• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
পিটিআই’র জয় ও পাক-রাজনীতির গতিপথ

পাকিস্তানের সদ্য প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান

সংরক্ষিত ছবি

মতামত

পিটিআই’র জয় ও পাক-রাজনীতির গতিপথ

  • প্রকাশিত ০৫ আগস্ট ২০১৮

পাকিস্তানের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে পিটিআই’র (পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ) জয়কে পাক-তারুণ্যের জয় হিসেবে অভিহিত করা যায়। যারা ইমরান খানের (পিটিআই প্রধান) জয়ের মূলে সেনা সমর্থনের কথা বলছেন আমি তাদের কথাকে সত্য বলি, তবে অর্ধসত্য। ২০১২ সালে পাকিস্তানে জনমত জরিপে ইমরান সেরা ব্যক্তি নির্বাচিত হয়েছিলেন। পাক-তরুণদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা বেশি। এবার নির্বাচনেও জয়ের পেছনে পাক-তরুণদের ভূমিকাই মুখ্য। পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৬৪ শতাংশ তরুণ। এই তরুণ ভোটারদের একচেটিয়া সমর্থন পেয়েছে পিটিআই। এখানে ইমরানকে জয়ী করতে পাক-সেনারা একটু চেষ্টা চালিয়েছে মাত্র। পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব বিস্তার আগের চেয়ে অনেকাংশেই কমেছে। ৭১ বছরের স্বাধীনতার ইতিহাসে ২০১৩ সালের নির্বাচিত সরকারই প্রথম পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে পেরেছে, যা পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অবশ্যই একটা দৃষ্টান্ত। এখানে একটা বিষয় সামনে আসে যে, পাকিস্তানে সেনাবাহিনী হয়তো সরাসরি ক্ষমতা কব্জা করবে না, কিন্তু তাদের ক্রীড়নক সরকার ছাড়া অন্য কাউকে টিকতে দেবে না। এ কথাটাকেও আমি পূর্ণ সত্য মনে করি না। সরকারের টিকে থাকার বিষয়টি কেবল সেনাবাহিনীর মর্জির ওপর নির্ভরশীল নয়। এর সঙ্গে আরো কিছু বিষয় জড়িত আছে।

২৭২টি আসনের মধ্যে পিটিআই ১১৭টি আসন পেয়েছে। পিএমএল-এন (পাকিস্তান মুসলিম লীগ - নওয়াজ) পেয়েছে ৬৪টি আর পিপিপি (পাকিস্তান পিপলস পার্টি) পেয়েছে ৪৩টি আসন। এ ছাড়া আর কিছু ছোট দল অল্প কিছু আসন পেয়েছে। যদিও নির্বাচনে ইমরান খানকে জেতাতে সেনাবাহিনী প্রভাব খাটিয়েছে, তারপরও এটা স্পষ্ট যে, প্রায় দ্বিগুণ সংখ্যক আসন লাভের জন্য শুধু সেনা-সমর্থনই যথেষ্ট নয়; বরং এখানে পাকিস্তানের জনগণের রায় কাজ করেছে। এবারের নির্বাচনে ইমরানের জয়ের পেছনে বড় অবদান রেখেছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থান। ২০১০ সাল থেকেই পিএমএল-এন ও পিপিপি’র দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন ইমরান খান। যেটা তাকে তরুণ পাকিস্তানিদের মন জোগাতে ভালো ফল দিয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য সেবাখাতে উন্নতি, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পতন রোধ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির (১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গরিবদের জন্য ৫০ লাখ বাড়ি নির্মাণ) প্রতিশ্রুতি ইমরান খানকে অন্যদের থেকে এগিয়ে দিয়েছে। পিএমএল-এন ও পিপিপি’র দুর্নীতি ও দীর্ঘ সময় শাসনের ফলে নানা অনাচার পাকিস্তানিদের অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। ইমরান খান পাকিস্তানিদের সামনে নতুন আলোর সন্ধান দিয়েছেন। রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির উত্থানকে পাকিস্তানিরাও স্বাগত জানিয়েছে। সেনাবাহিনীর পক্ষপাতের বিষয়টি তাদের সুবিধাবাদী চরিত্র ছাড়া আর কিছু নয়। জেনারেল জিয়াউল হকের হাত ধরে ১৯৭৬ সালে প্রথম রাজনীতিতে আসেন নওয়াজ শরিফ। রাজনীতির ঝানু খেলোয়াড় হয়ে যখন তিনি সেনাবাহিনীকে পাশ কাটাতে শুরু করেছেন, তখনই সেনাবাহিনী তাকে ছুড়ে ফেলেছে। পানামা পেপারস কেলেঙ্কারির ঘটনা সে পথ তৈরি করে দিয়েছে।

অন্যদিকে ইমরানের মাঠ ভালো। তাই তাকে সহায়তার মাধ্যমে কিছু আসন বেশি পাইয়ে দিয়ে সখ্য গড়েছে সেনাবাহিনী, যাতে বাগে থাকে। সেনাবাহিনী খুবই সামান্য ভূমিকা রেখেছে ইমরান খানের মসনদ দখলের ক্ষেত্রে। প্রাদেশিক পরিষদের ফল বিশ্লেষণ করলেও উপরোক্ত কথার সত্যতা পাওয়া যাবে। যদি সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের বিষয়টি পুরো সত্য হতো, তাহলে পিপিপি’র ঘাঁটি সিন্ধুতে পিটিআই ভালো করত। কিন্তু পিএমএল-এনের ঘাঁটি পাঞ্জাব প্রদেশে পিটিআই ভালো ফল পেয়েছে। এ থেকে স্পষ্টত বোঝা যায় নওয়াজের দুর্নীতি ইমরান খানের জন্য বড় একটা সুযোগ করে দিয়েছে। তেমনি বেলুচিস্তান, খাইবার পাখতুয়ান খাওয়াতেও পিটিআই তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছে। তাই এ জয়ের মূল নায়ক ইমরান খান নিজেই।

নির্বাচনী প্রচারে ইমরান খান পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ ও বৃহৎ ধর্মীয় গোষ্ঠীর অনুভূতিকে কাজে লাগাতে পেরেছিলেন। পীরজাদী বুশরার সঙ্গে বিয়েটা ইমরান খানের জন্য ভালো ফলদায়ক হয়েছে। ভোটের রাজনীতিতে এটাকে আমরা ইমরানের একধরনের কৌশল বলতে পারি। পাকিস্তানে জনমতের ওপর পীর ও ইসলামী দলগুলোর বেশ প্রভাব আছে। ইমরান খান রাজনীতির বাইরে থাকা এই ধর্মীয় শক্তিকে কাজে লাগিয়েছেন। বেশ কয়েকটি ডানপন্থি ইসলামী রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও সখ্য গড়েছিলেন। আবার দীর্ঘ সময় পাকিস্তানে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থেকে ইমরান খান ডানপন্থি দলগুলোর প্রভাব বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন, যেটা তাকে অন্যদের চাইতে এগিয়ে রেখেছে। এটা বোঝা সহজ, নির্বাচনী প্রচারণার সময় দেওয়া ইমরান খানের ভাষণ এবং বিজয়ের পরে দেওয়া ভাষণের মধ্যে পার্থক্য থেকে। তাই ইমরানের এমন চৌকস চিন্তা-চেতনা তার নির্বাচনে জয়ের পথকে সুগম করে তুলেছে।

এ নির্বাচনে পিটিআই বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে। কিন্তু এককভাবে সরকার গঠনে সমর্থ নয়। এককভাবে সরকার গঠনের জন্য ১৩৭টি আসন দরকার। পিটিআই পেয়েছে ১১৭টি। এখন ইমরান খানকে জোট সরকার গঠন করতে হবে। পিএমএল-এন সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে অবস্থান নেবে বলে জানিয়েছে দলটির বর্তমান সভাপতি শাহবাজ শরিফ। পিপিপি বা অন্য ক্ষুদ্র দলগুলোর সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার গঠন করা ছাড়া পিটিআই’র সামনে বিকল্প নেই। এতে একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্ট গঠিত হবে, যেটা সেনাবাহিনীর প্রয়োজন। ইতোপূর্বে প্রধানমন্ত্রীত্বের অভিজ্ঞতা নেই ইমরান খানের। তাই অভিজ্ঞ কোনো দলের সঙ্গে সরকার গঠনই হবে সময়োচিত পদক্ষেপ। পিপিপি প্রধান বিলওয়াল ভুট্টো জোট সরকার গঠনে প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছেন। এটা ইতিবাচক হবে বলে মনে হচ্ছে ইমরান খানের জন্য। তবে সরকার গঠনই শেষ কথা নয়। কারণ পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিসহ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি সম্পূর্ণ পাক-সেনাবাহিনীর হাতে জিম্মি, যার খেসারত দিতে হয়েছে নওয়াজ শরিফকে। সুতরাং ইমরান খান যদি ভবিষ্যতে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কোনো পদক্ষেপ নেন, তাহলে সেনাবাহিনী সেটা কীভাবে দেখবে, তার ওপর নির্ভর করছে নবনির্বাচিত পিটিআই’র ভবিষ্যৎ। আর বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতিতে জোট কতটা পক্ষশক্তি হিসেবে থাকবে, সেটাও দেখার বিষয়। তবে পাক-রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের ধরন পরিবর্তন হয়েছে। আগের মতো অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সরকার পরিবর্তন না করে কৌশলে কাজ করে। তাছাড়া পাকিস্তানের পতনশীল অর্থনীতিকে বাঁচাতে শুধু চীনের ওপর নির্ভরশীলতা যথেষ্ট নয়। এক্ষেত্রে পররাষ্ট্রনীতিতে অন্য দেশের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কোন্নয়নের জন্য কাজ করতে হবে। যেটা পাক-সেনাদের নাখোশ হওয়ার কারণ হতে পারে। তাই ইমরান খান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি তথা কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে যে কথা বলেছেন তা রক্ষা করতে কতটা সমর্থ হবেন, সেটার ওপরও জোট সরকারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

পাকিস্তানের রাজনীতির গতি বোঝা একটু কষ্টকর। কারণ দেশটি গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্রে এখনো পুরোপুরি সামরিক হস্তক্ষেপমুক্ত নয়। অন্যদিকে সন্ত্রাসবাদীদের হুমকি তো আছেই। সন্ত্রাসবাদে অর্থ জোগানের অভিযোগে পাকিস্তান কালোতালিকাভুক্ত হয়েছে। যদি এ অভিযোগ ভুল প্রমাণ করতে না পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক সহায়তার ক্ষেত্রটি সংকুচিত হবে, যা পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে ইতোমধ্যেই প্রভাব ফেলেছে। দেশ পরিচালনায় পূর্বঅভিজ্ঞতার অভাব, রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা, অনিশ্চিত জোট এবং শক্তিশালী বিরোধী দল- সবকিছুর মোকাবেলা করে আগামীতে কতটা সফলতার পরিচয় দিতে পারবেন ইমরান খান, তা-ই এখন দেখার বিষয়। ঘোলাটে পাক-রাজনীতি নিয়ে যতই বিশ্লেষণ করা হোক— সময়ই বলে দেবে পিটিআই’র ভবিষ্যৎ।

জি. কে. সাদিক

লেখক : সাংবাদিক

 

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads