• বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
নারীকর্মী : যেখানে দেশের সম্মান জড়িত

বিদেশে পাড়ি জমানো নারীকর্মী

সংরক্ষিত ছবি

মতামত

নারীকর্মী : যেখানে দেশের সম্মান জড়িত

  • প্রকাশিত ০৫ আগস্ট ২০১৮

দারিদ্র্য থেকে মুক্তি কে না চায়? তাই দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে বাঁচতে ও আর্থিক সচ্ছলতার আশায় আমাদের দেশের অনেক নারী নিজের পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও দেশ ছেড়ে কাজের খোঁজে ভিন্ন দেশে পাড়ি জমায় অনেক স্বপ্ন নিয়ে। এ রকমই কিছু স্বপ্নের দেশ সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরো কিছু রাষ্ট্র। সামান্য কাজ পেলে টাকার কোনো অভাব থাকবে না, দালালরা এমন মিথ্যা প্ররোচনা আর আর্থিক সুবিধার লোভ দেখিয়ে আমাদের দেশের নারীদের বিদেশে পাঠায়। যতটা না ব্যয়, তার চেয়ে বেশি খরচ তারা হাতিয়ে নেয় নিজের বিবেককে বিসর্জন দিয়ে কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থে। জমিজমা বিক্রি করে কিংবা ঋণের টাকা দিয়ে বিদেশে যাচ্ছে আমাদের সহজ-সরল নারীরা। কিন্তু কিছুদিন পর চরম বাস্তবতার সঙ্গে পরাজিত হয়ে সব স্বপ্ন মরুভূমিতে বালিচাপা দিয়ে নিঃস্ব হাতে ফিরে আসে তারা। তাদের হারানোর করুণ গল্প আর শেষ হয় না যেন।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মীর সংখ্যা প্রায় ২১ লাখ। আর বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ৭ লাখের বেশি নারীকর্মী বিদেশে কাজের জন্য আছে, যার মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ সৌদি আরবে নারীকর্মী হিসেবে কর্মরত। বাংলাদেশের নারীকর্মীদের ভয়াবহ নির্যাতনের কথা এখন আমরা সবাই প্রতিদিন শুনতে পাই। শারীরিক নির্যাতন, গৃহকর্মীদের দিয়ে অতিরিক্ত সময় কাজ করিয়ে নেওয়া, পাসপোর্ট রেখে দেওয়া, খাবার খেতে না দেওয়া এবং যৌন নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিক নির্যাতন নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়া চাকরি ছাড়াও যাবে না, আবার দেশেও ফেরত আসা যাবে না। নিয়োগদাতার অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও কাজ করতে গেলে জরিমানা থেকে শুরু করে গৃহকর্মীর নিজ দেশেও পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এসব কারণে নির্যাতনের মাত্রা অনেক। তাছাড়া কর্মী-মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করতে গেলে কর্মীর বিরুদ্ধে তখন চুরির দায়ে মামলা করা হয়। গৃহকর্তারা যখন নির্যাতন করে, তখন সেসব নির্যাতনের রেকর্ড রাখাটা খুবই কঠিন। কারণ এগুলোর বেশিরভাগই ব্যক্তিমালিকানাধীন বাড়িতে করা হয়ে থাকে। ২০১৮ সালের মে মাসে ‘মিডল ইস্ট আই’ নামক একটি অনলাইন নিউজপোর্টালে বাংলাদেশি নারীদের সৌদি আরবে নির্যাতনের বিষয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়, যেখানে ছবিসহ নারী নির্যাতনের ঘটনা বর্ণনা করা হয়। সিএনএন, বিবিসি, হাফিংটোন পোস্ট, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলো নিয়মিত রিপোর্ট করে যাচ্ছে সৌদিতে গৃহকর্মীদের এই নির্যাতনের কথা। কিন্তু এতে তেমন কাজ হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।

এখন প্রতিমাসে বাংলাদেশে শত শত নির্যাতিত নারী ফেরত আসছে। এ বিষয়টি আসলে এখন নারী নির্যাতনের সীমা ছাড়িয়ে দেশের জন্যও অপমানজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সৌদিরাও জানে তাদের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে কিছু করা যাবে না। তবে নির্যাতন বাড়ার ফলে যে নারী শ্রমিক যাওয়ার সংখ্যা কমবে, সেটা হয়তো নয়। কারণ অনেক নারী শ্রমিক এসব নির্যাতনের কথা জানে না। মিডিয়ায় যেভাবে প্রচার হচ্ছে, সেটা নারী শ্রমিক পর্যন্ত যে পৌঁছবে, সেটা খুব সহজভাবে বলা যাবে না। আবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দিক থেকে বলা হচ্ছে, তারা খাপ খাওয়াতে পারছে না অথবা অধিকাংশই দেশে এসে গল্প বানাচ্ছে। তবে এ কথা ঠিক যে, খাপ খাওয়ার বিষয়টা অনেকটাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটা অজুহাত হতে পারে না। খাপ খাওয়াতে না পারার মানেই কি নির্যাতন সহ্য করা?

এ বছরের ৩১ মে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সৌদি গৃহকর্মীর ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে ভয়াবহ নির্যাতনের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়। অনেক সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়। কিন্তু যে বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে ভয়ানক সেটা হচ্ছে, ফেরত আসা নারীদের তাদের পরিবার গ্রহণ করছে না— এ ধরনের খবর পত্রপত্রিকায় আসছে। অথচ চাকরি করে কিছু টাকা আয় করার মাধ্যমে পরিবারের সচ্ছলতা এনে দেওয়ার জন্য যে নারী তার দেশ-পরিবার ছেড়ে অচেনা এক দেশে পাড়ি দিয়েছিল, আজ সেই পরিবারেই তাকে নিগৃহীত হতে হচ্ছে। এর চেয়ে ভয়ঙ্কর আর কী হতে পারে! আমাদের সমাজব্যবস্থায় একজন নারী সবসময়ই বৈষম্যের শিকার। এর মধ্যে আবার এ ধরনের ঘটনা তাদের বেঁচে থাকার জন্য হুমকিস্বরূপ। নির্যাতিত নারীরা দেশে ফেরত আসার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়। কিন্তু এ ধরনের প্রচারণা একদিকে যেমন ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভঙ্গ করছে, অন্যদিকে তাদের সামাজিক ও পারিবারিক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। তাই এ ধরনের প্রচারণার ক্ষেত্রে আমাদের আরো সচেতন হওয়া দরকার।

রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা সবসময় রাখছে। কিন্তু সেটা কি আত্মসম্মান বিসর্জনের মাধ্যমে হতে হবে? রেমিট্যান্সের কারণে নারীদের আমরা এভাবে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারি না। আমরা চাই না আমাদের নারীকর্মীরা সৌদি আরবে চাকরির নামে সারা জীবনের কান্না উপহার হিসেবে বয়ে আনুক। যথাযথ কর্তৃপক্ষকে সেদিকে এখনই নজর দিতে অনুরোধ করছি।

 

মো. মাঈন উদ্দিন

লেখক : প্রশাসনিক কর্মকর্তা, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads