• রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
বন্দিজীবনে মুক্তির স্বাদ

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের অভ্যন্তরে থেকে যাওয়া ভূখণ্ডের অধিবাসীরা ছিল রাষ্ট্রীয় অধিকারবঞ্চিত

ছবি: সংরক্ষিত

মতামত

আশা-নিরাশার চার বছর

বন্দিজীবনে মুক্তির স্বাদ

  • প্রকাশিত ৩১ জুলাই ২০১৮

বহুদিনের সীমান্ত জটিলতা নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের অভ্যন্তরে থেকে যাওয়া ভূখণ্ডের অধিবাসীরা ছিল রাষ্ট্রীয় অধিকারবঞ্চিত। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ভারতের ১১১টি ছিটমহলের ভূমির পরিমাণ হলো ১৭১৫৮.১৩ একর। সেখানকার সর্বশেষ লোকসংখ্যা (২০১০-২০১৫ হিসাব অনুযায়ী) ছিল ৩৪ হাজার। অপরদিকে ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ছিটমহলের সংখ্যা হল ৫১টি। এসব ছিটমহলের জমির পরিমাণ ৭,১১০.২ একর। লোকসংখ্যা ১৭ হাজার। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সারা পৃথিবীতে ছিটমহলের সংখ্যা ২৭৭টি। এর মধ্যে ইংল্যান্ড, আমেরিকা, নিউজিল্যান্ডসহ অন্য দেশগুলোর ছিটমহলের সংখ্যা ১১৫টি। এর মধ্যে শুধু ভারত উপমহাদেশের ছিটমহলের সংখ্যা ছিল ১৬২টি। তৎকালীন এই ১৬২টি ছিটমহলের ৫১ হাজার মানুষ সব রকমের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে ছিল দীর্ঘদিন যাবত বঞ্চিত। এসব বঞ্চিত মানুষ কারণে-অকারণে, সময়ের ব্যবধানে জীবন দিয়েছে দুর্বৃত্তদের নিষ্ঠুর হাতে। ৬৮ বছরের ব্যবধানে প্রায় ৩শ’ জন খুন হয়েছে। বিচার হয়নি কোনো হত্যাকাণ্ডের। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় এই হতভাগ্যদের। নীরব-সরব আন্দোলন চলে মাঠে, ময়দানে এবং সাংস্কৃতিক মঞ্চে। সমষ্টিগত দাবি- চাই রাষ্ট্রীয় অধিকার, চাই মানবতা।

২০১০ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে উভয় দেশের ১৬২টি ছিটমহলের মানুষ রাষ্ট্রীয় অধিকার আদায়ের জন্য অভিনব কৌশল অবলম্বন করে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা সব ছিটমহলবাসী কৃষ্টি, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে জাতীয় সব অনুষ্ঠান পালন শুরু করে। এর মধ্যে ছিল ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস, বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন ও যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতীয় দিবসসমূহ। পাশাপাশি ভারতের অভ্যন্তরে থাকা ৫১টি ছিটমহলে বসবাসরত সাধারণ মানুষ ভারতের ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবস, ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবস, ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন ইত্যাদি কর্মকাণ্ড চালু রেখে তারা ভারতীয় মূলধারায় মিশে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। উভয় পাশের ছিটমহলবাসী এভাবে দিনের পর দিন ব্যাপক আয়োজনের মধ্য দিয়ে এক অভিনব আন্দোলন শুরু করে।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং ঢাকা সফরে এসে সীমান্ত জটিলতা নিরসনে প্রটোকল স্বাক্ষর করেন। স্বাক্ষরিত প্রটোকল বাস্তবায়নে উভয় দেশের ছিটমহলবাসীরা কোমর বেঁধে মাঠে নামে। দেশ-বিদেশের মানবাধিকার কর্মী, সাহিত্যিক, সুধীজন, সাংবাদিক, আইনজীবী, রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিটমহলবাসীর এই দাবি ও আন্দোলনের পক্ষে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। এতে উভয় দেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়।

মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি হয় ’৭৪ সালে। পরবর্তীতে কোনো সরকারই এই চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিকতা দেখায়নি। ফলে দীর্ঘ ৪৪ বছর ধরে এ চুক্তি আলোর মুখ দেখেনি। এর করুণ পরিণতি ভোগ করে প্রায় অর্ধলাখ মানুষ— তারা মানবেতর জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিল। গত ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন চলাকালে এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ‘বিশ্ব মানবতা রক্ষায়’ ছিটমহল তথা স্থল সীমান্তচুক্তি বাস্তবায়নের গুরুত্ব বোঝাতে সক্ষম হন। ফলে ২০১৪ সালে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার ৬৮ বছরের ঝুলে থাকা সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এরই সূত্র ধরে ২০১৫ সালের ৬ মে ভারতের পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে স্থল সীমান্ত চুক্তি পাস হয়। ওই দিন থেকে মাত্র ৮৫ দিনের ব্যবধানে ৩১ জুলাই রাত ১২টায় দীর্ঘ ৬৮ বছরের বন্দি-জীবনের মুক্তি ঘটে অর্ধ লাখ মানুষের। চার বছর হলো তারা মুক্ত জীবনের আশা পূরণের সুযোগ পাচ্ছে।

১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দের তালিকা অনুসারে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ১১১টি ছিটমহলের মধ্যে লালমনিরহাট জেলায় ছিল ৫৯টি। পঞ্চগড় জেলায় ছিল ৩৬টি। পক্ষান্তরে ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ছিটমহল ৫১টি। যেগুলোর অবস্থান ভারতের কুচবিহার জেলায়। বাংলাদেশ-ভারত সরকারের চুক্তি অনুযায়ী জায়গা-জমি বিনিময়ের প্রাক্কালে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় ছিটমহলগুলো থেকে মোট ৯২১ জন ভারতে পাড়ি দেন। আর ভারত থেকে কোনো মানুষই বাংলাদেশে আসেননি। বাংলাদেশ অংশের মানুষ এখন উন্নয়নের ছোঁয়া পেয়েছে। বর্তমান সরকার তাদের জন্য ২শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। সেখানে উন্নয়নের কর্মযজ্ঞ চলছে। নির্মাণ করা হচ্ছে রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, মাদরাসা, চিকিৎসাকেন্দ্র। চালু করা হয়েছে বয়স্কভাতা, বিদ্যুৎ সরবরাহও শতভাগ নিশ্চিত করা হয়েছে। কর্মক্ষম পরিবার গঠনে এনজিওর সকল প্রকার প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিত করতে প্রতিটি রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে তাদের যথাযথ সম্মান দেখানো হচ্ছে। তবে বাতির নিচে অন্ধকার— এটা প্রকাশ পাচ্ছে অতি উন্নয়নে আত্মহারা নব্য বাংলাদেশিদের কর্মকাণ্ডে। স্কুল, কলেজ করার নামে কিছু টাউট-প্রতারক ডোনেশন ব্যবসায় কোমর বেঁধে নেমেছে। যা নিয়ে হাসি তামাশাও কম হচ্ছে না।

অপরদিকে নব্য ভারতীয়দের সার্বিক উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ৯৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ ঘোষণা করার পরও কচ্ছপ গতিতে চলছে উন্নয়নের কাজ। যার ফলে চার বছরের ব্যবধানে  উন্নয়ন দৃশ্যমান হয়নি। রাস্তাঘাট সংস্কার ও কিছুটা বিদ্যুতায়ন হলেও গড়ে ওঠেনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আধার কার্ড, ভোটার কার্ড পেয়েছে নব্য ভারতীয়রা। পায়নি স্বাস্থ্য কার্ড। বিনিময় হওয়া জায়গা-জমি রাষ্ট্রীয়ভাবে রেকর্ড হয়েছে বটে, তবে ভোগদখলকারীদের মধ্যে দলিলপত্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করা হয়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও যথেষ্ট নড়েবড়ে। বাংলাদেশের দাশিয়ারছড়া থেকে ভারতের দিনহাটা পাড়ি জমানো মৃণাল বর্মণের ষোড়শী মেয়ে সম্প্রতি নিখোঁজ হয়েছে। তাকে পুলিশ এখনো উদ্ধার করতে পারেনি। অপরদিকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত নব্য ভারতীয়দের জন্য আবাসিক ‘ফ্ল্যাট বাড়ি’ তৈরির প্রকল্প নিয়েছে ভারত সরকার, যা অতিদ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে বলে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা গেছে। এই প্রকল্পের ভাবি ভুক্তভোগীরা একসময়  কাস্তে, কোদাল, লাঙ্গল-জোয়ালের সংস্কৃতিতে বড় হয়ে উঠেছিল। হঠাৎ করে ইট পাথরের আবাসন ভূমি কতটা যুক্তিযুক্ত এ গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়ছে সর্বস্তরে। তবে ৩১ জুলাইকে ঘিরে বাংলাদেশের নব্য বসতিরা আবেগের বশীভূত হয়ে স্বাধীনতা দিবস পালনের যে সংস্কৃতি চালু করছে তা কতটা যুক্তিযুক্ত— এই নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে! হতে পারে তা ‘মুক্তিদিবস’, ‘অধিকার দিবস’, ‘মানবতা দিবস’, ‘বিনিময় দিবস’ কিংবা অন্য কোনো স্মরণীয় ও বরণীয় নাম দেওয়া যেতে পারে এ দিনটির। বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস হল ২৬ মার্চ এটা মানতে হবে ছিটমহল থেকে মুক্ত হয়ে আসা মানুষদের। এক বাংলাদেশি জাতিসত্তার ভেতরেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে সম্মিলিতভাবে।

লেখক: রহিম আবদুর রহিম

শিক্ষক ও নাট্যকার। 

ইমেইল- rahimabdurrahim@hotmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads