• শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
অগ্রগতির জন্য কার্যপ্রণালি দরকার

সিস্টেম শব্দের আভিধানিক অর্থগুলোর দিকে নজর ফেরালে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে

আর্ট : ইন্টারনেট

মতামত

অগ্রগতির জন্য কার্যপ্রণালি দরকার

  • ইউসুফ শরীফ
  • প্রকাশিত ১০ আগস্ট ২০১৮

অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে জনগণের জীবনমান কীভাবে উন্নত করা যায়— এটা বহুল আলোচিত বিষয়। উন্নয়নশীল বা উন্নয়নগামী যে জাতি এ ব্যাপারে বাস্তবোচিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে এবং স্থিরপ্রতিজ্ঞ হয়ে সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন ঘটাতে পারে, সেই জাতিই সমৃদ্ধি অর্জনের পথে দ্রুত অগ্রসর হতে পারে। বাস্তবোচিত ক্ষেত্র নির্ধারণ প্রথম ধাপ, দ্বিতীয় ধাপ গবেষণা-পর্যালোচনা, তৃতীয় ধাপ পরিকল্পনা প্রণয়ন, চতুর্থ ধাপ কর্ম-প্রক্রিয়া নির্ধারণ এবং পঞ্চম ধাপ পরিকল্পনার সফল প্রয়োগের মাধ্যমে পণ্য বা সেবা যে ক্ষেত্রই হোক, তার মান-উন্নয়ন করা সম্ভব। এই পুরো বিষয় সমন্বিত করে একটি সিস্টেম (কার্যপ্রণালি) গড়ে তোলা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পূর্ণ ফল লাভ কখনো সম্ভব হয় না। সিস্টেম এজন্যই গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে সিস্টেম কী, কীভাবে তা গড়ে তুলে সফলভাবে পরিচালনা করা যায়— এসব স্পষ্ট না থাকায় এবং অভিনিবেশসহকারে তা করতে না পারায় অনেক চমৎকার উদ্যোগ-আয়োজনও শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে পড়তে পারে। চারদিকে নজর ফেরালে এরকম নজির কম লক্ষ করা যাবে না। সিস্টেম এমন কোনো বিষয় নয়, যা গড়ে তোলা এবং সক্রিয় রাখা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। সিস্টেম শব্দের আভিধানিক অর্থগুলোর দিকে নজর ফেরালে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে। অভিধানে সিস্টেমের অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে— ‘বিভিন্ন অংশ লইয়া গঠিত গোটা বস্তু, যৌগিক বস্তু’, ‘একই বস্তুর পরস্পরসম্বন্ধ অঙ্গরূপে পরিগণিত বস্তুসমূহ’, ‘পারস্পরিক আকর্ষণে পরিক্রমণরত গ্রহনক্ষত্রাবলি’, ‘দৈহিক গঠনতন্ত্র’, ‘তন্ত্র’, ‘সৃষ্টি রহস্য-সংক্রান্ত মতবাদ’, ‘প্রণালি, রীতি, নিয়ম’। এই সঙ্গে ‘সিস্টেমেটিক’-এর আভিধানিক অর্থটির প্রতি প্রসঙ্গক্রমে নজর দিলে দেখা যাবে এর অর্থ— ‘প্রণালী রীতি বা তৎসম্বন্ধীয় অথবা তৎসম্মত; নিয়মানুগ; নিয়মাবদ্ধ; সুসংবদ্ধ’। এরপর ব্যক্তিজীবন, সমাজজীবন— সবক্ষেত্রে সিস্টেমের গুরুত্ব বিশদ ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্বপ্রকৃতিও সিস্টেমে আবদ্ধ এবং সিস্টেমেই অবিরত আবর্তিত হয়ে চলছে— এ-ও নতুন কোনো কথা নয়। এরপর ব্যক্তিজীবন বা সমাজজীবনে সিস্টেম উপযুক্ত রূপে সক্রিয় থাকবে না, এটা কোনো সুখকর কথা নয়।

সিস্টেম না মানা এবং সিস্টেম মানা— এ দুটারই আংশিক নজির গত কয়েক দিনে লক্ষ করা গেছে। আর তাতে সেই বহুল এ কথাটিই যেন উচ্চারিত হয়েছে, ‘ইচ্ছা থাকিলে উপায় হয়’। সিস্টেম কার্যকর করার জন্য বিধি-বিধান যতটা প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি না হলেও ততটাই প্রয়োজন কোনো সিস্টেমের আওতাধীন সব বস্তুকে সমভাবে নিয়মাবদ্ধ করে সম-সক্রিয় করে তোলা এবং তা বিরামহীন রাখা। তা না হলে অর্থাৎ পরিপূর্ণভাবে বলবৎ করা না গেলে সিস্টেম কার্যকর করা এবং তা থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল লাভ নিঃসন্দেহে দুঃসাধ্য। সম্প্রতি গণপরিবহন নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে— বিগত সময়ে আমরাও একাধিকবার কিছু কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম। আজ এই সিস্টেম প্রসঙ্গেই অন্যদিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। সিস্টেম প্রসঙ্গে পণ্য কিংবা জনশক্তি রফতানির কথাই যদি ধরা যায়, তাহলে বলতে হবে শুরুতে যে পাঁচটি ধাপের কথা বলা হয়েছে, এক্ষেত্রে তারপর জরুরি বিষয় হলো— আমদানিকারক দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ মানে— দেন-দরবার ও দর কষাকষি অর্থাৎ বাণিজ্যিক কূটনৈতিক তৎপরতা পরিচালনা। শুরুতে উল্লিখিত প্রায় সব ধাপ সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হওয়ার পর যদি এই শেষ ধাপটিতে দুর্বলতা থাকে, তাহলে পুরো প্রক্রিয়াই বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং সাধারণত হয়ে যায়ও। আর এজন্যই দারুণ প্রতিযোগিতামূলক আজকের বিশ্বে আন্তর্জাতিক লেনদেনে সার্বিক কার্যকর প্রয়োগশৈলী আয়ত্ত করার বিকল্প নেই। কথাগুলো বলে নেওয়া দরকার এজন্য, শুধু সমালোচনার মধ্যে রাজনৈতিক ভেদ-বুদ্ধি থাকতে পারে, কিন্তু সার্বিক কল্যাণ-চিন্তা আছে, এটা প্রমাণ করা সহজ হওয়ার কথা নয়। যাহোক, সিস্টেম সফলভাবে প্রয়োগ করার জন্য আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং সম্পদ-শক্তির সম্ভাবনাকে সামনে রেখে শুরুতে কথিত পরিকল্পনা-কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হয়। বদনা বা গ্লাস থেকে হাতে পানি নিয়ে আঙুলে ছিটিয়ে ঘর ভেজানো যায় না, ঘর ভেজাতে হলে বালতি বা কলসি ভরা পানি ঢেলে দিতে হয়। এই শেষেরটি হলো সত্যিকার সমৃদ্ধির সূচক, প্রথমটি নয়। এই বাস্তবতা আমরা কতটা অনুসরণ করতে পারছি, তা বিবেচনার বিষয়। এই বিবেচনা যথাযথভাবে করা হচ্ছে কি না, এটা দেখাও জরুরি। কারণ সরকারি ও বিরোধী দুটি ধারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে সরে এসে একই সমতলে দাঁড়িয়ে জাতীয় স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারে না। এক দল যদি বলে অনেক কিছু হচ্ছে এবং আরেক দল তখন বলে কিছুই হচ্ছে না। আসলে কোনোটাই সত্য নয়, সত্য আছে এই দুয়ের মাঝখানে— যা কেউ বলতে বা স্বীকার করতে চান না। এই ঘেরাটোপের ঊর্ধ্বে ওঠা দরকার। বিগত বছরগুলোর বাস্তবতা যে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, এক কথায় তা নাকচ করে দেওয়া যাবে না। কারণ সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডই ঘটছে জনগণের চোখের সামনে। নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, বক্তব্য, আচরণ পরিহার করে প্রয়োজনে উন্নয়নের কর্মতৎপরতা কী করে আরো চৌকসভাবে সম্পন্ন করা যায় এবং কী করে পুরো প্রক্রিয়াকে সিস্টেম-লস ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে মুক্ত রাখা যায়, জাতীয় স্বার্থেই এসব বিষয়ে পরামর্শ রাখা যেতে পারে। তাতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে সমস্যা-সঙ্কট থেকে মুক্ত রাখা যায় এবং দেশ ও জনগণের কল্যাণও নির্বিঘ্ন থাকে। জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে— এ কথাটা গত এক যুগ ধরে বেশ শোনা যাচ্ছে। এ কথা পুরোটাই যেমন বানানো নয়, তেমনি হয়তো পুরোটাই সত্য নয়। সত্য হলো, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আংশিক বেড়েছে এবং তা গত কয়েক বছরে বদনা থেকে পানি ছিটানোর পর্যায় পার হতে শুরু করেছে। আর এই পানির জোগান আসছে তৈরি পোশাক রফতানিতে প্রাপ্ত আয় এবং জনশক্তি রফতানির মাধ্যমে প্রাপ্ত রেমিট্যান্স থেকে। এই দুই ক্ষেত্রে উদ্যোগ-আয়োজন মোটেই নেওয়া হয়নি, তা নয়। তারপরও এ কথাই বলতে হয়, প্রয়োজনের নিরিখে এই দুটি খাতের প্রতি যে পরিমাণ মনোযোগ, শ্রম-সাধনা এবং গবেষণা-উদ্যোগ প্রয়োগ করা উচিত ছিল— সেজন্য হয়তো আরো সময় অপেক্ষা করতে হবে। অথচ, বাস্তবতা হলো— বাংলাদেশের সামনে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মাধ্যমে উন্নয়নের সুযোগ বর্তমান আমলে আগেকার তুলনায় অনেক বেশি প্রশস্ত হয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রসর হতে হলে এই মুহূর্তে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে যতটুকু সুযোগ হাতের কাছে মজুত রয়েছে, সেসবের পরিপূর্ণ ব্যবহার করতে হবে এবং আরো সুযোগ সৃষ্টির অবিরাম প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে। এর মধ্য দিয়েই নতুন নতুন ক্ষেত্র বেরিয়ে আসবে, যার দ্বারা উন্নয়নশীল বাংলাদেশের ভিত্তি মজবুত হয়ে উঠবে। আমরা যদি জনশক্তি রফতানির কথাই ধরি, তাহলে কি বলতে পারব, এক্ষেত্রে সত্যিকার বর্ধনশীল কোনো পরিকল্পনা, কোনো শ্রম-সাধনাকে আমরা ব্যাপকভাবে যুক্ত করতে পেরেছি? আগেকার সরকারের আমলে বিভিন্ন সময়ে পত্র-পত্রিকায় এরকম খবর বেরিয়েছে, বৈধভাবে জনশক্তি প্রেরণে ধস নেমেছে, নতুন বাজার খুঁজতে তথ্যানুসন্ধান মিশন পাঠানো জরুরি। তখন সৌদি আরবসহ কোনো কোনো দেশ থেকে ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের’ যেভাবে ফেরত পাঠানো হয়েছিল তাতে বিদেশে বাংলাদেশি জনশক্তির যে ভাব-মর্যাদা তা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। আর এই ফেরত পাঠানোর ঘটনা তো নতুন নয়, বহু দিন ধরেই এটা চলেছে। আমরা কি এই পরিস্থিতি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পেরেছি? বাস্তবিক পক্ষে বেরিয়ে আসার জোরদার কোনো চেষ্টা চালানো হলে অবৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে লোক পাঠানো পুরোপুরি বন্ধ করা খুবই সম্ভব। বৈধভাবে জনশক্তি রফতানিতে যখনই ধস নামার উপক্রম হয়েছে, তখন এর পেছনে যে এই খাতে পরিকল্পনামাফিক উদ্যোগ-আয়োজন ও শ্রম-সাধনার অভাব রয়েছে তা অতীতে নানাভাবে আলোচিত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের হেলাফেলার জন্যই বিভিন্ন সময়ে জনশক্তি রফতানি উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাওয়ার ঘটনাও ঘটতে পেরেছে। এমনও দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে বৈধভাবে চাকরি নিয়ে যত লোক বিদেশে গেছে, তাদের মধ্যে ৬৯ ভাগই ছিল ‘ব্যক্তিভিসাধারী’। তখন জনশক্তি রফতানি সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে খবরে বলা হয়েছে, বৈধভাবে লোক পাঠানোর প্রক্রিয়া হ্রাস পেলেও অবৈধভাবে প্রতিমাসে বেশ ভালো সংখ্যায় লোক বিদেশে গেছে। এসব বিশেষ আশান্বিত হওয়ার মতো কোনো তথ্য ছিল না। সর্বোপরি অবৈধভাবে বিদেশে লোক পাঠিয়ে দেশের ভাব-মর্যাদা মারাত্মকভাবে নষ্ট করা হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশে গিয়ে একশ্রেণির শ্রমিক উচ্ছৃঙ্খল আচরণও করছে। আর এসবের কারণে আগে যেসব দেশে বাংলাদেশি জনশক্তির চাহিদা ছিল, সেসব দেশে চাহিদা কমে গেলে তো অবাক হওয়া যাবে না। এসব নেতিবাচক বিষয় যতটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হওয়া উচিত ছিল, তা হয়নি। জনশক্তি রফতানি বিষয়ে সরকারের তথ্য ও গবেষণা সেল, সুপারিশ প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন সেল থাকলে তা যথেষ্ট সক্রিয় হতে হবে। বিদেশে জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্র-অনুসন্ধান এবং দেশে উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা যেমন অপরিহার্য, তেমনি এই বিষয়টিও অপরিহার্য। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানির সুযোগ বেশি— এ কথা বারবার বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে জনশক্তি কতটা বেড়েছে, না বাড়লে কী কী কারণে বাড়ছে না— এটা খুঁজে বের করার কাজটি তথ্য-গবেষণা সেলের। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে বাংলাদেশ মিশন এক্ষেত্রে কতটা সাফল্যের সঙ্গে কাজ করতে পারছে এবং না পারলে কেন পারছে না— এসব বিষয়ের বিচার-বিশ্লেষণও যথাযথভাবে হওয়া দরকার। এভাবে জনশক্তি রফতানিবিষয়ক তাবৎ বিষয়-আশয় নখদর্পণে রাখা যায় এবং তার নিরিখেই কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। এজন্য সমন্বিত ও সক্রিয় সিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। তাহলে এই খাতকে মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো সম্ভব। আর দ্রুততার সঙ্গে তা না করা গেলে সময়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়া হবে। তাতে করে এক সময় সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। এই খাতে বাংলাদেশের যে বিশাল সম্ভাবনা ছিল, অতীতে তার ক্ষুদ্র অংশও বাস্তবায়িত করা যায়নি। কেননা, পুরো বিষয়টিকে অনেকটা মধ্যযুগীয় কায়দায় ব্যবহার করা হয়েছে, যা আজকের যুগে একেবারেই অচল।

লেখক : কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads