• বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads

মতামত

দায়িত্বশীলতার বিকল্প নেই

  • প্রকাশিত ০৩ মে ২০১৮

বেশ কিছুদিন ধরে অনেক কিছুই বোঝা যাচ্ছে না— বোধ-চেতনাও কেন যেন ঠিক ঠিক কাজ করছে না! চলতে-ফিরতে চোখের সামনে যা যা দেখতে হয়— প্রতিদিন সংবাদপত্রে যা যা পাঠ করতে হয়— টিভি চ্যানেলের খবরে যা যা শুনতে হয়- তাতে মনে হচ্ছে, কোনো কিছুই আর আগের মতো নেই। সবকিছুই কেমন যেন উল্টেপাল্টে গেছে। আমরা- যাদের বয়স বেড়েছে, তারা যেন আর চলতি হাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছি না। কেন এই অনুভূতি? এই প্রশ্নটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পরিবর্তন কোনো দোষণীয় প্রবণতা নয়— মানবজাতি পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই সামনে এগোয়। অগ্রসরমাণতার এই দিক বস্তুসভ্যতার আওতাধীন। আর এর ভেতর রয়েছে যে মনন-সভ্যতা, যার চর্চা মানুষকে মানুষ হিসেবে মর্যাদাবান করেছে, সেই মানবিক বৈশিষ্ট্য। মানবিকতার সঙ্গে সমান্তরালে চলতে পারে না, এমন পরিবর্তন মানব-কল্যাণের বিষয় নয়— মূলধারার বিষয় নয়।

সাধারণভাবে এটাই দৃশ্যগ্রাহ্য হয়ে উঠছে যে, স্বয়ংক্রিয়তা ও তথ্যপ্রযুক্তি যত বিস্তৃত হচ্ছে, মানবিক শক্তি তত আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। স্বয়ংক্রিয়তা বা তথ্যপ্রযুক্তির বৈশিষ্ট্য, স্পর্শকাতরতা কিংবা বোধ-চেতনা প্রতিদিন তীক্ষতর হয়ে উঠছে। তা যত তীক্ষ বা ধারালো হয়ে উঠছে, মানবীয় বৈশিষ্ট্য, বোধ-চেতনা তত ক্ষীয়মাণ হয়ে পড়ছে। মৌলিক মানবীয় বৈশিষ্ট্যই মানুষের চালিকাশক্তি। তা যখন ক্ষীয়মাণ হয়ে ওঠে, তখন মানবিক বোধ-শোধও পরিপূর্ণভাবে থাকে না।

আমরা সাধারণ মানুষ সাদা চোখে দেখছি পরিবার-সমাজ-দেশ সর্বত্র মানবের বোধ-চেতনাসহ সার্বিক বৈশিষ্ট্য কীভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। স্বয়ংক্রিয়তা বা তথ্যপ্রযুক্তির ভেদবুদ্ধি সাধারণ মানুষের বিশেষ করে বোঝার কথা নয়। বিজ্ঞান কিছু বলে কি-না, বললে কী তার ধরন-ধারণ, সে ব্যাপারে সাধারণ মানুষের তেমন কোনো বোধ-শোধ থাকার কথা না হলেও বোধ-শোধহীন কর্মকাণ্ডের অসহায় শিকার তাদেরই হতে হচ্ছে।

মানব আচরণে কী ধরনের পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে এবং তা পরিবার-সমাজ-দেশ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কী ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করছে, তথ্যপ্রযুক্তির জ্ঞান না থাকলেও এটা দিব্যি লক্ষ করা যেতে পারে, যদি কেউ তা দেখতে চান। পরিবর্তন ভালো বা মন্দ যা-ই হোক, সেসব লক্ষ করা দরকার— অনুধাবন করা দরকার এবং বিচার-বিশ্লেষণও করা দরকার। এটা সমাজচিন্তকদের কাজ হলেও এই তাগিদ সমাজের সর্বস্তর থেকে উচ্চারিত হলে কাজটি হবে এবং এর ফলে ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ-দেশ সর্বক্ষেত্রে ইতি-নেতি কী কী প্রভাব দেখা দিতে পারে বা দেখা দিচ্ছে— সে সম্পর্কে সজাগ হওয়া যাবে— আগেভাগে সতর্কতামূলক পদক্ষেপও নেওয়া যাবে।

গত দিনগুলোতে সারা দেশে আলোচনার বিষয় ছিলেন হাত হারানো যুবক রাজীব। রাজীব মারা গেলেন— তার অসহায় দুই কিশোর ভাই মর্গের সামনে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে— তাদের বেদনায় নীল অসহায় দৃষ্টি— পত্রিকার এই করুণ ছবি কি ওই দুই বাস কর্তৃপক্ষের হূদয়ে কোনো তোলপাড় সৃষ্টি করতে পেরেছে? রাজীব যখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন, তখন কি ওই দুই বাসের কর্তৃপক্ষীয় কেউ হাসপাতালে তাকে দেখতে গেছেন— তার চিকিৎসার ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়েছেন বা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন? সর্বোপরি রাজীবের হাত হারানো এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর খবরে কি বড় ধরনের বিচলন সৃষ্টি হয়েছে— এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে আর একজনকেও এভাবে অকালে ঝরে যেতে না হয়? বাবা-মাহারা তিন ভাইয়ের বাঁচার যে অসহায়-যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই যাত্রাপথ তছনছ করে দিল দুই বাসের অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা— যা ট্রাফিক বিধির চরম লঙ্ঘন। ট্রাফিক বিধি যদি কঠোর ও দুর্নীতিমুক্তভাবে প্রয়োগ সম্ভব হতো, তাহলে প্রতিদিন রাস্তায় এ ধরনের হাজারো প্রতিযোগিতা দেখতে হতো না অসহায় যাত্রীদের, রাজীবের  মতো পিতা-মাতাহীন সংসারে ঘুরপাক-খাওয়া একমাত্র সহায় বা আশ্রয়স্থল এভাবে মিলিয়ে যেত না। উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ না হলেও অল্পে তুষ্ট থেকে দুই ভাইকে নিয়ে রাজীব নিজের মতো বাঁচতে পারতেন। তাকে রাজধানীর ট্রাফিক-বিধির শৈথিল্যজাত বিশৃঙ্খল সড়ক-পরিবহন ব্যবস্থা বাঁচতে দিল না, এ কথা না বলে কি পারা যাবে? এ প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়া যাবে না, আমাদের বিবেক কি আদৌ আগেকার মতো সচল আছে?

রাজীবের পর একই ধরনের দুর্ঘটনায় খালিদ তার ডান হাত হারিয়ে হাসপাতালে তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। পা হারানো তরুণী রোজিনা ইতোমধ্যে মারা গেছেন। এমন বিবরণ আর কতদিন পাঠ করতে হবে, কে জানে! দুর্ঘটনা ঘটলে অনেকে মোবাইলে ছবি তোলায় মনোযোগী হয়ে পড়েন। দুর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তিকে অকুস্থল থেকে দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা আজকাল উপস্থিত লোকজন কী করে ভুলে যেতে পারে? যাত্রাবাড়ীতে এক মা তার মেয়েকে বাসে তুলে দিতে এসে বাসের ধাক্কায় আহত হন এবং তাকে ওই অবস্থায় ঘণ্টাদেড়েক ওখানেই পড়ে থাকতে হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি মারা যান। সঙ্গে সঙ্গে তাকে চিকিৎসার আওতায় আনা হলে হয়তো তাকে এভাবে মৃত্যুর হাতে সমর্পিত হতে হতো না। কেন এ কাজটি হলো না— এর সঙ্গে মানবীয় আচরণের শৈথিল্য কতটা যুক্ত রয়েছে, তা ভেবে দেখা খুবই দরকার।

সমস্যাটা কোথায়? আমার এক নাতি— রাতিক দু’বছর তিন মাস বয়স। বাড়িতে কারো বেতাল অবস্থা দেখলে, সে প্রশ্ন করে— তোমার সমস্যা কী? এই প্রশ্নটি ওই ছোট্ট শিশু করতে পারে, আমরা কি করতে পারি না? সমস্যাটা কী— তা যদি জানতে পারা না যায়, তাহলে সমাধান হবে কী করে? এ প্রশ্ন যাদের করার, তারা আদৌ করছেন কি-না জানি না। তবে এ প্রশ্নের জবাব অনেক বছর ধরেই দিয়ে যাচ্ছেন বুয়েটের এ-সংক্রান্ত সংস্থাটি। সংবাদপত্রে আলোচনায় আনছেন সাংবাদিকরা। যাত্রীসাধারণ এবং বোদ্ধা মহলও এ ব্যাপারে কথা বলছেন। সারা জগতের মানুষও যদি বিষয়টা মানে সমস্যাটা নিয়ে আলোচনার পর আলোচনা চালিয়ে যান, তাতে কিছু হবে না- যদি না দায়িত্বশীলরা আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা শনাক্ত করে সমাধানের লক্ষ্যে উপযুক্ত বিধি-ব্যবস্থা গ্রহণ করে কঠোরভাবে কার্যকর করেন।

প্রতিবেশী দেশ ভারতে উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণাঞ্চলে বিস্তীর্ণ পার্বত্য এলাকায় বিপজ্জনক রাস্তা— যেখানে যানবাহনে সংঘর্ষ হলে হাজার হাজার ফুট নিচে পড়ে যেতে হয়— সেসব রুটে বাস-ট্রাক-কার চলছে। ওইসব বিপজ্জনক রাস্তায় কয়টা দুর্ঘটনা ঘটে— কত মানুষের প্রাণ যায়? চালকরা সর্বদা স্মরণ রাখেন এক মুহূর্তের জন্য বেখেয়াল হলে বা শৈথিল্য ভর করলে একজন যাত্রীও প্রাণে বাঁচবেন না। যানবাহন মালিকরাও দায়িত্বশীল বলে যথেষ্ট যোগ্য-দক্ষ চালক নিয়োগ করেন এবং প্রতি মুহূর্তে তাদের মনিটরিংয়ে রাখেন— সতর্ক রাখেন। আর এদেশে কোথায় পাহাড়— বিপজ্জনক রাস্তা? তারপরও হাজার হাজার মানুষকে প্রতিবছর প্রাণ দিতে হচ্ছে। যানবাহন চালকদের সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই। পার্বত্যই হোক বা সমতল রাস্তা, চলাচলের জন্য নিরাপদ থাকে যানবাহন চালকদের দায়িত্বশীলতার জন্যই। যে দেশে যানবাহন চালকরা যথেষ্ট সচেতন ও দায়িত্বশীল, সে দেশে হরদম দুর্ঘটনা ঘটে না— অকাতরে যাত্রীদের প্রাণও দিতে হয় না।

সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুতে শুধু আত্মীয়-স্বজন নন, দেশের বিবেকবান প্রতিটি মানুষ কষ্ট পান— নিজেরা তাদের এই কষ্ট নিয়ে কথা বলেন— বিরক্তি এবং ক্ষোভও প্রকাশ করেন। এতে নগরীর রাস্তায় বা সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনা-প্রাণহানির কোনো হেরফের হচ্ছে না। সড়ক দুর্ঘটনার একঘেয়ে আলোচনা কাটিয়ে ওঠা যাবে না, যদি না মজবুত-দায়িত্বশীল গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়।

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে সাধারণ মানুষ খুবই উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধ— এটা তাদের কথাবার্তায় বেশ বোঝা যায়। সেদিন বাসে এক যাত্রী বলছিলেন, আমরা গণপরিবহন ব্যবস্থা যে বুঝি না, এটা আমার মতো আধা-শিক্ষিতও দিব্যি বুঝতে পারে! আরেকজন বললেন, এটা কীভাবে বুঝলেন? আগেরজন জবাব দিলেন, এই যে এতক্ষণ আমাদের নিয়ে বাসগুলো রাস্তায় উবু হয়ে ঝিম মেরে ছিল— দেড় ঘণ্টায় শাহবাগ থেকে সোনারগাঁও পৌঁছলাম— এরপর বোঝার আর কি কিছু বাকি থাকতে পারে? আরেকজন যাত্রী ফ্লোর (যদিও ফ্লোরে তিল পরিমাণ জায়গা খালি ছিল না) নিয়ে বললেন, বিধি-ব্যবস্থা সুশৃঙ্খল হলে— শৃঙ্খলা রক্ষায় আন্তরিক হলে কম সম্পদ, কম সুযোগ-সুবিধা নিয়েও গতিশীল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা খুবই সম্ভব। এদেশে এমন বহু অল্পে তুষ্ট পরিবার অল্প সামর্থ্য দিয়েও ভদ্রস্থ জীবনযাপন করছেন এবং সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। তাদের নজির লক্ষ্য করে জাতীয় পর্যায়ে এর প্রয়োগ আমরা ঘটাতে পারছি কি না— এটা ভেবে দেখা দরকার। এর মধ্যে আরেকজন বলে উঠলেন, আমাদের কর্তাব্যক্তিরা তো হরহামেশা বিদেশে যান— দেখে শিখবেন কবে?

আমার তখন মনে পড়ল বছর তিরিশেক আগে আমার এক বন্ধু কলকাতা ঘুরে এসে বলেছিলেন, কলকাতায় অ্যাম্বাসেডর ছাড়া কোনো গাড়ি নেই— এমনকি ঊর্ধ্বতন সচিবরাও ট্রামে অফিস করেন। আজ দেখা যাচ্ছে, ভারত বিশ্বের প্রায় সব গাড়িনির্মাতা দেশের নানা ব্র্যান্ডের গাড়ি তৈরি করে বিদেশে রফতানিও করছে— সে দেশে নতুন গাড়ির দাম আমাদের রিকন্ডিশন্ড গাড়ির অর্ধেকেরও কম। ওই সময় বা তার কিছু আগে আমরা একথাও তো শুনেছি যে, চীনে মন্ত্রীরাও নাকি সাইকেলে অফিস করতেন। আজকের চীনের দিকে তাকালে কী দেখতে পাই আমরা!

রাজধানীতে ফ্লাইওভার-এক্সপ্রেসওয়ে-মেট্রোরেল আরো অনেক কাজ হচ্ছে। তবে এখন যা আছে— যতটুকু আছে, তাকে পুরোপুরি ব্যবহারের জন্য পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম গড়ে তোলা এবং কার্যকরভাবে পরিচালনা করার অপরিহার্য কাজটি যে কোনো কারণেই হোক যেখানে হচ্ছে না, সেখানে এতসব আয়োজন সম্পন্ন হওয়ার পর রাতারাতি কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা কি গড়ে উঠতে পারবে? এটা বিশ্বাস করতে পারলে, তা নিশ্চিত সুখকর হতো। কেন বিশ্বাস করা যায় না, তারও ব্যাখ্যা আছে— যাদের জানার, তারা বেশ ভালোই জানেন। দেশে বড় সঙ্কট যদি কিছু থেকে থাকে, সেটা সিস্টেমের এবং সিস্টেম কার্যকর করার জন্য কঠোরভাবে বিধি-বিধান প্রয়োগের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল করে তোলা। ঢাকার রাজপথে সুষ্ঠু গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলে ট্রাফিক-বিধির কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে যানজট নিরসনসহ দুর্ঘটনার রাশ টেনে ধরতে পারলে এই একটি কাজ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সাফল্যের বড় নজির হয়ে থাকবে— এটা নিশ্চিত করে বলা যেতে পারে। 

 

ইউসুফ শরীফ

কলাম লেখক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads