• মঙ্গলবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৩ আশ্বিন ১৪২৫
ads
স্থানীয় উন্নয়নে প্রয়োজন নগর সরকার

অধিকাংশ মানুষের সারা দিনের প্রায় ৯৫ ভাগ কাজ থাকে স্থানীয়ভাবে

আর্ট : রাকিব

মতামত

স্থানীয় উন্নয়নে প্রয়োজন নগর সরকার

  • প্রকাশিত ২৯ জুলাই ২০১৮

একজন মানুষ যতই উন্নত চিন্তা কিংবা উন্নত কাজ করুক না কেন, তাকে কোনো না কোনো স্থানীয় এলাকায় বসবাস করতে হয়। তাকে চলাচলের জন্য ফুটপাথ, বেড়ানোর জন্য পার্ক, প্রার্থনার জন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সন্তানদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শপিং করার জন্য মার্কেট ইত্যাদি ব্যবহার করতে হয়। অধিকাংশ মানুষের সারা দিনের প্রায় ৯৫ ভাগ কাজ থাকে স্থানীয়ভাবে। উন্নত বিশ্বে স্থানীয় সরকারগুলো এককভাবে স্থানীয় কাজগুলো করে থাকে বলে সেখানকার নাগরিকরা পরিচ্ছন্ন নগরে বসবাস করেন এবং স্থানীয় সরকার থেকে জনগণ সিভিক সেন্স অর্জন করে থাকেন। এ দেশেও স্থানীয় সরকার আছে এবং স্থানীয় সরকার পরিচালনার জন্য জনপ্রতিনিধিও নির্বাচিত হন। কিন্তু বাস্তবে তারা স্থানীয় কাজ করার চেয়ে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন বেশি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, খুলনা ও রংপুরে মেয়র প্রার্থীদের অতীত কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে এর পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাবে। মূলত স্থানীয় সরকারের কাজ পৃথক ও নির্দিষ্ট না থাকায় সবকিছু ওভারলেপিং অবস্থায় থেকে যায়।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার এবং স্থানীয় সরকারের স্বাধীনতা বা ক্ষমতায়ন সমন্বয়ের ভিত্তিতে হওয়া প্রয়োজন। আর সব ক্ষেত্রে সমন্বয় না থাকলে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কখনোই উন্নত রাষ্ট্র দাবি করতে পারে না। আমাদের নগরকে যত ভাগেই ভাগ করা হোক না কেন, কাজের সমন্বয় না থাকলে কিংবা ‘নগর সরকার’ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না হলে তা কোনো কাজেই আসবে না। উন্নত দেশের নগর এলাকায় ‘নগর সেবা’ বা সিটি সার্ভিস বলতে যা বোঝায়, তার নিয়ন্ত্রক সংস্থা একটিই থাকে। ফলে কাজের সমন্বয় নিয়ে ঝামেলা পোহাতে হয় না। সেসব নগরে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিফোন, পরিবেশ সংরক্ষণ, নগর উন্নয়ন, সড়ক ও জনপথ, জননিরাপত্তা (পুলিশ), স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবহন ও আবাসন ব্যবস্থাসহ সব ধরনের সেবার নিয়ন্ত্রণ থাকে নগর সরকারের হাতে।

বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা শেষে রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন আগামীকাল। নির্বাচনী প্রচারণায় প্রার্থীরা তাদের ইশতেহারে বিভিন্ন সেবার কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু নির্বাচিত হলে কতটুকু দিতে পারবেন বা দেবেন অথবা তাদের হাতে কতটুকুই-বা ক্ষমতা আছে তা ভেবে দেখা দরকার। সিটির নাগরিকরা নাগরিক সুবিধা পেতে চান কিন্তু তারা কর দিতে চান না। এসব প্রার্থীর মুখে কখনোই জনগণের উদ্দেশে বলতে শোনা যায় না, আপনারা সিটির নাগরিক, আপনাদের কর দিতে হবে, কর না দিলে আপনাদের সেবা দেব কীভাবে? বাস্তবতা হচ্ছে, নাগরিকদের কর দেওয়ার অভ্যাস করতে হবে এবং কর আদায়কারী কর্তৃপক্ষকে আরো তৎপর হতে হবে। কারণ সিটি করপোরেশন নিজের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে না পারলে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। সিটি করপোরেশন হওয়া উচিত স্বশাসিত এবং স্বাবলম্বী। এসব প্রতিষ্ঠান ভুগছে অর্থের অনটনে। প্রতিটি সিটি করপোরেশনের হোল্ডিং ট্যাক্স যা ওঠে, শুনেছি তার প্রায় সবটাই চলে যায় করপোরেশনের কর্মচারীদের বেতন দিতে।

করপোরেশন চলছে কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক অনুদানে। কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থায়নে চললে স্বশাসনের দাবি করা হয় কেন? অনেক প্রার্থী সিটির সুশাসনের কথা বললেও স্পষ্ট করে বলেননি সুশাসন বলতে কী বোঝায় এবং সেই সুশাসন কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন, খরা, বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, শস্যহানি, নদীভাঙনে নিঃস্ব-অসহায় ও সহায়-সম্বলহীন মানুষ জীবিকার তাগিদে কোনোভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত নগরের বস্তি, ফুটপাথ, রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিচ্ছে। আবার উন্নত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে নগরগুলোয় বাড়ছে সচ্ছল শিক্ষিত লোকের ভিড়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের নগরগুলোয় সৃষ্টি হচ্ছে যানজট, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য অব্যবস্থাপনা, অপুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তার ঘাটতি। রয়েছে পরিবেশদূষণ, মাদকের বিস্তার, সুপেয় পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, আইন-শৃঙ্খলার অবনতিসহ নানা সমস্যা।

১৯৯৭ সালে একজন স্থানীয় সরকার গবেষক আবু তালেব প্রথম নগর সরকার প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। সেই সঙ্গে সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক লোকাল গভর্নেন্স (সিডিএলজি) বহুদিন ধরে নগর সরকার ও নগরীয় কৃষির পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য প্রচারণা করে আসছে। তারা পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন পদ্ধতি দুটি বাতিল করে দেশের সব নগরে একরকম নগর সরকার পদ্ধতি চালু করার কথা বলছে। আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য, জলবায়ু, জনসংখ্যা, পরিবেশ, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘নগর সরকার’ গঠন করতে হবে। নগর সরকারের মেয়াদ হবে চার বছর। বিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিটি নগরে একটি নগর সংসদ থাকবে। নগর সংসদের কাজ হবে অনেকটা জাতীয় সংসদের মতো। এখানে নগরের উন্নয়ন, প্রশাসন, সমস্যা, সম্ভাবনা, পরিবেশ প্রভৃতি বিষয়ক আলোচনা, বিতর্ক, সমাধানমূলক সিদ্ধান্ত, বাজেট প্রণয়ন, বিধি-প্রবিধি প্রণয়ন করা হবে। নগর সংসদে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো নির্দিষ্ট বিভাগ বাস্তবায়ন করবে। প্রত্যেক ওয়ার্ড থেকে নগরবাসীর সরাসরি ভোটে একজন পুরুষ ও একজন মহিলা নগর সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন। নগর সংসদের সভাপতি নগর সংসদ সদস্যের ভোটে তাদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হবেন। তার কাজ হবে অনেকটা জাতীয় সংসদের স্পিকারের মতো। বর্তমানে কাউন্সিলর আছেন কিন্তু কাউন্সিল নেই। মেয়র নগরের ভোটারদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন। নগরের ছোটখাটো অপরাধের বিচারের জন্য একটি বিচার বিভাগ থাকবে। এ ছাড়া নগরের নির্বাচিত ও অনির্বাচিত কর্মকর্তা এবং তাদের দফতরের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তদন্ত সাপেক্ষে মীমাংসা ও নিষ্পত্তি করবেন ন্যায়পাল। সেজন্য নগর ন্যায়পালের পদ ও দফতর স্থাপন করতে হবে। নগর ন্যায়পাল নগরবাসীদের সরাসরি ভোটে কিংবা নগর সংসদ সদস্যের ভোটে নির্বাচিত হবেন।

গত ১৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাবনার এক জনসভায় বলেছেন, আওয়ামী লীগ আবার নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় গেলে গ্রামের প্রতিটি জনগোষ্ঠীকে শহরের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হবে। প্রতিটি গ্রামকে পর্যায়ক্রমে শহরে, নগরে রূপান্তর করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর এ ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সিডিএলজির রূপরেখার কাছেই ফিরে আসতে হবে। এ জন্য দ্রুত নগরায়ণের বাস্তবতাকে সামনে রেখে একটি সঠিক ও যুগোপযোগী মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে বিদ্যমান পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট, জলাবদ্ধতা ও আবর্জনার দুর্গন্ধমুক্ত সবুজ নগর গড়ে তোলা সম্ভব হবে না।

পরিশেষে বলতে চাই, বিষয়টি বাংলাদেশের প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ অধ্যুষিত ৩১৫টি নগরীয় স্থানীয় ইউনিট ও গোটা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পর্কযুক্ত। তাই নগর, নগর সরকার, নগর সরকারের রূপরেখা, ২১ দফা সুপারিশ, নগরীয় বাংলাদেশের স্তরবিন্যাসকরণ, নগরীয় কৃষি ও গোটা স্থানীয় সরকার বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে অবিলম্বে বিশেষ নজর দিতে হবে। এক্ষেত্রে সিডিএলজিও সার্বিক সহায়তা দিতে পারে। সুতরাং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি কামনা করছি।

শফিকুল ইসলাম খোকন

সদস্য, সিডিএলজি

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads