• মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯, ৫ ভাদ্র ১৪২৫
ads

মতামত

জলবায়ু পরিবর্তন ও বজ্রপাত 

  • মাহমুদুল হক আনসারী
  • প্রকাশিত ১০ মে ২০১৮

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা। বাড়ছে নানামুখী জনদুর্ভোগ। যখন-তখন আঘাত হানছে ঝড়, তুফান ও সমুদ্রের নিম্নচাপ। বজ্রপাতের সঙ্গে ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। প্রতিনিয়ত নিহতের সংখ্যা বাড়ছে। বজ্রপাত এড়াতে কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে সরকারি দফতর থেকে। বৈরী আবহাওয়ায় অনেকটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। এপ্রিল মাসব্যাপী সকাল থেকে প্রচণ্ড রোদে জ্বলছিল প্রাণ ও প্রকৃতি। সকাল ১১টার পরেই হঠাৎ শুরু হওয়া দমকা হাওয়াসহ আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। বাতাসের তীব্রতা কিছুক্ষণ স্থায়ী হওয়ার পর অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ে। কয়েক ঘণ্টা বিরামহীন বৃষ্টিতে পথ-ঘাট ফাঁকা হয়ে যায়। মুহূর্তেই শুরু হয়ে যায় বজ্রপাত। আর তাতে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ভারী বর্ষণে শহরের বিভিন্ন অলিগলিতে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। তখন দুর্ভোগ বেড়ে যায় খেটে খাওয়া মানুষের। বাতাস শুরু হলেই বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় মোমবাতি জ্বালিয়ে কাজ করতে হয় অফিসপাড়ায়। বজ্রপাত এড়াতে প্রশাসনের দেওয়া দিকনির্দেশনায় বলা হয়েছে- ক. ঘন ঘন বজ্রপাত হতে থাকলে কোনো দালানের নিচে আশ্রয় নিতে পারলে ভালো হয়। এ সময় কোনো অবস্থাতেই খোলা বা উঁচু জায়গায় থাকা উচিত নয়। খ. ফাঁকা জায়গায় যাত্রীছাউনি, উঁচু গাছপালা, বিদ্যুতের খুঁটি ইত্যাদিতে বজ্রপাতের আশঙ্কা বেশি থাকে। বজ্রপাতের সময় এসব থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করা দরকার। গ. বজ্রপাতের সময় বাসাবাড়িতে থাকলে জানালা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করা কর্তব্য। ঘ. বজ্রপাত ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং, পাইপ ইত্যাদি থেকে দূরে থাকা বাঞ্ছনীয়। এমনকি ল্যান্ড লাইন টেলিফোনও স্পর্শ করা বিপজ্জনক। এগুলোর সংস্পর্শেও আহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ঙ. বজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক সংযুক্ত সব যন্ত্রপাতি স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। বজ্রপাতের আলামত দেখা দিলেই টিভি, ফ্রিজ ইত্যাদি বন্ধ রাখতে হবে। বৈদ্যুতিক বোর্ড থেকে অব্যবহূত যন্ত্রপাতির প্লাগ খুলে রাখা জরুরি। চ. বজ্রপাতের সময় গাড়িতে থাকলে দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে কোনো বারান্দা বা পাকা ছাউনির নিচে অবস্থান করা দরকার। এ সময় গাড়ির কাচে হাত দেওয়া বিপজ্জনক। ছ. বজ্রপাতের সময় চামড়ার ভেজা জুতো বা খালি পায়ে থাকা খুবই বিপজ্জনক। বের হতে হলে পা ঢাকা জুতো পরিধান করে বের হওয়া উত্তম। জ. বজ্রপাতের সময় রাস্তায় চলাচলে আশপাশে খেয়াল রেখে চলতে হবে। কেউ আহত হলে দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

দেশে বজ্রপাতে এ পর্যন্ত ৭০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। গত আট বছরে বজ্রপাতে বাংলাদেশে মারা গেছে ১ হাজার ৮০০ মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটির ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক ড. টমাস ডব্লিউর গবেষণায় বলা হয়, প্রতিবছর মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৪০টি বজ্রপাত হয়। বজ্রপাতে মৃত্যুর হার বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হারের চেয়ে বেশি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বছরের এ সময়ে বৃষ্টিপাতের সঙ্গে বজ্রপাতও ব্যাপক হারে হয়ে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক তাওহিদা রশীদ বলেন, বজ্রপাত বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। বিজ্ঞানীদের অনেকে মনে করেন, বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য এমনটি হচ্ছে। তবে এ মতের সঙ্গে অনেক বিজ্ঞানী দ্বিমত পোষণ করেন। বাংলাদেশে তাপমাত্রা বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন হয়েছে, এরও প্রভাব দেশে পড়েছে। বাংলাদেশে দশমিক ৭৪ শতাংশ তাপমাত্রা বেড়েছে। বিকেলে বজ্রপাত হওয়ার হার বেশি। এ বিষয়ে আবহাওয়া বিজ্ঞানী তাওহিদা রশীদ বলেন, বজ্রপাতের ধরনই এমন। সকালের দিকে প্রচণ্ড তাপমাত্রা হয়। এতে করে অনেক জলীয় বাষ্প তৈরি হয়। এ জলীয় বাষ্পই বজ্রঝড় ও বজ্রপাতের প্রধান শক্তি। তাপমাত্রা যত বাড়বে, জলীয় বাষ্প বা এ ধরনের শক্তিও তত বাড়বে। এই বিজ্ঞানী আরো বলেন, জলীয় বাষ্প বেড়ে যাওয়া মানে হলো ঝড়ের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়া। বছরে ১ ডিগ্রি তাপমাত্রা বাড়ার কারণে ১ শতাংশ বজ্রঝড় বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি কোনো কোনো বিজ্ঞানী প্রমাণও করেছেন। কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় বজ্রপাত বেশি হয় কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে এ বিজ্ঞানী বলেন, অঞ্চলভেদে এটি কমবেশি হচ্ছে। বজ্রঝড় ও বজ্রপাত এপ্রিল ও মে মাসের কিছু সময় ধরে প্রতিবছরই হয়। এ বছর কিছুটা বেশি মনে হচ্ছে। তবে ওই অধ্যাপকের মতে, বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে বজ্রপাতের সংখ্যা বেশি। কারণ ওখানে হাওরের কারণে জলীয় বাষ্প বেশি হয়। সে কারণে সিলেটের ওই অঞ্চলটিতে বজ্রপাতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ওই প্রফেসর বলেন, বজ্রপাত প্রকৃতির একটি বিষয় এবং এটি হবেই। তবে এতে প্রাণহানি কমানোর সুযোগ আছে। বজ্রপাত যখন শুরু হয়, তখন এর তিনটি ধাপ থাকে। প্রথম ধাপে বিদ্যুৎ চমকালেও বজ্রপাত শুরু হয় না। প্রথমে মেঘ তৈরি হতে থাকে এবং সে সময় আকাশের অবস্থা ঘন কালো হয় না। একটু কালো মেঘের মতো তৈরি হয়। সামান্য বৃষ্টি ও হালকা বিদ্যুৎ চমকায়। তখনই মানুষকে সচেতন হতে হয়। প্রতিটি দুর্যোগে একটি নির্দিষ্ট সময় আছে এবং সে সময় সম্পর্কে প্রতিটি মানুষের সচেতন হওয়া উচিত। বাইরে থাকলে যখন দেখা যাবে আকাশ কালো হয়ে আসছে, তখনই নিরাপদ জায়গায় যেতে হবে। নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য তখন অন্তত ৩০ মিনিট পাওয়া যায়। বজ্রপাত প্রকৃতির একটা ধারাবাহিক খেলা। প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ বজ্রপাতের অন্যতম কারণ। সমাজ ও রাষ্ট্রের উচিত প্রকৃতির যথাযথ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে কখনো সমাজ ও পরিবেশ টিকে থাকতে পারে না। তাই এ সময় আমাদের বেশি বেশি প্রকৃতিবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে।

 

লেখক : প্রাবন্ধিক

mh.hoqueansari@gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads