• বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads

মতামত

প্রাথমিক শিক্ষার দুরবস্থা

  • মাছুম বিল্লাহ
  • প্রকাশিত ১০ মে ২০১৮

দেশের প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কিত দুটি প্রতিবেদন পড়ছিলাম। একটি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের, আরেকটি ঢাকা সিটির। প্রাথমিক শিক্ষার করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে প্রতিবেদন দুটিতে। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার দক্ষিণ বঠিনা রিভার ভিউ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তিনটি শ্রেণিকক্ষের একটিতে তিনজন শিক্ষার্থী গল্প করছে, আরেকটিতে দুজন বই পড়ছে, অন্যটিতে তিন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করছেন একজন শিক্ষিকা। শিক্ষকদের কক্ষে মোবাইল ফোনে কথা বলছেন অন্য একজন শিক্ষিকা। স্কুলসুদ্ধ এই দুজন শিক্ষিকাকেই পাওয়া গেল। তারা জানালেন বিদ্যালয়ের চার শিক্ষকের মধ্যে এই দুজন উপস্থিত। একজন ছুটিতে এবং প্রধান শিক্ষক জরুরি কাজে সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসে গেছেন। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের উপজেলা ও জেলা অফিসে নিয়মিত যাতায়াত করা ছাড়াও জনসংখ্যা গণনা, ভোটার লিস্ট থেকে শুরু করে বহু ধরনের কাজ করতে হয়। দেশের প্রায় চৌষট্টি হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে বিশ হাজার বিদ্যালয়ে বহু বছর যাবত কোনো প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী প্রধান শিক্ষকের মধ্যে থেকে একজনকে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে যিনি সরকারি শিক্ষা অফিসে যাতায়াত, সরকারি অন্যান্য কাজ এবং বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন বলে ক্লাস নিতে পারেন না। ষাট শতাংশ শিক্ষক নারী হওয়ায় দেখা যায় বহু বিদ্যালয়েই একজন মাতৃত্বজনিত কিংবা অসুস্থতাজনিত কারণে ছুটিতে থাকেন। তাই দুজন, কোথাও কোথাও একজন শিক্ষকই একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা করেন। অনেক বিদ্যালয়ে এমনও হয় যে, একজন শিক্ষক তিন বা চার শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একত্র করে দুটি ক্লাস কোনোরকমে নিয়ে স্কুল ছুটি দিয়ে দেন। প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিদ্যালয়টির উপস্থিত শিক্ষিকা দুজন জানালেন, তাদের বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী এক শ জনের বেশি। কিন্তু প্রতিবেদক সব বিদ্যালয় ঘুরে মাত্র নয়জন শিক্ষার্থীর দেখা পেলেন। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিজস্ব জায়গায় ঘর, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, আসবাবপত্র, খেলার সরঞ্জামসহ রেজিস্ট্রেশন বা জাতীয়করণ হতে কমপক্ষে ১৫০ জন শিক্ষার্থী থাকা প্রয়োজন। অথচ ঠাকুরগাঁওয়ের সরকারি গেজেটভুক্ত ১০টি বিদ্যালয়ের পরিবেশ ও শিক্ষার মান নাজুক, এর কোনোটিতে ৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থী নেই। জোড়াতালি আর বাঁশের খুঁটি দিয়ে ঘর, ওপরে টিন দিয়ে কোনোরকমে নির্মিত হয়েছে এসব বিদ্যালয়। যে বিদ্যালয়টির কথা এখানে বেশি আলোচনা করা হলো সেটিতে উপস্থিত দুই শিক্ষিকা জানান, এখানে চাকরির জন্য তাদের এক লাখ টাকা করে ঘুষ দিতে হয়েছে। এই একটি কথার মধ্যেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার করুণ চিত্র ফুটে ওঠে। কোথায় আদর্শ, কোথায় মানসম্মত শিক্ষা আর কোথায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ? আমরা ব্যর্থ হয়েছি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অন্তত একটু প্রাথমিক শিক্ষার নিশ্চয়তা দিতে। ২০১৩ সালে সরকার সারা দেশের রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের ঘোষণা দেওয়ার পর এ বিদ্যালয়গুলো  তালিকাভুক্ত হয়। ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করায় সরকারকে অবশ্যই আমরা সাধুবাদ জানাই। কিন্তু শুধু সরকারি ঘোষণা দিলেই যে, সরকারের দায়িত্ব শেষ হয় না সেটি বোধহয় আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। কোন বিদ্যালয়গুলোকে আমরা জাতীয়করণ করলাম, কী শর্তাবলি ছিল, জাতীয়করণের পর কী কী কাজ করতে হবে— এ বিষয়গুলো নিয়ে খুব একটা ভাবা হয়নি বা হচ্ছে না বলেই মনে হয়।

পঞ্চগড়ের বিলুপ্ত ৩৬টি ছিটমহলে গত দুই মাসে ৩৪টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। একটি চক্র প্রতিটি বিদ্যালয়ে ৫-৬ জন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। বিলুপ্ত ৩৬টি ছিটমহলের মধ্যে জনবসতি রয়েছে ১৭টিতে। ছিটমহল বিনিময় চুক্তি বাস্তবায়ন হওয়ার পর সরকার বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে ছিটমহলের উন্নয়নকাজ শুরু করে। শিক্ষা, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকাজ চলছে। এর অংশ হিসেবে ৩৬টি ছিটমহলে ১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৫টি বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ছিটমহলগুলোতে স্কুল, কলেজ ও মাদরাসাসহ মোট ৩৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এর মধ্যে পাঠদানের অনুমতি পেয়েছে মাত্র ৬টি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ছিটমহলগুলো বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হয় ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই। কিন্তু সদ্য প্রতিষ্ঠিত এসব বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকাল দেখানো  হয়েছে ২০০৮ সালে। কত বড় জালিয়াতি চলছে এই সেক্টরে, মনে হয় দেখার  কেউ নেই।

এবার ঢাকা সিটির কথায় আসি। ঢাকা শহরে সাড়ে আট হাজারের বেশি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে, আর সরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যা তিন শর মতো। এর অর্থ কী? ঢাকা সিটির লোকজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাদের বাচ্চাদের কমই পাঠান, অর্থাৎ তারা এখানকার মান নিয়ে সন্তুষ্ট নন। তাই বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষাই প্রসারিত হয়েছে ঢাকা  সিটিতে। কিন্তু এগুলোর অবস্থাও করুণ। অনেক স্কুল আছে যেখানে স্কুল চালানোর পরিবেশ নেই। এজন্য অনেকে বিদ্যালয়ের অনুমোদন নিতে সরকারি অফিসে আসে না। শহরের  সর্বত্র নিবন্ধনের শর্ত হলো বিদ্যালয়ের নিজস্ব ভবন থাকতে হবে। তবে ভাড়া ভবনে বিদ্যালয় হলেও তা অন্তত সাড়ে তিন হাজার বর্গফুট হতে হবে। অন্তত ছয়টি শ্রেণিকক্ষ থাকতে হবে। যে জায়গায় বিদ্যালয় হবে তা অন্তত আট শতাংশ ভূমির ওপর হতে হবে। স্কুলের জন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও নিজস্ব তহবিল থাকতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ বিদ্যালয় এসব শর্ত পূরণের ধারে-কাছেও নেই, আবার অনেক শর্ত পূরণ করার মতোও নয়, কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা তো বন্ধ রাখা যাবে না। শর্তগুলো পালন করা হচ্ছে কিনা তা তদারকির জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় তদারকি হয় না। এই সুবাদে ঢাকার সিটির যত্রতত্র গড়ে উঠেছে প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানকারী কেজি (কিন্ডারগার্টেন) স্কুল। কেবল ঢাকার রামপুরার উলন রোডে কিন্ডারগার্টেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসা মিলে ১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলোর কয়েকটির নামের সঙ্গে কলেজ থাকলেও বাস্তবে বেশিরভাগেরই মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ারও সুযোগ নেই। জেএসসি, এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয় এমপিওভুক্ত অন্য স্কুলে নিবন্ধন করে। উলন রোডের এই অংশটি এক কিলোমিটারও কম, অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আঠারোটি। তবে প্রতিটিতে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থীও রয়েছে। এখানে কয়েকটি মেসেজ রয়েছে। ঢাকা সিটিতে প্রচুর পরিমাণে মানসম্মত প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রয়োজন অথচ আমরা রাষ্ট্র থেকে কিংবা ব্যক্তিপর্যায়ে সে ধরনের বিদ্যালয় স্থাপন করতে পারছি না। আমরা শিশুদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশে প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারছি না।

ঢাকা জেলা শিক্ষা অফিস (গুলশান থানা) থেকে জানা যায়, উলন রোডের বেসরকারি প্রাথমিক স্কুল-কলেজগুলোর নিবন্ধন নেই। তবে এগুলোর একটি এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (ইআইএস) কোড আছে। এই কোডের মাধ্যমে বিদ্যালয়গুলো অনলাইনে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে এটি কোনো নিবন্ধন নয়। সরকার যেহেতু বিনামূল্যে বই দিচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিতে হয় এসব কাজের জন্য এই তালিকা রাখা হয়। ঢাকা সিটির শিশুদের জন্য রাষ্ট্র উপযুক্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারেনি। সম্পূর্ণ প্রাইভেট সেক্টরে চলছে প্রাথমিক শিক্ষা। এটা সত্য, ঢাকা সিটিতে তিন শতাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। সেসব প্রাথমিকে একটু সচ্ছল পরিবারের কেউ পড়ে না। সেগুলোর অবস্থা আরো করুণ। অবস্থাদৃষ্টে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়— কোন পথে এগুচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রাথমিক শিক্ষা?

 

লেখক : সাবেক শিক্ষক, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত

masumbillah65@gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads