• সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
আপাত

বাজার অর্থনীতি সচল না থাকলে কারো চাকরি বা রোজগারের ব্যবস্থা থাকবে না

আর্ট : রাকিব

মতামত

আপাত

  • আবদুল মতিন খান
  • প্রকাশিত ১২ জুলাই ২০১৮

চোখ থাকে ভবিষ্যতের দিকে। ভবিষ্যৎ মুহূর্তে মুহূর্তে বর্তমান হয়। আবার নিমিষে হয়ে যায় অতীত। এভাবে মানুষ শিশু থেকে হয় বৃদ্ধ। বার্ধক্যের আগে সময়ের চলমানতা বা ধাবমানতা কারো চোখে পড়ে না। টিভিতে সংবাদ শুরুর আগে সেকেন্ডের সংখ্যার ঘূর্ণন দেখানো হয়। অতি দ্রুত সেটি ৬০ বার ঘুরে শেষ মিনিটটি সমাপ্ত হলে নতুন ঘণ্টা হয় আরম্ভ। তখন সংবাদ পাঠক তাকে দেওয়া খবরগুলো পড়তে থাকেন। পড়তে পড়তে একসময় সংবাদপাঠ হয় শেষ। শুরু হয় নতুন বা পরের অনুষ্ঠানের আগের লম্বা নানা পদের বিজ্ঞাপন। দর্শক বিরক্ত হন, কিন্তু বোঝেন না লম্বা ওই একঘেয়ে স্নায়ু-উৎপীড়ক বিজ্ঞাপন থাকে বলেই আসল প্রোগ্রামটি তিনি দেখতে পারেন। বিজ্ঞাপন হলো বাজার অর্থনীতির প্রাণভোমরা। বাজার অর্থনীতি সচল না থাকলে কারো চাকরি বা রোজগারের ব্যবস্থা থাকবে না। মানুষ থাকবে না খেয়ে। তার ছেলেমেয়ের লেখাপড়া হবে না। আজকের পৃথিবীর সব থেকে বড় বাজার অর্থনীতির দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র। সে দেশের বিজ্ঞান-শিল্প বিশ্বের বৃহত্তম। তা সত্ত্বেও, হালের সর্বশেষ সংবাদ থেকে প্রকাশ, সে দেশের চার কোটি নর-নারী চরম দরিদ্র- যার অর্ধেক বা দু’কোটি মানবেতর জীবনযাপন করে। তাদের খাবার নেই, শোবার ঘর নেই, গোসল নেই। রোগে নেই চিকিৎসা। বাংলাদেশের মতো দেশে উপজেলা পর্যন্ত কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। দুর্নীতির দরুন সেখানে ওষুধ বেহাত হয়ে যায় বলে রোগীরা ভালো ওষুধ থেকে হয় বঞ্চিত। তবু চিকিৎসা তারা পায় বিনামূল্যে। যুক্তরাষ্ট্রের অভাগাদের সে রকম কপাল নয়। তারা বিনাচিকিৎসায় ফৌত হয়ে যায়। আগের প্রেসিডেন্ট অশ্বেতাঙ্গ বারাক ওবামা ছিলেন স্বশিক্ষিত উন্নত দৃষ্টিভঙ্গির একজন নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিবিদ। যুক্তরাষ্ট্রে ইউরোপ থেকে গিয়ে আগ্নেয়াস্ত্রের দ্বারা ভূমি বেদখলকারী বেপরোয়া প্রকৃতির বলা যায় জলদস্যুরা সেখানকার স্থানীয় অধিবাসী বা আদিবাসীদের আক্ষরিক অর্থে কচুকাটা করে মহাদেশটির দখল নেয়। দখলের পর দেশটিতে কৃষি ও শিল্পে সমৃদ্ধ করতে তারা আফ্রিকা থেকে জোর করে ধরে আনা স্বাধীন নারী-পুরুষদের দাস বানিয়ে তাদের শ্রম বিনামূল্যে কাজে লাগাতে থাকে। আফ্রিকান শ্রমেই গড়ে ওঠে আজকের যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র দখলকারী ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রের আদিবাসীদের নামকরণ করে রেড ইন্ডিয়ান। বর্তমানে অল্পসংখ্যক যুক্তরাষ্ট্রের আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ান উত্তরের একটি রাজ্যে বসবাস করে। বিদেশাগত শ্বেতাঙ্গ অভিবাসীদের অবস্থা যথেষ্ট উন্নত হলেও কৃষ্ণাঙ্গদের অবস্থা প্রায় আগের মতোই আছে। কৃষ্ণাঙ্গরা আগে ছিল ক্রীতদাস। ঊনবিংশ শতকে একজন মহৎ হূদয়ের অধিকারী আব্রাহাম লিঙ্কন হন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। তিনি কৃষ্ণাঙ্গ তথাকথিত দাসদের মুক্ত করে দেন। তারা শ্বেতাঙ্গদের সমান রাজনৈতিক অধিকার লাভ করেন। তারা স্বাধীন নাগরিক হওয়ার পর লেখাপড়া শিখে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তারা রাজ্যের গভর্নর এবং প্রতিনিধি সভার সদস্য পদেও নির্বাচিত হন। সরকারের উচ্চপদেও প্রবেশ করেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত বর্তমান মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণকায়দের স্বাধীন নাগরিক বলে ঘোষণা করায় প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনকে একজন শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী পাষণ্ড তার কানে পিস্তল ঠেকিয়ে একটি প্রেক্ষাগৃহে হত্যা করে। তিনি সপ্তাহান্তে বিনোদনের জন্য নাটক দেখছিলেন। সেকালে সিনেমা ছিল না। আব্রাহাম লিঙ্কন সেই চিন্তাবিদ, যিনি গণতন্ত্রের সর্বজনগ্রাহ্য ও সহজবোধ্য সংজ্ঞা দেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্র হলো জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য নির্বাচিত সরকার। এ সরকারের ধ্বংস নেই। গণতন্ত্রের এই সরল-সহজ উপস্থাপনা আর দ্বিতীয়টি নেই। লিঙ্কনের দেওয়া গণতন্ত্রের এই রূপ যুক্তরাষ্ট্রে কখনো দেখা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র কুক্ষিগত হয়ে যায় বিত্তবানদের দ্বারা। অতিধনীরা কেবল রাজনীতি করে এবং তারাই রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার চালায়। যুক্তরাষ্ট্রে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রে কেন বিশ্বের সর্বত্র রাজনীতি করতে গেলে প্রচুর পয়সা লাগে। পয়সা ঢালতে হয় চামচা পুষতে। অর্থলোভী চামচা ছাড়া বিশ্বের কোথাও সংসদীয় রাজনীতি সম্ভব নয়।

চামচা পুষতে হয় বলে রাজনীতিবিদদের সরকারি অর্থব্যয়ের সুযোগ রাখতে হয়। অর্থব্যয়ের সময় তারা সরকারের অর্থের একটা মোটা অংশ নিজেদের জন্য রাখেন। রাখার জন্য উন্নয়ন কর্মটি যথাযথ হয় না। বাংলাদেশে উদাহরণস্বরূপ, পাকা সড়ক নির্মাণের অল্প দিনের মধ্যে ভেঙে খোয়া বেরিয়ে পড়ে এবং বৃষ্টির তোড়ে বড় বড় গর্তে যায় ভরে। সরকারের তৈরি স্কুল ভবন ও সরকারি অফিস ভবনের দেয়াল ও ছাদ বছর না ঘুরতেই ফেটে যায়। সেগুলোর রঙ যায় চটে। এসবের সচিত্র বিবরণ প্রতিদিনের সংবাদপত্রে ও টিভিপর্দায় দেখানো হয়। সবাই দেখে এবং দুর্নীতির কথা বলে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। খুব বেশি হলে স্থানীয় নেতা ঢাকা এসে দেনদরবার করে সেগুলো মেরামতের ব্যবস্থা করেন। লোক দেখানো এই মেরামতের কাজেও অনেকের দু’পয়সা হয়।

কাজে ফাঁকি দিয়ে যারা দু’পয়সা করার বুদ্ধি রাখে তারা নিজের গ্রামের বাড়িতে দালান তোলে এবং পরবর্তী ধাপে প্রথমে উপজেলা শহরে ও পরে কিংবা একই সঙ্গে ঢাকা অথবা চট্টগ্রামে ফ্ল্যাট কেনে এবং শপিংমলে কেনে দোকান। কেউ ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায় নেমে পড়ে। ট্রান্সপোর্ট ব্যবসার স্ফীতির কারণে এবং লাভ প্রচুর হওয়ায় এই ব্যবসায়ের দিকে ঝুঁকে পড়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। পাকা দীর্ঘ সড়কের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে এবং বাড়ছে বাস-গাড়ি-ট্রাকের সংখ্যা। বাড়ছে প্রাইভেট কার ও সরকারের বিভিন্ন দফতরের গাড়ির সংখ্যা। এগুলো চালাতে যে ড্রাইভার লাগে তার সংখ্যা সে অনুপাতে বাড়ছে না। ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে গেলে লিখিত পরীক্ষা ও রাস্তায় গাড়ি চালানো শেখার যে যোগ্যতা অর্জন করতে হয় তার ধার না ধেরে বাঁ-হাতি পন্থায় বাসের হেলপার থেকে ড্রাইভার বনে-যাওয়াদের দিয়ে ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায় চালানো হয় বলে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় কয়েক ডজন কর্মক্ষম মানুষ অকালে মারা যান ও জন্মের মতো হন পঙ্গু। যারা মারা যান তাদের অধিকাংশ পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাদের আয়ের ওপর নির্ভর করে পরিবারের ব্যয়। তারা হঠাৎ এভাবে মরলে পরিবারটি পঙ্গু হয়ে যায়। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হলে সড়ক-সংক্রান্ত দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। সেটা যেহেতু আরো বহুদিন সম্ভব নয়, তাই সড়কে মৃত্যুর মিছিলও বন্ধ হবে না।

পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা আপাত দৃষ্টিতে ধনী দেশ হলেও বাজার অর্থনীতির কারণে বাজারের ওঠা-নামা আছে। বেচাবিক্রি যতক্ষণ ভালো থাকে, ততক্ষণ শিল্পকারখানা ঠিকঠাক অর্থাৎ লাভজনকভাবে চলে। চাকরির বাজারও থাকে ভালো। বাজার অর্থনীতির চরিত্র হলো হঠাৎ মন্দা। মন্দা এমন একটি উপসর্গ, যা হঠাৎ দেখা দেয় এবং দ্রুত পড়ে ছড়িয়ে। মন্দা পুঁজিপতিদের সৃষ্টি হলেও তারা এটা দূর করতে অক্ষম। তারা তখন শুধুই হাহুতাশ করে।

মন্দা কাটাবার একমাত্র উপায় হলো বিনিয়োগ। মন্দার কালে কোনো পুঁজিপতি বিনিয়োগে আগ্রহ দেখান না। গত শতকের ৩০-এর দশকের মহামন্দার সময় ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ প্রফেসর কিন্স যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে পরামর্শ দেন বিপুল বিনিয়োগের। তিনি বলেন, সরকার বিনিয়োগ করলে শ্রমজীবীরা অর্থাৎ সাধারণ ক্রেতা বেতন পেয়ে কেনাকাটা শুরু করবে। তারা যত কিনবে তত বন্ধ কল-কারখানা ফের চালু হতে শুরু করবে। যুক্তরাষ্ট্রে তখন মোটরযান শিল্প হাঁটিহাঁটি পা পা অবস্থায় ছিল। যুক্তরাষ্ট্র মহাদেশতুল্য দেশ হওয়ায় হাইওয়ে দ্বারা এক শহর অন্য শহরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রয়োজন ছিল। প্রাইভেট কোনো কোম্পানি হাইওয়ে তৈরিতে আগ্রহী ছিল না। রেলওয়ে থাকলেও তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। পরিবহন ব্যবস্থার এই পৃষ্ঠপটে সড়ক নির্মাণ প্রকল্প সরকার দ্বারা গৃহীত হওয়ায় পুঁজিপতিদের বাধার সম্মুখীন হলো না। মোটর শিল্প মালিকরা বরং এতে প্রকাশ্যে না হলেও মনে মনে খুশি হলেন। মন্দা কাটাতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার হাইওয়ে তৈরির কাজ হাতে নিল। তাতে দেশজুড়ে সাধারণ মানুষ রাস্তা তৈরির কাজ পেল। তাদের বেতনের টাকায় ফের বহু জিনিসের কেনাকাটা শুরু হলো। মোটরযান শিল্পের হলো দ্রুত বিকাশ। শ্রমিকের সঙ্গে পুঁজিপতিরা তাদের বন্ধ কারখানা চালু করে দু’পয়সা পেতে থাকলে সরকার কর্তৃক বিনিয়োগের পাপ তারা দেখেও না দেখার ভান করলেন। যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিপতির চোখে নির্মাণকাজে সরকারের দু’পয়সা ব্যয়ও সমাজতন্ত্র! সমাজতন্ত্র হলো সর্বোচ্চ পাপ। সেই পাপ সজ্ঞানে করে যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিপতিরা তাদের পুঁজিবাদ বা বাজার অর্থনীতি রক্ষা করতে পারল। কিন্সের বুদ্ধিতে মন্দা কেটে যাওয়ায় ব্রিটিশ সরকার কিন্সকে লর্ড উপাধি দিয়ে সম্মানিত করল। কিন্তু কিন্স বেশি দিন বাঁচেননি। মাত্র ৫৬ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তিনি বেঁচে থাকলে পুঁজিবাদ রক্ষার আরো কৌশল হয়তো জানা যেত।

কিন্স কিংবা তার পরের কোনো অর্থনীতিবিদ মন্দা কাটাবার ভিন্ন কোনো কৌশল আজ পর্যন্ত বের করতে না পারায় মন্দার সময় সরকারের বিনিয়োগ এখন পর্যন্ত হয়ে রয়েছে একমাত্র পন্থা। যুক্তরাষ্ট্র সরকার যুদ্ধকে সরকারের বিনিয়োগ হিসেবে উৎকৃষ্টতম ভাবে। যুদ্ধে সরকারের বিস্তর ব্যয় হয়। যুদ্ধে মরে সাধারণ শ্রমজীবীর সন্তান। এ জন্য দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার পৃথিবীর নানা কোনে যুদ্ধজোট তৈরি করেছে। কোথাও কোথাও যুদ্ধেও নেমেছে। তাতে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প সচল থেকেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট বিদেশি অভিবাসীদের ওপর বিশেষ করে পশ্চিম ও দক্ষিণ এশীয় (মুসলিম) অভিবাসীদের ওপর ভীষণ খাপ্পা। তিনি তাদের একত্র করে তাদের ছেলেমেয়েকে বাপ-মা থেকে আলাদা রাখার অমানবিক আদেশ দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, তিনি মহাশূন্যে অস্ত্রনির্মাণ কারখানা তৈরি করবেন। সবই বিশাল অঙ্কের সরকারি ব্যয়। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিদেশ থেকে আসা অভিবাসীর দেশ নয়। অথচ তিনি তার নির্বাচনের আগে তার পূর্বপুরুষের বাসস্থান স্কটল্যান্ডের ভিটেটি দেখে আসেন। তিনি নিজে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হয়েও অন্যদের অর্থাৎ এশীয়দের হতে দিতে চান না। রাজনীতিতে এসবই আপাত উপলব্ধির ক্ষেত্র। এটা বুঝলে বর্ণবাদী সমাজের রাজনীতির অনেক অসঙ্গতি বোঝা হয় সহজ।

লেখক : সাবেক সচিব

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads