• মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ৩০ আশ্বিন ১৪২৬
ads
শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিশুদ্ধি প্রয়োজন

নারী অধিকার প্রশ্নে বিশ্বব্যাপী যে আলোড়ন ও আন্দোলন চলছে

আর্ট : রাকিব

মতামত

নারী নির্যাতন

শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিশুদ্ধি প্রয়োজন

  • প্রকাশিত ০১ জুন ২০১৮

মানবাধিকারকর্মী ও ব্রিটিশ রাজবধূ মেগান মার্কেল বলেছেন, বিশ্বের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। সুতরাং তাদের কথা সমাজের সর্বোচ্চ পর্যায়ের লোকদের কাছে পৌঁছাবে না, সেটা হতে পারে না। নারী অধিকার প্রশ্নে বিশ্বব্যাপী যে আলোড়ন ও আন্দোলন চলছে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে মেগানের কথাটি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে, রাস্তায় বা যানবাহনে নানা ধরনের হয়রানি, শ্লীলতাহানি ও নির্যাতনের শিকার হওয়া ভিকটিমের পাশে দাঁড়িয়ে কিছু মানুষকে প্রতিবাদ করতে দেখা গেলেও অধিক সংখ্যক মানুষ কিন্তু নীরব।  প্রতিবাদ হলেও এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ হচ্ছে না। নারীর প্রতি এমন অসদাচরণ বারবার ঘটছে, তবু ভিকটিমের বেদনা-আর্তি আমাদের মানসিকতাকে প্রভাবিত করছে না। এক্ষেত্রে আইনও যথাযথ কাজ করছে বলে মনে হয় না। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্যমতে, ২০০২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা জেলার পাঁচটি ট্রাইব্যুনালে ৭ হাজার ৮৫৪টি ধর্ষণ মামলা হয়েছিল। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ২ হাজার ২৭৭টি। সাজা হয়েছে ১১০টি মামলায়। অর্থাৎ তিন শতাংশের কিছু কম। আর ৯৭ শতাংশ মামলায় আসামি ছাড়া পেয়েছে। ৯৭ শতাংশ মামলার মধ্যে ৪১ শতাংশের আসামি বিচার শুরুর আগেই অব্যাহতি পেয়েছে। ৫৫ শতাংশ মামলায় সাক্ষ্য-শুনানি শেষে আসামিরা ছাড়া পেয়েছে। বিচার হওয়া তিন শতাংশ মামলায় সাজা হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৪৫ ভাগ আসামির। উপরোক্ত হিসাবের আলোকে এটা প্রমাণিত যে, আমাদের দেশের আইন ধর্ষণ প্রতিরোধে যথেষ্ট নয়। যদি বলা হয় আইনি ব্যবস্থা যুগোপযোগী করলে ধর্ষণ প্রতিরোধ সম্ভব, তাহলে সেক্ষেত্রে দ্বিমত অধিক জোরালো হয়। কারণ বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ নারী কোনো না কোনোভাবে নির্যাতন বা যৌন হয়রানির শিকার। নারী নির্যাতনের ঘটনা সংখ্যার দিক থেকে ইউরোপের দেশগুলোতেই বেশি, যদিও তাদের দেশের আইন আমাদের দেশের চাইতে অধিক শক্ত ও যুগোপযোগী।

২.

এখন প্রশ্ন হতে পারে, কীভাবে নারী নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব।  সরাসরি এর কোনো উত্তর দেওয়া সহজ নয়। যেভাবে লাগামহীন নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে, তা আমাদের চূড়ান্ত সামাজিক অবক্ষয়ের প্রমাণ। এ অবক্ষয় শুধু আইন প্রয়োগ করে বন্ধ করা সম্ভব নয়। কারণ আইনি শাসনের মাধ্যমে মানুষকে সবসময় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। আবার আইনের প্রয়োগ যথাযথ না হলে অপরাধী আরো বেপরোয়া হয়ে যায়। মানুষ যখন অপরাধ করে, তখন তার মনে আইনের ভয় খুব অল্পই থাকে। অন্যদিকে কম-বেশি সব দেশেই প্রভাবশালীরা আইনকে ক্ষমতাবলে প্রভাবিত করে। তাই এখানে আইন অনেকটাই হাতবাঁধা। আর আইনের মাধ্যমে সবসময় সময়োপযোগী কাজ করা সম্ভব হয় না। সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে অনেক অপরাধীই পার পেয়ে যায়। বিশেষ করে যাদের ক্ষমতা আছে, তারা সাক্ষ্য-প্রমাণ গায়েব করে দিতে পারে। অনেকে ভয়ে সাক্ষ্য দিতে চান না। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজও অনেক সময় ক্ষমতা বা অর্থের জোরে হারিয়ে যায়। তখন ঘটনা সত্য হলেও আইন কিছুই করতে পারে না। তবে যুগোপযোগী করে আইন প্রণয়ন করতে হবে এবং আইনি সমতা বজায় রেখে বৈষম্যহীনভাবে তা প্রয়োগ করতে না পারলে অবক্ষয় আরো প্রকট আকার ধারণ করবে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আইনকে শেষ ধাপে রাখা উচিত বলে মনে করি। শেষ চিকিৎসা হিসেবে আইন আশ্রয়স্থল হতে পারে। নারী নির্যাতন বন্ধ করতে হলে আগে আমাদের সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষা ও সংস্কৃতি হতে পারে প্রধান হাতিয়ার।

৩.

শিক্ষা একজন মানুষের ব্যবহার, রুচিবোধ, আচার-আচরণ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। শিক্ষা বলতে প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডির মধ্যে সিলেবাসসর্বস্ব কিছু বই পড়া বোঝায় না। কারণ সাক্ষরতা আর শিক্ষা দুটি ভিন্ন বিষয়। শিক্ষা মানুষের ভেতরে সুপ্ত থাকা বিবেককে জাগিয়ে দেয়। মানুষ আবেগ থেকে মুক্ত হয়ে বিবেকের শক্তিতে পরিচালিত হয়। তখন সে ব্যক্তির কথায়, আচরণে অন্য কেউ আঘাত পায় না। আর এটা তখনই সম্ভব যখন শিক্ষায় নৈতিকতার সংশ্লেষ ঘটে। তাই শিক্ষা শুধু জীবিকার জন্য নয়, শিক্ষা দেশপ্রেম, নৈতিকতার জাগরণ ও লালন, সত্য সুন্দর আদর্শ ধারণ করে মানবতাবাদী হয়ে উঠতে সহায়তা করে। এক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যেমন দায়িত্ব, তার চেয়ে বেশি দায়িত্ব পরিবারের। কারণ একটি শিশু অনৈতিক চরিত্র নিয়ে জন্মায় না। সে যদি জন্মের পর নৈতিকতা ছাড়া অন্য কিছু স্পর্শ করার সুযোগ না পায়, তাহলে অনৈতিক কর্ম সে শিশুর দ্বারা সম্ভব নয়। তাই প্রত্যেক পরিবারকে সচেতন হতে হবে সন্তানের ব্যাপারে, যেন ভবিষ্যতে তারা সমাজে উৎপীড়ক না হয়, নারীকে সম্মান করতে শেখে। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পরিবার থেকে পাওয়া শিক্ষার বিকাশ ঘটানো। তবেই আমাদের সমাজ থেকে শুধু নারী নির্যাতন নয়, সব ধরনের অপকর্ম উঠে যাবে।

সমাজের মানুষের পরিশীলিত রুচিবোধ, আচার-আচরণ ও কর্মই হলো সংস্কৃতি। যখন সমাজের মানুষের রুচিবোধ, আচার-আচরণ ও কর্ম অবক্ষয়কবলিত হয়, তখন সংস্কৃতিও অবক্ষয়ের কবলে পড়ে। এভাবেও বলা যায়, সাংস্কৃতিক অবক্ষয় শুরু হলে মানুষের চরিত্রেরও অবক্ষয় শুরু হয়। যখন সামষ্টিক চরিত্রের পতন হয়, তখন সংস্কৃতিরও পতন ঘটে। সে সময় ব্যক্তিচরিত্র আর ঠিক থাকে না। সংস্কৃতি যেমন মানুষের সৃষ্টি, তেমনি সংস্কৃতি মানুষকে নিয়ন্ত্রণও করে। আমরা যখন একটি সামাজিক ও শিক্ষণীয় ফিল্ম দেখি, তখন তা মনে মনে আয়ত্ত করে রাখি; বাস্তব জীবনে কাজে লাগাই। কিন্তু আমরা যদি এমন কিছু দেখি বা পড়ি, যা আসলে শালীনতাবহির্ভূত বা আমাদের সমাজের সুস্থ সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই নয়, তখন আমরা সেটা মনের অজান্তেই ধারণ করে রাখি। ক্রমে এ ধারণ যখন বেশি হয়, তখন আমরা সেদিকে প্রভাবিত হই আর সেটা বাস্তব জীবনে কামনা করি। বিপত্তিটা তখনই ঘটে। তাই আমাদের সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে আগ্রাসন থেকে বাঁচাতে হবে। তা না হলে ব্যক্তিচরিত্র ও মানস পতনের মাধ্যমে সামাজিক অবক্ষয় চরম আকার ধারণ করবে। আমাদের শিক্ষাকে জাতীয় মানস চেতনার আলোকে সাজাতে এবং সংস্কৃতিকে অবক্ষয় ও আগ্রাসন থেকে মুক্ত রাখতে হবে।

৪.

মানুষ ভুল করবেই। সমাজে যখন শিক্ষা ও সংস্কৃতি মানবিক ও নৈতিক মানস গঠনে ভূমিকা রাখবে, তখন প্রজন্ম পরম্পরায় সমাজ থেকে অবক্ষয়ের রেখা বিলুপ্ত হবে। অপরাধের মাত্রাও কমে আসবে। আর মানুষ বিবেকতাড়িত হয়ে কাজ করলে অপরাধের সম্ভাবনা নিতান্তই কম। আইন সবসময় অপরাধ দমনে যথেষ্ট নয়। আইনের কিছু দুর্বলতা প্রথমেই উল্লেখ করেছি। সবসময় শাসনের মাধ্যমে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; কারণ মানুষ জন্মগতভাবেই স্বাধীন। সুতরাং সে স্বাধীনতার শক্তিকে নৈতিক পথে পরিচালিত করলে সমাজে অনৈতিকতা বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারবে না। সে সময় নারীদের কথা সমাজের সর্বোচ্চ পর্যায়ের মানুষের কানে পৌঁছাবে।

জি. কে. সাদিক

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

sadikiu099@gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads