• সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান

সংরক্ষিত ছবি

মতামত

বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ

  • প্রকাশিত ০৭ আগস্ট ২০১৮

পৃথিবীর প্রতিটি জাতির একজন পিতা থাকে। যেমন ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী এবং পাকিস্তানের কায়দে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তেমনি বাঙালির জাতির পিতা হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রতিবিপ্লবী ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে কখনোই মেনে নিতে পারেনি। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক বঙ্গবন্ধুকে তারা নিশ্চিহ্ন করতে উদ্যত হয়েছিল দৈহিকভাবে। মুছে ফেলতে চেয়েছিল কোটি কোটি মানুষের হূদয় থেকে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু চিরঞ্জীব ও অমর। তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন ৫৫ হাজার বর্গমাইলের সবুজ শ্যামল এই গাঙ্গেয় বদ্বীপে।

বাংলাদেশের মতোই শাশ্বত চিরায়ত ও দেদীপ্যমান বঙ্গবন্ধুর অস্তিত্ব। বাংলাদেশকে মুছে ফেলতে পারলেও বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলা কিছুতেই সম্ভব নয়। এই সত্য বিস্মৃত হয়ে অপগন্ডের মতো যারা ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টায় লিপ্ত, তারা বাস্তবিকই করুণার পাত্র। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম না হলে পৃথিবীর বুকে হয়তো একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ পেতাম না আমরা। তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মানেই স্বাধীনতা, শেখ মুজিব মানেই বাংলাদেশ।

এ ইতিহাস কোনো খুনি রাজাকার আলবদর, কোনো ক্ষমতালোভী স্বৈরাচার ঘাতক অথবা কোনো ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীকে তৈরি করতে হবে না। আমরা যা দেখি, তা-ই ইতিহাস হতে পারে। সে ইতিহাসই সত্য ও নির্ভেজাল। আর সে ইতিহাসের কথা লিখতে গিয়ে ক্ষমতার মোহ নয়, আর্থিক লাভ নয়, শুধুই মানবিক কারণে লিখছি। লাখ লাখ মানুষের হত্যাযজ্ঞ আর মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। একাত্তরের বিভীষিকাময় গণহত্যার দিনগুলোতে আমরা হারিয়েছি সহায়-সম্পত্তি। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাতে কোনো মতানৈক্য, কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকতে পারে না। সেই দিনগুলোতে বাংলাদেশের জনগণ শেখ মুজিব ছাড়া আর কাউকে নেতা হিসেবে পায়নি এবং নেতা হিসেবে মানেনি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগ জনগণের পক্ষে নৌকা মার্কা নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। সেই দুঃসহ-দুর্দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবই ছিলেন জাতির নেতা ও নির্দেশনার একমাত্র অবলম্বন। ১৯৭১-এর ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে মুক্তিকামী লাখো মানুষের সামনে যে ভাষণ দিয়ে সমগ্র দেশবাসীকে উদ্দীপ্ত আর সংগ্রামী করেছিলেন, তিনি অন্য কেউ নন- তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম— জয় বাংলা।’ এ ধরনের তেজোদ্দীপ্ত বাণী কেউ সেদিন ছড়াতে পারেননি। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী যদি কোনো নেতাকে ভয় করে থাকে, তাহলে একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমানকেই করেছে। ১৯৭১ সালের সেই ভয়াবহ যুদ্ধের দিনে সারা পৃথিবীর পত্রপত্রিকা তথা বিশ্ব মিডিয়া বাংলাদেশের নরহত্যার ঘটনা উল্লেখ করে অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের কথা তুলে ধরেছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগানে জীবন বাজি রেখে সংগ্রাম করেছিল। সেদিন মুক্তিযোদ্ধা আর স্বাধীনতাকামী মানুষ স্লোগান তুলেছিল- তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব, জেলের তালা ভাঙব শেখ মুজিবকে আনব। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামে যে গানগুলো মানুষের মনে সাহস জুগিয়েছিল— যুদ্ধে যাওয়ার সে গানগুলো- ‘মুজিব বাইয়া যাওরে নির্যাতিত দেশের মাঝে জনগণের নাও ওরে মুজিব বাইয়া যাওরে’, ‘শোনো একটি মুজিবরের কণ্ঠ থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠ...’ ইত্যাদি আরো কত রকম সংগ্রামী গান লেখা হয়েছিল মুজিবকে ঘিরে। তারপরও কি বলে দিতে হবে কে স্বাধীনতার মহানায়ক? কে স্বাধীনতার ঘোষক? বাংলাদেশ নামক দেশটির প্রতিষ্ঠাতা কে? একটি দেশের জন্য, একটি জাতির জন্য, একটি ভাষার জন্য যে নেতা বছরের পর বছর জেল, জুলুম, নির্যাতন ভোগ করেছেন- তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সুতরাং বঙ্গবন্ধু ছাড়া বাংলাদেশের কোনো সঠিক ইতিহাস তৈরি হতে পারে না। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মহানায়ক ও ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু অপ্রিয় সত্য যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই বেঁচে থাকতে পারেননি, ঘাতকরা বেঁচে থাকতে দেয়নি। সেটার কারণ তার উদারতা ও অবিশ্বাস্য ভালোবাসা আর বিশ্বাস। তিনি জানতেন না শয়তান কখনো মানুষ হয় না। হায়েনারূপী পশুরা কখনো শ্রদ্ধা জানাতে জানে না। যার ফলে দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুদিন পরেই স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি ঘাতকচক্র বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধু নিজের জীবন দিয়ে বাংলাদেশ সৃষ্টি করলেও এখন বাংলাদেশের সর্বত্র অপরাজনীতিবিদদের ছড়াছড়ি। আমি বলতে চাই, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে কোনো বিতর্ক থাকতে পারে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবই বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা, স্বাধীনতার ঘোষক, বাংলা ভাষাভাষী মানুষের অবিসংবাদিত নেতা  ও সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি।

শতাব্দীর মহানায়ককে নিয়ে কিছু সমালোচক প্রশ্ন রাখেন, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার মতো ঝুঁকিপূর্ণ একটা কাজ করেও কী করে নিজের বাসভবনে অবস্থান করে পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পথ প্রশস্ত করেন ? তাদের মতে, উচিত ছিল ধরা না পড়ে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের নেতারা তো ধরা দেন না। নেতাজী সুভাষ বসু তো ধরা দেননি ইত্যাদি।

এর অনেক ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথম ব্যাখ্যা হচ্ছে, সে সময়কার জিওপলিটিক্যাল পরিস্থিতি। বঙ্গবন্ধু আশা করেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রশ্নে আমেরিকার সমর্থন পাওয়া যাবে। সেই মোতাবেক তিনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তদানীন্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস্ ফারল্যান্ড বঙ্গবন্ধুকে পরিষ্কার জানিয়ে দেন, এ ব্যাপারে আমেরিকা কোনো সহযোগিতা করবে না। বঙ্গবন্ধু তার সব নেতাকর্মীকে ভারতে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে তাদের জানিয়ে দিয়েছিলেন, ভারত ও রাশিয়ার সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছে। দেশ দুটি যথাসাধ্য সাহায্য ও সমর্থন জোগাবে। তিনি নিজে ভারতে যাননি আমেরিকা রেগে যাবে বলে। স্বাধীনতাকে কেন্দ্র করে বৃহৎ শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব হতে পারে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। তিনি যদি পাকিস্তানের হাতে বন্দি থাকেন, তাহলে আমেরিকা স্বাধীনতা যুুদ্ধে ভারত-রাশিয়ার  যড়যন্ত্র আবিষ্কার করবে না।

পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তানকে রক্ষার জন্য অগ্রসরমাণ সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরের মোহনায় এসেও হঠাৎ মোড় ঘুরিয়ে নেয় এবং তার বদলে ইয়াহিয়াকে সরিয়ে ভুট্টোকে ক্ষমতায় বসিয়ে বঙ্গবন্ধুকে কারামুক্ত করে বাংলাদেশে পাঠায়। মার্কিন প্রশাসনের শেষ ভরসা ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুই তার দেশকে ভারত-রাশিয়ার খপ্পর থেকে উদ্ধার করতে পারবেন। তাই পাকবাহিনীর হাতে গ্রেফতার বরণ ছিল বঙ্গবন্ধুর আরেকটি রাজনৈতিক কৌশল।

বঙ্গবন্ধুকে আটকের পর এই একটি প্রশ্নই ইয়াহিয়া খানকে দেশে-বিদেশে মোকাবেলা করতে হয়েছে। বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে পাকিস্তান সরকারকে। বঙ্গবন্ধু দিব্যদৃষ্টিতে আগেই বুঝতে পেরেছিলেন, তাই পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেননি। দেশ ও জনগণের জন্য হাসিমুখে মৃত্যুবরণ করার মতো মনোবল সবসময় পোষণ করতেন। মহাকালের খাতার পাতায় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শতাব্দীর মহানায়ক হিসেবে অমর ও অক্ষয় হয়ে থাকবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

 

লেখক :  স্থায়ী সদস্য, জাতীয় প্রেস ক্লাব

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads