• শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads

মতামত

চাই সুশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থা

  • প্রকাশিত ০৪ আগস্ট ২০১৮

অলিউর রহমান ফিরোজ

দেশের পরিবহন সেক্টরের নৈরাজ্যের কারণে অকালে ঝড়ে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় অনেক প্রাণ। অনেক পরিবারের আশা-আকাঙ্ক্ষা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছে অনেক চালক। তাদের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মিছিল লম্বা হচ্ছে। এই সেক্টরে যেন জবাবদিহিতার বালাই নেই। গজারিয়ায় পায়েলকে বাসের সুপারভাইজার, হেলপার ও চালক যে নৃশংসভাবে নদীতে ফেলে দিল তা সভ্য সমাজে চিন্তাই করা যায় না। এদের পশুর সঙ্গেও তুলনা করা যায় না। পশুর আচরণে এতটা পরিবর্তন লক্ষ করা যায় না। তারা বিনা কারণে অন্য কোনো প্রাণীকে এভাবে হত্যা করে না। তাকে যদি আহত অবস্থায়ও ফেলে দিত, তাহলেও কোনো মানবকুলের কারণে সে বেঁচে যেত।

এদিকে আরো ভয়ানকভাবে কুর্মিটোলা ফ্লাইওভারের ঢালে দুই বাসের রেষারেষিতে জাবালে নূর গাড়ির চালক গাড়ির জন্য অপেক্ষারত ছাত্রছাত্রীদের ওপর যেভাবে বাসটি উঠিয়ে হত্যা করল, সে নিষ্ঠুরতার কোনো হিসাব মেলে না। আহতদের চিৎকারে হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। এর আগে রাজীবের ঘটনাটি দেশের মানুষ এখনো ভুলে যায়নি। বাবা-মাহারা রাজীবের আরো দুটি ভাই ছিল, যারা রাজীবের ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে ছিল। আজ রাজীবের সেই এতিম ভাইগুলো রাজীবকে হারিয়ে যেন আরো এতিম হয়ে গেল। সে ঘটনা যদি ক্ষমতার মসনদে থাকা মানুষের মনে রেখাপাত করত, তাহলে হয়তো কুর্মিটোলার ফ্লাইওভারের ঘটনা ঘটত না। বেসরকারি ফার্মে কর্মরত রূপার কথা আমরা এখনো ভুলে যাইনি। মেয়েটির ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাসের হেলপার, চালক এবং সুপারভাইজার। তাদের লালসার নখের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল রূপার শরীর। ভোগ শেষে তারা নিষ্ঠুরভাবে রূপাকে হত্যা করে বনের নির্জন জায়গায় ফেলে যায়। বনের কোনো পশু, হিংস্র জানোয়ার রূপার শরীরে নখের আঁচড় বসায়নি। সে ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে আরেক নারী পোশাক শ্রমিককে চলন্ত বাসে জোরপূর্বক লালসার শিকার করতে চেয়েছিল। কিন্তু সে নারীর জীবন-যৌবন এত সস্তা নয় যে তারা ভোগ করবে। তাই চলন্ত গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়ে সে তার সতীত্ব রক্ষা করেছিল।

গণপরিবহনে যদি একজন পায়েলকে হত্যার শিকার হতে হয়, চলন্ত গাড়িতে যদি রূপার ইজ্জত লুট হওয়ার পর মৃত্যু ঘটে, তাহলে এর দায়ভার কে নেবে? রাষ্ট্র যদি এক্ষেত্রে এগিয়ে না আসে, তাহলে হায়েনাদের কবল থেকে আমাদের মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষা হবে কীভাবে? সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, কুর্মিটোলায় বাসচাপার ঘটনাটি শুনে নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেছেন, ভারতে বাস চাপায় মানুষ মরলে তো এরকম হৈচৈ হয় না। আমাদের দেশে কেন এরকম হয়? তার এ বক্তব্যে দেশের মানুষের মনে মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে আরেক মন্ত্রী এক ছোট বাচ্চা মারা যাওয়ার ঘটনায় বলেছিলেন, আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন। সে সময় দেশের মানুষের মধ্যে বড় ধরনের ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল।

মূলত বাসের চালক হিসেবে যারা স্টিয়ারিংয়ে বসেন, তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অত্যন্ত কম। তারপর রয়েছে পেশাগত দক্ষতা। অধিকাংশ চালকেরই ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। একজন প্রশিক্ষিত চালক যখন লাইসেন্স নিতে যান, তখন তাকে গাড়ি চালানো নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। গাড়ি চালানোর জন্য অনেক নিয়মকানুন জানতে হয়। কিন্তু একজন হেলপার যখন গাড়ি চালকের আসনে বসেন, তখন তার মধ্যে বেপরোয়া ভাব দেখা যায়। এসব চালকই রাস্তার পাশে বসা দোকানের ওপর গাড়ি উঠিয়ে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছে। তারা অনেক সময় গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইলে কথা বলেন, যা নিষিদ্ধ। কিন্তু কে মানছে কার কথা। অনেক সড়ক আছে যেখানে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য গতিরোধক আছে। তারপরও তাদের গতি, কোনোভাবেই রোধ করা যাচ্ছে না। রোধ করা যাচ্ছে না সড়ক দুর্ঘটনা। পঙ্গু হাসপাতালগুলোতে গেলে দেখা যায় সড়কে আহত মানুষের করুণ চিত্র। কুর্মিটোলার দুর্ঘটনায় আবদুল করিম এবং দিয়া খানমের লাশ কবরে নেওয়ার আগেই আমরা হয়তো শুনতে পাব অন্য কোনো সড়কে দুর্ঘটনার। তারপর হয়তো এ ঘটনা আমরা ভুলেই যাব। এভাবেই কি আমাদের পরিবহন খাতে নৈরাজ্য চলতে থাকবে? আমরা কি এর কোনো বিহিত করতে পারব না?

সমস্যা রয়েছে এ দেশের পরিবহন আইনে। একজন পথচারীকে কোনো চালক চাপা দিয়ে হত্যা করলে তার জন্য রয়েছে মাত্র ৬ মাসের জেল জরিমানা। আইনের দুর্বলতা সংশোধন করা না গেলে চালকদের গতি রোধ সম্ভব হবে না। আবার কোনো চালককে যদি গ্রেফতার করা হয়, তার জন্য দেশের পরিবহনের নেতারা ধর্মঘট ডেকে পুরো দেশ অচল করে দেন। তাদের আগে আইনের জালে ধরতে হবে। কোনো গাড়ির মালিক যখন ড্রাইভার নিয়োগ দেন, অবশ্যই তার ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকেও ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষিত চালকদেরই গাড়িচালকের আসনে বসাতে হবে।

একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের জন্য কান্না। প্রতিদিনই সড়কে মৃত্যুর মিছিল লম্বা হচ্ছে। কারো জীবন চিরতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে, কেউ আবার পঙ্গু হয়ে পরিবারের বোঝায় পরিণত হচ্ছেন।

প্রশিক্ষিত একজন ড্রাইভারের গাড়ি চালানোর নিয়মকানুন জানা থাকে, জানা থাকে কখন কীভাবে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। কিন্তু বর্তমানে ৮০ ভাগ চালকেরই কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ নেই, নেই লাইসেন্স। গাড়ি চালাতে চালাতে মোবাইল ফোনে কথা বলাও গাড়ি দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। আমরা প্রতিদিন সংবাদপত্রে দেখতে পাই সড়ক দুর্ঘটনায় অকাতরে প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। আমরা আর এভাবে মরতে চাই না। সুস্থ, সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্য একটি সুশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠুক- এটাই দেশবাসী প্রত্যাশা করে।

 

লেখক : সাংবাদিক

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads