• শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads

মতামত

শিক্ষিত বেকার ও শিক্ষার মান

  • প্রকাশিত ২৯ এপ্রিল ২০১৮

আমাদের দেশে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার কয়েকটি দুর্বল দিকের মধ্যে একটি হচ্ছে কর্মসংস্থানের নীতিমালার সঙ্গে এর লক্ষ্যগত দূরত্ব। যেমন চাকরির বাজারে চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু বিভাগে অধিক শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। আবার চাহিদা থাকলেও বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও প্রকৌশলের মতো বিভাগে আসন বাড়ানো হচ্ছে না। বিশ্বব্যাংকের ‘সাউথ এশিয়া হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট সেক্টর : অ্যান অ্যাসেসমেন্ট অব স্কিলস ইন দ্য ফরমাল সেক্টর লেবার মার্কেট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমানে দেশের মোট শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বেশি ৩০ দশমিক ৫ শতাংশ রয়েছে কলা ও মানবিক অনুষদে। অথচ চাকরির বাজারে এর চাহিদা ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ এ শাখায় প্রয়োজনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হচ্ছে। অন্যদিকে বিজ্ঞান শিক্ষায় ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থীর বাজারে চাহিদা থাকলেও সংশ্লিষ্ট বিভাগে লেখাপড়া করছে মাত্র ৮ শতাংশ। ফলে বিজ্ঞান শিক্ষায় এখনো ঘাটতি রয়েছে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থীর। আর এর ফলে শিক্ষিত বেকারে দেশ ভরে যাচ্ছে।

তারপর রয়েছে, যারা যে বিভাগ বা ডিসিপ্লিনেই পড়াশোনা করুক না কেন, মানসম্মত শিক্ষার প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে। বিষয়ভিত্তিক শিখন মান যাচাইয়ে লার্নিং অ্যাসেসমেন্ট অব সেকেন্ডারি ইনস্টিটিউশনস শীর্ষক একটি জরিপ চালানো হয় দেশের ৩২ জেলার ৫২৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর। এতে অংশ নেয় ষষ্ঠ ও অষ্টম শ্রেণির ৩১ হাজার ৬২০ শিক্ষার্থী। অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা বিষয়ে দক্ষতা যাচাইয়ে যেসব প্রশ্ন করা হয়, তার মধ্যে একটি ছিল ‘সন্ধি বিচ্ছেদ’। ‘মৃৎ+ময়’-এর সন্ধি হলে কী হবে? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারে ৪১ শতাংশ শিক্ষার্থী, অর্থাৎ অষ্টম শ্রেণির ৫৯ শতাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যেই বাংলা ব্যাকরণের এ মৌলিক বিষয়ে জ্ঞান নেই। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে শিখন মান কেমন তা যাচাইয়ে সর্বশেষ ২০১৫ সালে একটি জরিপ চালায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর। তাতে দেখা যায়, অষ্টম শ্রেণির অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থীর বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে দক্ষতা কাঙ্ক্ষিত মানে নেই।

ইংরেজি ভাষায় শিক্ষার্থীর দক্ষতা পরিমাপে প্রশ্ন করা হয় সর্বনামের ব্যবহার প্রসঙ্গে। একটি পূর্ণাঙ্গ বাক্যের যে স্থানে সর্বনাম ব্যবহূত হবে, সে স্থানটি শূন্য রাখা হয়। শূন্যস্থান পূরণের জন্য দেওয়া হয় চারটি সম্ভাব্য উত্তর। সহজ এ প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারেনি ২৭ শতাংশ শিক্ষার্থী। গণিতের দক্ষতা যাচাইয়ে বিভিন্ন দূরত্বের জন্য লাল ও সবুজ রঙের দুটি ট্যাক্সির ভাড়া লেখচিত্র অঙ্কন করে ৫০ কিলোমিটারের জন্য অপেক্ষাকৃত সস্তা ট্যাক্সি নির্ধারণ করে কারণ ব্যাখ্যা করতে বলা হয়। এর সঠিক উত্তর দিতে সক্ষম হয় অষ্টম শ্রেণির মাত্র ২ শতাংশ শিক্ষার্থী, ৯৮ শতাংশ শিক্ষার্থী সঠিক উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়। এ ধরনের প্রশ্নের ভিত্তিতে পরিচালিত জরিপ প্রতিবেদন বলছে অষ্টম শ্রেণির মাত্র ১৯ শতাংশ শিক্ষার্থীর ইংরেজিতে প্রয়োজনীয় দক্ষতা রয়েছে। এ ছাড়া গণিতে দক্ষতা রয়েছে ২২ ও বাংলায় ৫৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর। অর্থাৎ ৫৪ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলা পাঠ থেকে তথ্য জানতে ও বুঝতে পারে। জটিল বাক্য সহজভাবে বলার সক্ষমতাও তারা দেখিয়েছে। আর ১৯ শতাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজিতে অপরিচিত ও জটিল টেক্সট পড়ে তার অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবন, বিভিন্ন তথ্যের সংযোগ প্রতিষ্ঠার দক্ষতা দেখাতে পেরেছে। গণিতে পরিচিত টাস্ক সমাধান এবং ওইসব টাস্কে ভুল হলে সেটা সংশোধনের দক্ষতা রয়েছে ২২ শতাংশ শিক্ষার্থীর।

জ্ঞান কাঠামোর এ নিম্নমান তাদের কর্মজীবনেও প্রভাব ফেলছে। বিশ্বব্যাংক মনে করছে, মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার নিম্নমান ও বাস্তবতার সঙ্গে ন্যূনতম সম্পৃক্ততার কারণে অপর্যাপ্ত তাত্ত্বিক জ্ঞান নিয়ে তারা উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে। গত ৩১ মার্চ প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ : স্কিলস ফর টুমরোস জবস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলছে, দক্ষতার অন্যতম ভিত্তি হলো শিক্ষার্থীর অক্ষরজ্ঞান ও গাণিতিক হিসাবের সক্ষমতা। মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার নিম্নমুখী মানের কারণে তাত্ত্বিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষতার ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে। পরবর্তীতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কার্যকরভাবে দক্ষতা উন্নয়নেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে এ দুর্বল ভিত। অল্প কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক বিষয়ে দক্ষতা বাড়াতে বিশেষ ব্যবস্থার সুযোগ রেখেছে। তবে দক্ষতা বৃদ্ধির এ সুযোগও পায় না প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে চলে যাওয়া শিক্ষার্থীরা। আর মাধ্যমিক পরবর্তী শিক্ষা গ্রহণকারীদের মধ্যেও দক্ষতার অভাব থেকে যাচ্ছে। দক্ষতার এ ঘাটতির কারণে চাকরিপ্রার্থীরা চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে অবদান রাখতে পারছে না। শিক্ষার এ  দুর্বল মান নিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি সম্ভব নয় আর তাই বিদেশিরা এসে বিলিয়ন ডলার নিয়ে যাচ্ছে আমাদের দেশ থেকে।

শিক্ষার নিম্নমান ও শিক্ষার্থীদের বর্তমান যুগের চাহিদা অনুযায়ী গড়ে তুলতে প্রয়োজন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক। সেটি প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের শিখন মানের অনেকটাই নির্ভর করে শিক্ষকের যোগ্যতার ওপর। অথচ দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের বড় অংশই অপ্রশিক্ষিত। এমনকি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও মানসম্পন্ন ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন শোনা যায়।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার উৎকৃষ্টতার বিষয়টি গভীরভাবে ভাবতে হবে, কারণ শিক্ষার উন্নয়ন না হলে রাষ্ট্রের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এটি সত্যি যে, শিক্ষা পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে অনেক বেশি। আবার এও সত্য যে, বর্তমান যুগের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষিত জনবল আমরা অনেক ক্ষেত্রেই তৈরি করতে পারছি না। বিষয়টির দিকে এখন দৃষ্টি দিতে হবে। আরোপিত শিক্ষা কাঠামো মানুষের মধ্যে যেমন সীমাবদ্ধ চিন্তাশক্তি তৈরি করে, তেমনি মানুষের মধ্যে জনস্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার মানসিকতা সৃষ্টি করে। প্রচলিত পদ্ধতি মানুষের মনকে প্রস্তুত করতে পেরেছে কি না সে বিষয়টিও দেখতে হবে।

শিক্ষার মান নির্ধারণের সঠিক কোনো মানদণ্ড নেই। শিক্ষার মান যেখানে পৌঁছানো উচিত ছিল, সেই কাঙ্ক্ষিত মানে আমরা পৌঁছতে পারিনি। শিক্ষার্থীদের পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। তারা তো আলু-পেঁয়াজ নয় যে, তাদের প্রোডাক্ট হিসেবে দেখতে হবে। তাদের মানুষ হিসেবেই মূল্যায়ন করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আলোকে এক্সপেরিমেন্টাল স্কুল চালু করা যেতে পারে। নিরাময়মূলক শিক্ষা চালু ও শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি জোরদার করতে হবে, তাহলে শিখন দুর্বলতা দূর করা সম্ভব হবে। মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিতকরণে মূল্যবোধ, নৈতিকতা, দেশপ্রেমযুক্ত আধুনিক বিজ্ঞামনস্ক শিক্ষাব্যবস্থা দরকার। এজন্য প্রয়োজন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের যৌথ মিথস্ক্রিয়া। শিক্ষা কোনো যান্ত্রিক এবং ব্যবসায়িক উপকরণ নয়। মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিতকরণের জন্য প্রয়োজন কমিটমেন্ট, নার্সিং, প্রয়োজন স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও যুগোপযোগী কারিকুলাম এবং সিলেবাস প্রণয়ন।

 

মাসুম বিল্লাহ

এনজিও কর্মী

ইমেইল : masumbillah65@gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads