• বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫
ads
বহুবিবাহ ও আইনগত প্রতিকার

এক স্ত্রী থাকার পর আরেকটি বিয়ে করাকে বহুবিবাহ বলে

আর্ট : রাকিব

মতামত

বহুবিবাহ ও আইনগত প্রতিকার

  • প্রকাশিত ৩০ জুলাই ২০১৮

সিঁথির (ছদ্মনাম) জীবনে এমনটিই ঘটেছিল। একুশ বছরের সংসার জীবন তছনছ করে তার স্বামী আরো একটি বিয়ে করেন। বিয়ের আগে সিঁথির স্বামী প্রায় দুই বছর অন্য এক মহিলার সঙ্গে পরকীয়ায় লিপ্ত ছিলেন। স্বামীকে ওই পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে সিঁথির চেষ্টার কমতি ছিল না, কিন্তু লাভ হয়নি। তিনি ওই মহিলাকে বিয়ে করে সুখেই আছেন। সিঁথির দুই মেয়ে। টাকার অভাবে মেয়ে কণা ও কথার পড়াশোনা বন্ধ। শেষপর্যন্ত সিঁথি তার দুই মেয়ে নিয়ে বাবার অভাবের সংসারে এসে ওঠেন। সেখানে কোনো রকমে দিন পার করছেন। কয়েক দিন আগে সিঁথি আমার চেম্বারে এসেছিলেন আইনি পরামর্শের জন্য। 

এক স্ত্রী থাকার পর আরেকটি বিয়ে করাকে বহুবিবাহ বলে। ইসলামী আইনে বলা হয়েছে, কেউ যখন বস্তুগত দিক দিয়ে এবং স্নেহ ভালোবাসার দিক দিয়ে প্রত্যেক স্ত্রীর সঙ্গে সমান আচরণ করতে পারবেন কেবল তখনই তিনি চারটি পর্যন্ত বিবাহ করতে পারবেন। তবে বাস্তবে এটা কখনো সম্ভব নয়। কারণ যে স্বামী নিজের স্ত্রীকে ভালোবাসেন তার দ্বিতীয় বিবাহ করার ইচ্ছেই হবে না। পবিত্র কোরআন শরীফে বহুবিবাহকে অনুমতি দেওয়ার চেয়ে একটি বিয়ে করাই উত্তম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আমাদের সমাজে একাধিক স্ত্রী গ্রহণের আইনগত অধিকার স্বামীদের থাকলেও নারীর ক্ষেত্রে এ ধরনের বিধান নেই। এখানে উল্লেখ্য যে, একই সঙ্গে স্বামী চারজনের অধিক স্ত্রী গ্রহণ করতে পারবেন না।

বহুবিবাহের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা

ইসলামে বহুবিবাহের অনুমতি প্রদান করা হয়েছে ইসলাম আবির্ভাবের প্রথম দিকে একটি ভিন্ন আর্থ-সামাজিক ও অস্থিতিশীল রাজনৈতিক বাস্তবতায়। মূলত বিধবা, এতিমদের নিরাপত্তা ও রক্ষার জন্য ইসলামে এ ধরনের প্রতিকারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। সে সময়কার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ওহুদের যুদ্ধে বহু মুসলিম পুরুষ শাহাদাত বরণ করেন। ফলে স্বাভাবিকভাবে অভিভাবক ও স্বামীহীন নারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতা বোধ করেন। এসব নারীর নিরাপত্তার নিশ্চয়তার জন্য বহুবিবাহ প্রথা চালু হয়।

কোরআন শরিফের বিধান

পবিত্র কোরআন শরিফের সুরা নিসায় পরিষ্কার উল্লেখ রয়েছে, ‘যদি তুমি মনে কর যে, এতিমদের প্রতি তুমি সুবিচার করতে পারবে, তবে তুমি এ ধরনের নারীকে বিয়ে করতে পার- যাকে ভালো লাগে তাদের মধ্য থেকে দুই, তিন অথবা চার। কিন্তু যদি তুমি আশঙ্কা কর যে, এদের মধ্যে তুমি সুবিচার করতে পারবে না, তবে তাদের মধ্য থেকে অথবা যারা তোমার আশ্রয়ে রয়েছে তাদের মধ্য থেকে একজনকেই বিয়ে কর। অন্যায় এড়ানোর এটাই সহজ ও উত্তম ব্যবস্থা।’

এখানে সুবিচারের প্রশ্নে শুধু স্বামীর অর্থনৈতিক সচ্ছলতার সমান ব্যবহারের কথা বলা হয়নি, বরং স্নেহ-মায়া, ভালোবাসা, আদর-সোহাগের বিষয়ে পরিষ্কার উল্লেখ রয়েছে। একাধিক স্ত্রী গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বামীরা কি আদৌ আদর-সোহাগের মতো সূক্ষ্ম অনুভূতির ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার করতে পারে? মূলত এটা অসম্ভব। তাই বলা যায়, শর্ত সাপেক্ষে অনুমোদন সাপেক্ষে বহুবিবাহকে কঠিন নিষেধাজ্ঞাতে পরিণত করা হয়েছে।

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ধারা ৬-এর মতে, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সালিশি পরিষদের নিকট হতে অনুমতি না নিলে বিয়ে নিবন্ধন হবে না। অনুমতির জন্য ২৫ টাকা ফি দিয়ে সাদা কাগজে চেয়ারম্যানের নিকট আবেদন করতে হবে এবং আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিয়ের অনুমতি প্রদানে যেসব বিষয়ের প্রতি বিবেচনা করা হবে তার মধ্যে অন্যতম হলো— ১. বর্তমান স্ত্রী বন্ধ্যত্বে আক্রান্ত, ২. দৈহিকভাবে দুর্বল, ৩. দাম্পত্য জীবন সম্পর্কিত শারীরিক অযোগ্যতা এবং ৪. দাম্পত্য অধিকার পুনর্বহালের জন্য কোনো উন্মত্ততা।

স্ত্রীর অধিকার লঙ্ঘনে আইনি প্রতিকার

কোনো পুরুষ যদি সালিশি পরিষদের অনুমতি বিনা দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে তিনি ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬(৫) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবেন। তিনি অবিলম্বে তার বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের আশু বা বিলম্বিত দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করবেন এবং মোহরানার টাকা পরিশোধ করা না হলে বকেয়া ভূমি রাজস্ব আদায়ের মতো আদায় করা হবে। এ ছাড়াও অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে এক বৎসর পর্যন্ত জেল ও ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড কিংবা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। পাশাপাশি দণ্ডবিধি আইন ১৮৬০-এর ৪৯৪-এর বিধান মতে, স্বামী যদি স্ত্রীর জীবনকালে পুনরায় বিয়ে করেন, তবে তিনি সাত বৎসর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন এবং একই সঙ্গে অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হতে পারেন। তবে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা উচিত, বহুবিয়ের মামলায় বাদীকে সফল হতে হলে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে, দ্বিতীয় বিয়ের সময় প্রথম বৈধ বিয়ের অস্তিত্ব ছিল।

বহুবিবাহের আইনগত দিক

পরিতাপের বিষয় এই যে, বেশিরভাগ মানুষ কেউ বুঝে অথবা কেউ না বুঝেই সুরা নিসার অপব্যাখ্যা প্রদান করে। ফলে সমাজে কোনো কোনো পুরুষ যথেচ্ছভাবে একাধিক বিয়ের মধ্য দিয়ে পারিবারিক জীবনে মহা জটিলতার সৃষ্টি করে, যার ফলে উদ্বেগজনক প্রক্রিয়ায় বৃদ্ধি পাচ্ছে স্বামী পরিত্যক্ত নারীর সংখ্যা। এ জাতীয় পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের জন্য ১৯৬১ সালে আইন প্রবর্তন করা হয়, যা মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ নামে পরিচিত। এ আইন অনুযায়ী পূর্বাহ্নে সালিশি পরিষদের নিকট হতে লিখিত অনুমতি না নিয়ে কোনো পুরুষ একটি বিয়ে বলবৎ থাকাকালে আর একটি বিবাহ করতে পারবে না।

১. বিয়ের অনুমতির জন্য নির্দিষ্ট ফি জমা দিয়ে নির্ধারিত পদ্ধতিতে চেয়ারম্যানের নিকট আবেদন করতে হবে এবং আবেদনপত্রে প্রস্তাবিত বিয়ের কারণ এবং বর্তমানে স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না তা উল্লেখ করতে হবে।

২. আবেদনপত্র পাঠাবার পর চেয়ারম্যান আবেদনকারী ও তার বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীগণকে তাদের নিজ নিজ প্রতিনিধি মনোনয়ন করতে বলবেন এবং সালিশি পরিষদ যদি মনে করে যে, প্রস্তাবিত বিয়েটি প্রয়োজন ও ন্যায়সঙ্গত তা  হলে কোনো শর্ত থাকলে সে সাপেক্ষে প্রার্থীর বিয়ের অনুমতি মঞ্জুর করতে পারে।

৩. আবেদনপত্র সম্পর্কে সিদ্ধান্তকালে, সালিশি পরিষদ এ সিদ্ধান্তের কারণসমূহ লিপিবদ্ধ করবে এবং কোনো পক্ষ নির্দিষ্ট ফি জমা দিয়ে নির্ধারিত পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট সময়ে সংশ্লিষ্ট সহকারী জজের পুনর্বিচারের জন্য আবেদন করতে পারবে। এতে সহকারী জজের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে এবং এর বৈধতা সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।

৪. বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের প্রাপ্য মুয়াজ্জল বা মু-অজ্জল দেনমোহরের টাকা তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করতে হবে। সেই টাকা যদি ওইরূপে পরিশোধ করা না হয়, তাহলে বকেয়া ভূমি রাজস্ব রূপে আদায় করা হবে।

সিঁথির সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, তার হূদয়ের ভেতরে বয়ে যাচ্ছে অশান্তি ও অস্থিরতা। বুঝতে পারি তার মানসিক অবস্থা কেমন!

অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

seraj.pramanik@gmail.com

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads