্যক্তি তার নাম, পূর্ণ ঠিকানা এবং সহায়তা চাওয়ার কারণ উল্লেখ করে নির্ধারিত ফরমে বা সাদা কাগজে আবেদন করবেন। তবে যে বিষয়ে সহায়তা চাওয়া হচ্ছে তা সুপ্রিমকোর্টের কোনো বিভাগে বিচারাধীন হলে সে ক্ষেত্রে বিচারপ্রার্থী আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর সভাপতিত্বে গঠিত জাতীয় আইনগত সহায়তা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করবেন।

প্রতিটি জেলার আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক, জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা বা কারা কর্তৃপক্ষের কাছে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পাওয়ার জন্য আবেদন করা যাবে। এ ছাড়া জেলা কমিটির সহায়ক কর্মকর্তা এবং অফিস সহকারীর কাছে; জেলা আদালতগুলোর বেঞ্চ সহকারীর কাছে; জাতীয় মহিলা সংস্থার জেলা ও উপজেলা কার্যালয়ে আইনি সহায়তা পাওয়ার আশায় আবেদন করা যায়।

সুপ্রিমকোর্ট ছাড়া অন্য কোনো আদালতে মামলাটি বিচারাধীন হলে সরাসরি জেলা ও দায়রা জজের সভাপতিত্বে গঠিত ‘জেলা আইনগত সহায়তা কমিটি’র কাছে আবেদন করতে হবে। তবে উপজেলা চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে গঠিত উপজেলা আইনগত সহায়তা কমিটি অথবা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে গঠিত ইউনিয়ন আইনগত সহায়তা কমিটির কাছেও আবেদন করা যাবে। জেলা আইনগত সহায়তা কমিটি কারো আবেদন অগ্রাহ্য করলে বা বাতিল করলে সে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আবেদনকারী জাতীয় আইনগত সহায়তা পরিচালনা বোর্ডের কাছে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে আবেদন করতে পারবেন।

আইনগত সহায়তা পেতে আবেদন জানাতে কোনো টাকা-পয়সার দরকার নেই। আইনগত সহায়তা কমিটি সরকারি খরচে আবেদনকারীর জন্য আইনজীবী নিয়োগ করবে। তারাই মামলা পরিচালনা করবেন। মামলা পরিচালনার জন্য কোনো আইনজীবীকেও টাকা-পয়সা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সব জেলায় আইনজীবীর একটি প্যানেল রয়েছে। তারা আইনগত সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন।

সরকারি খরচে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের মামলা পরিচালনা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো ব্যক্তির মামলা করার প্রয়োজন হলে সরকারি খরচে মামলা দায়েরের ব্যবস্থা গ্রহণ করে; দেওয়ানি, ফৌজদারি, পারিবারিকসহ প্রায় সব ধরনের মামলায় আইনগত সহায়তা দেওয়া হয়; নারী, পুরুষ ও শিশু কেউ যদি টাকার অভাবে মামলা না করতে পারে অথবা বিনাবিচারে কারাগারে আটক থাকে, তাহলে সরকারি খরচে আইনগত সহায়তা দেওয়া হয় তাদের।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয়লাভের অধিকারকে জনগণের মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নাগরিকদের এ মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০’ বাস্তবায়নের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্রসহ অন্যান্য গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। আইন, বিধি ও অন্যান্য তথ্যসংবলিত ক্ষুদ্র পুস্তিকা প্রকাশসহ সেমিনার, কর্মশালা ও জনসচেতনতামূলক অনুষ্ঠান ও ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে আইনগত অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আইনগত সহায়তা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে সরকারকে অনেক বেশি আন্তরিক হতে হবে।

*২৮ এপ্রিল’২০১৮ আইনগত সহায়তা দিবস উপলক্ষে নিবন্ধটি প্রকাশিত হলো।

 

 

লেখক :অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

আইনজীবী

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads