• শনিবার, ৪ জুলাই ২০২০, ২০ আষাঢ় ১৪২৭
ads
চরের মানুষ : বাজেটে বাড়তি বরাদ্দ চাই

চরবাসীর জীবন-জীবিকা নদী ও চরকেন্দ্রিক

আর্ট : রাকিব

মতামত

চরের মানুষ : বাজেটে বাড়তি বরাদ্দ চাই

  • আবদুল হাই রঞ্জু
  • প্রকাশিত ২৮ মে ২০১৮

দেশের মোট জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের বসবাস চরাঞ্চলে। চরের মানুষ আধুনিক যুগের সুযোগ-সুবিধা থেকে অনেকটাই বঞ্চিত। চরবাসীর জীবন-জীবিকা নদী ও চরকেন্দ্রিক। তারা বালুময় জমিতে নানা জাতের ফসল চাষাবাদ করে। আবার অনেকেই নৌকায় মাঝিমাল্লার কাজ করে কিংবা নদীতে মাছ ধরে জীবন নির্বাহ করে। বেশিরভাগ চরেই নেই বিদ্যুতের আলো কিংবা পাকা সড়ক। একমাত্র কাঁচা রাস্তাই সেইসব চরের মানুষের চলাচলের অবলম্বন। ঝড়-ঝঞ্ঝা, টর্নেডো, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে যারা একমাত্র সৃষ্টিকর্তার কৃপায় বেঁচে থাকার লড়াই করে। সেখানে নেই কোনো শিল্প, কল-কারখানার বিন্দু পরিমাণ লেশমাত্র। অথচ প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে জনসংখ্যাও বাড়ছে সমান তালে। চরাঞ্চলে মানুষ বাড়লেও বাড়ছে না কর্মসংস্থানের সুযোগ। ফলে বেকারত্ব, কর্মহীনতা চরাঞ্চলগুলোর জন্য বড় সমস্যা। বাস্তব এ অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে সরকার ২০১৮-১৯ সালের জাতীয় বাজেটে চরের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। মূলত উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন প্রকল্প মিলে এসব অর্থ বরাদ্দ রাখা হবে।

সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ থাকবে চরের অবকাঠামো উন্নয়নে। এর মধ্যে ব্রিজ, কালভার্ট, গেস্ট হাউজ, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণে বরাদ্দ থাকবে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিবি), রাজস্ব খাত ও প্রশাসনিক ব্যয় মিলিয়ে বরাদ্দ থাকবে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। বাকি ২০০ কোটি টাকা থাকবে কয়েকটি তহবিলে। চরাঞ্চলের মানুষের জীবন-মান উন্নয়নে এবারই প্রথম জাতীয় বাজেটে বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। এভাবে প্রতিবছরই যদি জাতীয় বাজেটে চরাঞ্চলের উন্নয়নে বাড়তি বরাদ্দ রাখা অব্যাহত থাকে, তাহলে প্রকৃত অর্থে সুবিধাবঞ্চিত চরাঞ্চলের মানুষের কর্মসংস্থান, জীবন-মান উন্নয়নে অবদান রাখা সম্ভব হবে। স্বাধীনতা উত্তর গত ৪৬ বছরে ব্যাপকভাবে গ্রামীণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। যেমন- গ্রামীণ রাস্তা পাকাকরণ, ব্রিজ, কালভার্ট নির্মাণ, হাট-বাজার উন্নয়নসহ গ্রামে উৎপাদিত ফলমূল, শাক-সবজি নিকটস্থ হাট-বাজারে সহজেই কেনাবেচার সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে মানুষ প্রতিদিনই সকাল-সন্ধ্যায় টাটকা শাক-সবজি সহজেই কিনতে পারে। আবার গ্রামীণ জনপদে রাস্তাঘাট উন্নয়নের পাশাপাশি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ও স্থাপিত হয়েছে। ফলে শিক্ষার হারও তুলনামূলক বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু চরাঞ্চলের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে এক চর থেকে অন্য চরে যাওয়া-আসার মতো যেমন কোনো পাকা রাস্তা নেই, আবার সেখানে যাওয়া-আসার একমাত্র মাধ্যমই হলো নৌকা। চরাঞ্চলে প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যাও কম। দেখা যায়, এক চরের ছেলেমেয়েরা অন্য চরে স্থাপিত স্কুলে পড়াশোনা করতে নৌকায় যাওয়া-আসা করে। চরাঞ্চলে শিশুদের শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহই বেশি লক্ষণীয়। আর উচ্চ মাধ্যমিক কিংবা কলেজ না থাকায় চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার এখনো অনেক বেশি। অথচ চরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার মান বাড়াতে হলে প্রতিটি শিশুকে শিক্ষিত করতে হবে। এ জন্য ঘনবসতির চরাঞ্চলের সুবিধাজনক স্থানে সরকারিভাবে উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজ স্থাপন করতে হবে, যাতে সহজেই এখানকার ছেলেমেয়েরা শিশুশ্রেণি থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত নিজের বাড়িতে খেয়ে-পরে পড়াশুনা করার সুযোগ পায়। এ কারণে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে চরাঞ্চলের উন্নয়নে যে বাড়তি বরাদ্দ রাখা হচ্ছে, তাকে আমরা সরকারের সঠিক ও সময়োচিত ইতিবাচক সিদ্ধান্তই মনে করে সাধুবাদ জানাই। পাশাপাশি মনে করি, আগামী বাজেটে চরাঞ্চলের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে যে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে, সেই বরাদ্দ থেকে শিক্ষার মান উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি। সরকার চরভিত্তিক কর্মসংস্থানের বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে নানামুখী কর্মসৃজন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে বিশেষ ঋণ কর্মসূচি চালু করেছে। এই কর্মসূচি আরো সম্প্রসারিত করতে আগামী জাতীয় বাজেটে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়াকে সঠিক ও সময়োচিত বলতে হবে। 

ইতোমধ্যেই চরাঞ্চলের মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও টাকার প্রবাহ বাড়াতে পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) থেকে বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে চরাঞ্চলে বিশেষ ঋণ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। যার আওতায় গবাদিপশু কেনা, হাঁস-মুরগির ফার্ম করা, মৌচাষ করার জন্য ঋণ দেওয়া হচ্ছে। এসব কারণে পিকেএসএফ ও সরকারের তিনটি তহবিলে বরাদ্দ থাকবে ২০০ কোটি টাকা। এসব অর্থ সরকার স্থানীয় প্রশাসন ও পিকেএসএফ এনজিওগুলোর মাধ্যমে ঋণ বিতরণ কর্মসূচি পরিচালনা করবে।

বিশেষ করে, সরকার নদী বা সাগর মোহনায় অবস্থিত চরগুলোতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সরকারি তথ্য মতে, দেশে প্রায় ৫৭টি চর বা দ্বীপে প্রায় দেড় কোটি মানুষের বসবাস। এর মধ্যে সমৃদ্ধ দ্বীপগুলো হচ্ছে সন্দ্বীপ, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া। এসব দ্বীপে পর্যটকদের ভিড় কমবেশি লেগেই থাকে। যাদের চলাচলের জন্য ও থাকার জন্য পাকা রাস্তা, গেস্টহাউজ নির্মাণে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। আমরা প্রত্যাশা করি, পর্যটন দ্বীপগুলোর আরো উন্নয়ন হোক, পাশাপাশি গোটা দেশের অবহেলিত চরাঞ্চলগুলোর মানুষের জীবন-মান উন্নয়ন, শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি ও রাস্তাঘাট নির্মাণ ও কর্মসংস্থান উপযোগী প্রকল্প বাস্তবায়ন করাও জরুরি। সরকার আগামী জাতীয় বাজেটে দ্বীপগুলোর উন্নয়নের পাশাপাশি গোটা দেশের চরাঞ্চলের উন্নয়নে সমধিক বরাদ্দ রাখার ব্যবস্থা নেবে, এটাই প্রত্যাশা করছি।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও সমাজসেবক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads