• সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৮

মাদকাসক্তি ও বাংলাদেশ

মাদক যুবসমাজের জীবনীশক্তি কেড়ে নিচ্ছে

আর্ট : রাকিব

মতামত

মাদকাসক্তি ও বাংলাদেশ

  • প্রকাশিত ১০ জুলাই ২০১৮

মাদকাসক্তি একটি সামাজিক ব্যাধি। বর্তমান সময়ের এক জটিল ও বহুমাত্রিক সমস্যা। এটি বর্তমানে সারা বিশ্বে সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। মাদকাসক্তিতে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ। বিশেষ করে, যুবসমাজের একটি অংশ মাদকের নীল দংশনে আজ বিপথগামী ও বিপন্ন। বলা যায়, কোথাও কোথাও মরণব্যাধির রূপ ধারণ করেছে এই মাদক সমস্যা। যুবসমাজের সেই অংশটি মাদকের ছোবলে কর্মক্ষমতা হারিয়ে বিপথগামী হয়েছে। সৃষ্টি করছে নানা ধরনের সামাজিক ও পারিবারিক অনাচার। মাদকের ছোবলে আজ দিশাহারা অনেক দেশের সমাজ, পরিবার ও অভিভাবকরা। বাংলাদেশের ৬৫ লাখ মানুষ আজ এ সমস্যায় বিপর্যস্ত। মাদক যুবসমাজের জীবনীশক্তি কেড়ে নিচ্ছে। শারীরিক শক্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র ও মানসিক অবস্থাকে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে। ফলে দেশে সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। মানুষ কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। জাতীয় উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ব্যাধি সমাজ থেকে নির্মূল করা এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশ কোনো মাদক উৎপাদন ও রফতানি করে না। কোনো মাদক আমদানিও করে না। অবৈধভাবে দেশে মাদকের প্রবেশ ঘটছে। গোল্ডেন ক্রিসেন্ট ও গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গলের মধ্যে থাকায় মাদকের অপব্যবহার ও পাচারের জন্য বাংলাদেশ হলো খুব ঝুঁকিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের রুট হিসেবে বাংলাদেশ ব্যবহূত হচ্ছে। এই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে বাংলাদেশ আজ মাদকের ভয়াল থাবায় নিপতিত। মানবধর্ম ও সমাজ ব্যবস্থার দৃষ্টিতে যে কোনো নেশা জাতীয় দ্রব্য উৎপাদন, ক্রয়-বিক্রয় ও সেবন গর্হিত কাজ। তবু একশ্রেণির অর্থলিপ্সু মানুষ মাদক আমদানি ও পাচারের মাধ্যমে প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক হচ্ছে। আর তাদের অর্থপ্রাপ্তির লালসার শিকার হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ, দেশের যুবসমাজের একটি অংশ, দেশের অর্থনীতি। মাদকাসক্তির এই ভয়ানক পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন সারা বিশ্ব। উদ্বিগ্ন বাংলাদেশও। চারদিকে নেশার বস্তু। তাই অভিভাবকরা আতংকিত, উৎকণ্ঠিত। তাদের সন্তানরা না জানি কখন জড়িয়ে পড়ে এ মরণ নেশায়! দেশে মাদকের এ বিস্তার ও ব্যাপকতা একদিনে হয়নি। এর জন্য দায়ী মাদকের প্রতি আমাদের দীর্ঘদিনের অমনোযোগিতা ও অবহেলা। পাশাপাশি রয়েছে মাদকবিরোধী আইনের সঠিক প্রয়োগের ব্যর্থতা, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং পুলিশ ও মাদক নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর কিছু সদস্যের অনৈতিক লাভ আর এ লাভের কারণে দায়িত্ব পালনে শিথিলতা। সূত্রমতে, বাংলাদেশে ব্যবহূত মাদকের বেশিরভাগই আসে বাইরে থেকে, বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে মাদকের অনুপ্রবেশ বন্ধ করা যাবে না। চাহিদা আছে বলেই মাদকের চোরাকারবারিরা দেশে দাপটের সঙ্গে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত অনেক পরিবারের ছেলেমেয়ে হরদম মাদক গ্রহণ করে চলেছে। মাদক নিরোধে পারিবারিক উদ্যোগের বদলে রয়েছে বিলাসিতার নামে ঔদাসীন্য। এসব পরিবারের যুবকরা প্রথমদিকে হালকা মাদক— বিয়ার, সিসা গ্রহণ করতে করতে একসময় আরো ভারী নেশায় আসক্ত হয়। এরপর খোঁজে লেটেস্ট ব্র্যান্ডের আর কী আছে। ধীরে ধীরে বিলাসিতার এমন পরিণতিই একসময় ব্যবহারকারীকে চরম আসক্তির দিকে নিয়ে যায়। দেশের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের এই শ্রেণির মাদক ব্যবহারকারীরাই ইয়াবা ট্যাবলেটের গ্রাহক হয়ে পাড়ায় মহল্লায় এর বিস্তৃতি ঘটিয়েছে। আর মাদক ব্যবসায়ী নব্য ধনী বা রাতারাতি ধনী হওয়ার আশায় কেউ কেউ নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে সবাইকে ম্যানেজ করে মহল্লায় মহল্লায় শুরু করে মাদকের এই কারবার, যা এখন নিয়ন্ত্রণহীন। হাতের নাগালেই যেখানে মাদকের উৎস, সেখানে এর নিয়ন্ত্রণ অতটা সহজ কাজ নয়। রয়েছে আইন প্রয়োগের দুর্বলতাও। হাতেনাতে মাদকসহ ধরা না গেলে কাউকে গ্রেফতার করা যায় না। কার্যকরভাবে মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে হলে এই দুর্বলতাগুলো দূর করা আবশ্যক। আবার সরকার অনুমোদিত বারগুলোতে কারা যান এবং কোন ধরনের হালকা মাদক ব্যবহার করেন, সে বিষয়ে অবশ্যই নিয়মিত তদারকি থাকা দরকার। প্রয়োজনে এসব বার বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে। কারণ এসব বারই হালকা মাদক গ্রহণের মধ্য দিয়ে মাদকাসক্তির প্রাথমিক উৎস। মাদকের সহজলভ্যতাই মরণব্যাধির বিস্তৃতির প্রধান কারণ। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, পরিবার, সমাজসহ সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন হয়ে মাদকবিরোধী ভূমিকায় এগিয়ে আসতে হবে। দেশে মাদকের এমন বিস্তৃতি নিয়ে কেউ কেউ বলে থাকেন এর পেছনে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রও থাকতে পারে। একটি দেশের যুবসমাজকে নিষ্কর্মা বা ধ্বংস করে দিতে পারলে রাষ্ট্রটিই অচল হয়ে পড়বে। স্বাধীনতার আগে ও পরে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র রয়েছে নানা ধরনের। আজ বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশ করেছে। এই সাফল্যে একটি গোষ্ঠী ঈর্ষান্বিত হয়ে বা তাদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতে দেশে মাদক বিস্তৃতিতে নেপথ্যে ভূমিকা রাখছে কি-না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। মাদক ব্যবসার অর্থ দিয়ে দেশে-বিদেশে জঙ্গি কার্যক্রমের খবরও চাউর হয়েছে। দেশের গোয়েন্দাদের কাছ থেকে এমন তথ্য পেয়েই সরকার নড়েচড়ে বসেছে। প্রতিবেশী দু-একটি দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীরাও বাংলাদেশের মাদকের বাজার থেকে মোটা দাগের সুবিধা নিচ্ছে বলে এক সরকারি সতর্কতায় জানা গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ অভিযানে সত্যিই কি মাদক নির্মূল হবে? আমরা জানি, এ ধরনের অভিযান বিশ্বে নতুন নয়। আমেরিকা এই অভিযান শুরু করেছে সত্তরের দশক থেকে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যেখানেই এ ধরনের অভিযান চলেছে সেখানেই সাময়িকভাবে মাদকের প্রভাব কমেছে; এটা শুভ লক্ষণ। পাশাপাশি আবার মাদকের দামও বেড়ে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্থায়ী কোনো সমাধান হয় না। কলম্বিয়ায় ২৬ বছর ধরে এই অভিযান চলছে। সেখানে এ পর্যন্ত ৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। অথচ কোকেনের চাষ কমেনি, বরং বেড়েছে। সে দেশের প্রায় পাঁচ বিলিয়ন হেক্টর জমি কোকেন সম্রাটরা দখল করে রেখেছে। আফগানিস্তানে আমেরিকার ড্রোন উপেক্ষা করেও কোকেনের চাষ বেড়েছে। ২০০৮ সালে যেখানে ছিল মাত্র ২০০ টন, বর্তমানে সেখানে বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ১০ হাজার টন। মাদকের এই প্রভাব যুবসমাজকে অজগরের মতো গিলে ফেলে। যে একবার মাদকাসক্ত হয়, সেখান থেকে বেরিয়ে আসা তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। মাদকের লোভ দেখিয়ে মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে দিয়ে যেকোনো অন্যায় কাজ করানো সম্ভব। মাদক না পেলে তারা পাগলের মতো হয়ে যায়, হিংস্র হয়, এমনকি আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ আমরা ঐশীর কথা স্মরণ করতে পারি। মাদকাসক্ত ঐশী নিজ হাতে তার বাবা-মাকে হত্যা করেছে। তাই বর্তমান শেখ হাসিনার সরকার মাদকের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার রোধে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। সেখানে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে সারা দেশে মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত আছে। বিদ্যমান আইনের দুর্বলতা সংশোধনের কাজও চলমান রয়েছে। পাশাপাশি মাদকবিরোধী জনসচেতনতা সৃষ্টিতে দেশব্যাপী প্রচার অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা এ লক্ষ্যে কাজ করছে। তাদের এ প্রচার কাজ আরো সুনির্দিষ্ট এবং সবিস্তারে হওয়া দরকার। মাদককে ‘না’ বলুন— এ কথা প্রচার যথেষ্ট নয়। মাদকে কী কী ক্ষতি হয়, তা প্রচার করতে হবে। সাত বছরের শিশু থেকে কিশোর যুবক সবাইকে শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় আনতে হবে। মাদককে ‘না’ বলার শক্তি তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। কেউ যদি মাদকাসক্ত হয়, তাকে কী চিকিৎসা নিতে হবে, কোথায় যেতে হবে— এ বিষয়ে সঠিক পথ দেখাতে হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে মাদকাসক্ত ব্যক্তির পরিবারকে সহযোগিতা করতে হবে। আমাদের একটা কথা মনে রাখতে হবে, পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগী শুধু নড়াচড়ার ক্ষমতা হারায়। কিন্তু মাদকে আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি তো হচ্ছেই, সে একসময় সামাজিক বোঝাও হয়ে পড়ছে। তাই মাদক প্রতিরোধে রাষ্ট্রকে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মাদকের ক্ষতিকর বিষয় শিক্ষা কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। মাদকের ব্যবহার রোধে ব্যাপক প্রচার কার্যক্রম চালানো জরুরি। সব মিডিয়াকে মাদক গ্রহণের কুফল সম্পর্কে প্রচার করতে হবে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি কীভাবে এ পথ থেকে সরে আসতে পারে, সে বিষয়ে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোর প্রচার চালানো উচিত। কীভাবে সুস্থ জীবন-যাপন করা যায়— চিকিৎসকদের এ বিষয়ে মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে বোঝাতে হবে। বাবা-মাকে সন্তানের প্রতি বেশি যত্নবান হতে হবে এবং তাদের ভালোবাসতে হবে। মাদকাসক্তকে ধর্মীয় পু্স্তকাদি পড়তে দেওয়া বাঞ্ছনীয়। কারণ ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে পরিশুদ্ধ করে তুলতে সাহায্য করে। পুলিশের উচিত আরো বেশি সক্রিয় হওয়া— মাদকাসক্ত ব্যক্তি নয়, মাদক ব্যবসায়ীদের প্রতি তাদের কঠোর নজরদারি আরোপ করা প্রয়োজন। দেশ থেকে মাদক ব্যবসায়ীদের মূল উৎপাটন করতে হবে। শুধু ভয় দেখিয়ে মাদকের ব্যবহার বন্ধ করা যাবে না। মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে অপরাধী আখ্যায়িত করে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। তাদের রোগী হিসেবে দেখতে হবে। ভালোবাসা, শিক্ষা, সম্মান ও পথনির্দেশনা দিয়ে সমাজে তাদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। তাই আসুন, আমরা মাদককে ‘না’ বলি। মাদকের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করি। আমরা সবাই এই ‘মাদক ব্যাধি’র মরণ আঘাত থেকে বাঁচতে ঐক্যবদ্ধ হই। যুবসমাজকে বাঁচাই, দেশকে বাঁচাই। মাদকের এই ভয়াবহতা নির্মূলে সবাই আন্তরিকভাবে কাজ করি।

সৈয়দ আবুল হোসেন

রাজনতিবিদ, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads