• মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৮, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
নন্দিত আন্দোলন যেন নিন্দিত না হয়

নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলন

সংরক্ষিত ছবি

মতামত

নন্দিত আন্দোলন যেন নিন্দিত না হয়

  • এস এম মুকুল
  • প্রকাশিত ০৬ আগস্ট ২০১৮

শুধু শিক্ষার্থী বলে কথা নয়, প্রতিটি মানুষের জীবনই গুরুত্বপূর্ণ। চালকের বেপরোয়া গাড়ি চালনায় যে কয়টি তাজা প্রাণ নিঃশেষ হয়ে গেল তা দেখে পুরো জাতি বিস্মিত, স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ। কথা হচ্ছে এ রকম প্রাণঘাতী সড়ক দুর্ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগেও এমন ঘটনা অনেক ঘটেছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অদক্ষ চালক, বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে সড়কে হাজারো প্রাণ অকালে ঝরে যায়। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে এই অনিয়ম যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। সর্বসাধারণে এ নিয়ে অসন্তুষ্টির শেষ নেই। এর যেন কোনো প্রতিকার নেই। সড়ক দুর্ঘটনায় সম্প্রতি শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় নৌপরিবহনমন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এই মৃত্যুকে সংখ্যাতত্ত্বের বিশ্লেষণে পাশের দেশের সঙ্গে তুলনা করে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। যদিও বাংলাদেশে মন্ত্রীদের বেফাঁস বিবৃতির উদাহরণ এটাই নতুন নয়। মন্ত্রীর এমন তাচ্ছিল্যপনায় সারা দেশের মানুষ হতবাক, বিস্মিত, ক্ষুব্ধ। সমালোচনার ঝড় উঠেছে দেশ জুড়ে। ঘৃণাভরে মন্ত্রীকে প্রত্যাখ্যান করেছেন দেশবাসী। কিন্তু বাংলাদেশে মন্ত্রিত্ব ত্যাগের সংস্কৃতি কখনোই ছিল না, এখনো নেই- এটা দুঃখজনক।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তা আটকে আন্দোলন করেছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। প্রথমে তাদের আন্দোলন রোধ করতে পুলিশও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এর ফলে আবারো পুলিশের প্রতি জনগণের অনাস্থা প্রদর্শিত হয়। জনগণ ঘৃণায় ধিক্কার জানিয়েছে। অতঃপর প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। নৌপরিবহনমন্ত্রী ক্ষমাও চেয়েছেন। শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কে পথচলার জন্য ৯ দফা দাবি জানিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সব দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক বৃহস্পতিবার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তারপরও আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।

আমার কেবলই ভয় হচ্ছিল- এই অভিনব, সৃজনশীল, মানবীয় আন্দোলনটি না জানি কোনো কারণে বিতর্কিত হয়ে যায়। জননন্দিত এই আন্দোলনটি যেন কোনো উসকানিদাতাদের মদদে নিন্দিত হয়ে না পড়ে। কারণ এরা কোমলমতি শিক্ষার্থী। আন্দোলন করার কায়দা-কানুন, নিয়ম-নীতি, আদর্শ-উদ্দেশ্য, গতিবিধির এরা কী-ই বা বোঝে। আমরা শাহবাগের গণজাগরণ দেখেছি। শুরুতে জননন্দিত সেই আন্দোলন শেষে বিতর্কে বহুদা-বিভক্ত হয়ে পড়ে। আমাদের দেশের কলুষিত রাজনীতির গোলকধাঁধায় এবারের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনটিও যেন শেষমেষ বিতর্কিত না হয়ে পড়ে- সেই ভয় থাকাটাই স্বাভাবিক।

তবে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে সব স্তরের সহানুভূতি ও সমর্থন থাকলেও আমরা দেখতে পাইনি যারা নিরাপদ সড়কের দাবিতে সর্বদা সোচ্চার তাদের কেউ এই শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়াননি। পাশে দাঁড়াননি সুশীল সমাজের খ্যাত-নন্দিত ব্যক্তিত্বরাও। পাশে নেই কোনো পেশাজীবী সংগঠন অথবা অভিভাবক শ্রেণিও। তখন থেকেই ভয় হচ্ছিল- এই আন্দোলনটি শেষমেষ অবিতর্কিত থাকবে তো! পেছন থেকে কোনো শক্তি কি আন্দোলনকে পথহারা করে ছাড়বে?

আমরা দেখছিলাম শিক্ষার্থীরা কয়েক দিন ধরে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে পথরোধ করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। ব্যাপক জনভোগান্তির পরও সর্বসাধারণ সচেতনভাবেই সব মেনে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে। ওদের আন্দোলনে প্রতিদিন হেঁটে হেঁটে অফিসে আসা-যাওয়া করছেন কর্মজীবীরা। কিন্তু তাদের মাঝে কোনো ক্ষোভ নেই। বিচ্ছিন্ন কিছু অতিরঞ্জিত ঘটনা ছাড়া সবকিছুই যেন চলছিল পরিপাটিভাবে। অ্যাম্বুল্যান্সকে পথ করে দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। পঙ্গু নারীকে রাস্তা পার করে দিচ্ছে, অসুস্থ শিশু কোলে মাকে পাঠিয়ে দিচ্ছে হাসপাতালে! বাচ্চা ছেলেমেয়েরা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছে। সারি বেঁধে সুশৃঙ্খলভাবে রাস্তায় চলছে রিকশা। কোনো গাড়ি লাইসেন্স ছাড়া চলতে পারছে না। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই রাস্তার ভাঙা কাচ ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করছে। এই ছেলেমেয়েরাই বুকে সাঁটানো প্ল্যাকার্ডে লিখেছে, ‘৫জি স্পিডের ইন্টারনেট চাই না, ৫জি স্পিডের বিচারব্যবস্থা চাই’! ওরা কোনো অন্যায় দাবি করেনি। ওদের দাবিতে শুধু সাধারণ মানুষ নয়; সরকারেরও উপকার হবে। কাজেই এই ছেলেমেয়েদের দাবি মেনে নিয়ে তাদের ঘরে ফেরত পাঠানো সরকারের দায়িত্ব। সরকার তারই অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। কিন্তু সৃজনশীল, মানবিক এই আন্দোলনে কীভাবে যেন যুক্ত হয়ে গেল অশ্লীলতা! এটা মোটেও কাম্য ছিল না। আমরা দেখতে পেলাম প্ল্যাকার্ডে শিশু-কিশোরদের হাতে গলায় ঝুলানো প্ল্যাকার্ডে লেখাগুলো- ‘লাঠির ভয় দেখাবে না, লাঠি একদম ভরে দিব’, কিংবা ‘পুলিশ কোন চ্যাটের বাল’ ইত্যাদি। আমি দ্বিধাহীনভাবে বলতে পারি- এই কথাগুলো এই বাচ্চাদের কথা নয়। কে বা করা যেন এই আন্দোলনকে ব্যর্থ করে দিতে নীলনকশার ফাঁদ পেতেছে।

একটি ন্যায্য আন্দোলনকে যদি ধ্বংস করে দেওয়া হয় তাহলে সব সম্ভাবনাই সড়কে প্রাণ যাওয়ার মতো করে নিঃশেষ হয়ে যাবে। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের আগে আন্দোলন হয়েছে। সেখানেও শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল। কিন্তু চরম বিক্ষুব্ধ আন্দোলনেও ছিল না কোনো অশ্লীলতা। জননন্দিত এই আন্দোলনটি একটি আদর্শিক ও শিক্ষণীয় আন্দোলনের রোল মডেল হতে পারত। কারণ ছোট ছোট বাচ্চারা বড়দেরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে একটি সৃজনশীল আন্দোলন করতে হয়। ট্রাফিক সিস্টেম মানা, লাইসেন্সবিহীন গাড়ির গতিরোধ কিংবা উল্টোপথে গাড়ি চালানো- একটি দেশের জন্য চরম অনিয়ম সেটা তারা সুন্দরভাবেই তুলে ধরতে পেরেছে। কিন্তু এর যৌক্তিক সমাধানের লক্ষ্যে সরকারের কার্যকর পদক্ষের জন্য অপেক্ষা করা প্রয়োজন তা এই আন্দোলনরত কোমলমতি শিক্ষার্থীরা কতটুকুই বা বোঝে। ফলে তাদের বিভ্রান্ত করতেই অশ্লীল স্লোগানে উসকানি দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের অবকাঠামোকে তাচ্ছিল্য করা নিয়েই যত ভয়। আশা করি শিক্ষার্থীরা ব্যাপারটি বুঝবে। তারা না বুঝলেও অভিভাবকরা অন্তত তাদেরকে সতর্ক করবেন। তা না হলে উসকানির ফাঁদে পড়ে এই আন্দোলনের অর্থহীন সমাপ্তি ঘটবে অচিরেই।

 

লেখক : সাংবাদিক

ৎিরঃবঃড়সঁশঁষ৩৬—মসধরষ.পড়স

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads