• বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
পোশাককর্মীদের ন্যায্য মজুরি দেওয়া উচিত

প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলারের এই শিল্পে ৪০ লাখের মতো পোশাককর্মী জড়িত, যাদের অধিকাংশই নারী

সংরক্ষিত ছবি

মতামত

পোশাককর্মীদের ন্যায্য মজুরি দেওয়া উচিত

  • প্রকাশিত ১২ আগস্ট ২০১৮

অর্থনীতির ভাষায় মজুরি দুই ধরনের, যথা— আর্থিক মজুরি এবং প্রকৃত মজুরি। কোনো নির্দিষ্ট সময়ে উৎপাদন কাজে নিয়োজিত থেকে একজন কর্মী যে অর্থ পান, তাকে আর্থিক মজুরি বলে। যেমন— কোনো কর্মী যদি দিনে ৫০০ টাকা আয় করেন তবে সেটি আর্থিক মজুরি। অন্যদিকে কোনো কর্মী কোনো নির্দিষ্ট সময়ে আর্থিক মজুরি দিয়ে যে পরিমাণ পণ্য ও সেবা ক্রয় করতে পারেন এবং অর্থ ছাড়াও যেসব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারেন, তাকে প্রকৃত মজুরি বলে। যেমন— ৫০০ টাকা আর্থিক মজুরির পাশাপাশি বিনামূল্যে বাসস্থান, যাতায়াত, চিকিৎসা সেবা পেয়ে থাকলে সেটি প্রকৃত মজুরির মধ্যে ধরা হয়। আইএলও কনভেনশনের ১৩১ নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘সর্বনিম্ন মজুরি অবশ্যই আইন দ্বারা নিশ্চিত করতে হবে। কর্মী ও তার পরিবারের প্রয়োজন, জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা ইত্যাদিকে বিবেচনায় নিয়ে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে।’ বিশ্ব মানবাধিকার ঘোষণায় বলা হয়েছে— ‘প্রত্যেক কর্মীর নিজের ও পরিবারের মানবিক মর্যাদা রক্ষায় সক্ষম এমন ন্যায্য পারিশ্রমিক পাওয়ার অধিকার রয়েছে।’ বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ নং অনুচ্ছেদে নাগরিকদের যুক্তিসঙ্গত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার বিষয়টি রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে বলা হয়েছে। আমাদের দেশে এর আগে তৈরি পোশাককর্মীদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০১৩ সালের ১ ডিসেম্বর। তিন হাজার টাকা মূল বেতন ধরে ৫ হাজার ৩০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি ঠিক করা হয়েছিল তখন। নতুন কাঠামোয় ওই বেতন তারা পাচ্ছেন ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলারের এই শিল্পে ৪০ লাখের মতো পোশাককর্মী জড়িত, যাদের অধিকাংশই নারী। একজন পোশাককর্মীর ৫ জনের একটি পরিবার চালাতে ‘জাতীয় খানা আয়-ব্যয় জরিপ’ অনুযায়ী খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবা কেনার ব্যয় মাসে ৯ হাজার ২৮০ টাকা। এই পরিমাণটিকে ভিত্তি ধরে পোশাককর্মীদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা উচিত। আমাদের দেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উপনীত হওয়ার পেছনে যাদের অবদান, তাদের যথাযথ খাদ্য, পানীয় চাহিদা মেটানোর মতো মজুরি নিশ্চিত করা পোশাক মালিকদের দায়িত্ব। তারা তাদের দায়িত্ব পালন করছেন সন্দেহ নেই। তবে আরেকটু যৌক্তিকভাবে বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

গত কয়েক বছরের মূল্যস্ফীতিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে শ্রমিক সংগঠনগুলো। তাদের দাবি, তৈরি পোশাক খাতের কর্মীদের ন্যূনতম বেতন হতে হবে ১৬ হাজার টাকা। যদিও তাদের এই দাবি থেকে সরে এসে কোনো কোনো সংগঠন ১২ হাজার টাকা করার কথাও বলেছে। কিন্তু পোশাক মালিকরা আগামী পাঁচ বছরের জন্য ৫ হাজার ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬ হাজার ৩৬০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। উভয় পক্ষের প্রস্তাবনায় বিরাট ফারাক লক্ষ করা যায়। সরকার ইতোমধ্যে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। মজুরি বোর্ডের কাজ দ্রুত শেষ করে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের দিকে পৌঁছবেন এটি সবার প্রত্যাশা। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বাংলাদেশের প্রকৃত জাতীয় আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৭০ শতাংশের বেশি, যেখানে ন্যূনতম মজুরির মাধ্যমে কর্মীদের প্রকৃত আয় বৃদ্ধি পেয়েছিল মাত্র ৪ শতাংশ। বিশ্বের ১৯৫টি দেশের মধ্যে ১৬০টিরও বেশি দেশে বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের নীতি প্রচলিত আছে। বলা বাহুল্য, সে নির্ধারণে পদ্ধতিগত ভিন্নতা আছে। শুধু গড় মূল্যস্ফীতি নয়, জাতীয় আয়ের গতিপ্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মজুরির ধারাবাহিক সমন্বয় সাধন সারা বিশ্বে একটি সাধারণভাবে প্রচলিত ও স্বীকৃত পদ্ধতি।

বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ হলেও আশ্চর্যজনকভাবে কম মজুরির ক্ষেত্রেও দ্বিতীয়। সবচেয়ে কম মজুরি পান শ্রীলঙ্কার পোশাককর্মীরা, তাদের মাসিক আয় ৬৬ ডলার। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ‘বৈশ্বিক পোশাক খাতে নিম্নতম মজুরি-২০১৫’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে পোশাককর্মীদের ন্যূনতম মজুরি এখন ৬৮ ডলার, ভারতে ৭৮, ইন্দোনেশিয়ায় ৯২, পাকিস্তানে ৯৯, কম্বোডিয়ায় ১২৮ ও মালয়েশিয়ায় ২২৫ ডলার। অন্যান্য শিল্প খাতের তুলনায় আমাদের দেশে তৈরি পোশাক শিল্প দ্রুত বর্ধনশীল। জিডিপিতে এই খাতের অবদানও তুলনামূলক বেশি। এই শিল্প থেকেই দেশের ৭৮ থেকে ৮০ ভাগ রফতানি আয় হয়। দেশের উল্লেখযোগ্য ১০টি শিল্প খাতের মধ্যে পোশাককর্মীদের মজুরিই তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কম। ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে গঠিত বিভিন্ন ন্যূনতম মজুরি বোর্ড ঘোষিত মজুরি কাঠামো অনুযায়ী, বর্তমানে নির্মাণশিল্প ও কাঠের কাজ করেন এমন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ৯ হাজার ৮৮২ টাকা। ট্যানারি শ্রমিকের সর্বনিম্ন মজুরি ৯ হাজার ৩০০ টাকা। তেল মিলের শ্রমিকের মজুরি সর্বনিম্ন ৭ হাজার ৪২০ টাকা। ব্যক্তিমালিকানাধীন সড়ক পরিবহনে ৬ হাজার ৩০০ টাকা, রি-রোলিং মিলে ৬ হাজার ১০০ টাকা, কোল্ড স্টোরেজে ৬ হাজার ৫০ টাকা, গ্লাস অ্যান্ড সিলিকেটস কারখানায় ৫ হাজার ৩০০ টাকা সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারিত আছে। এমনকি ধান ভাঙানোর চাতালে আধাদক্ষ শ্রমিকের মজুরিও এখন ৭ হাজার ১৪০ টাকা। সল্ট (লবণ) ক্রাশিং শিল্পে মজুরি ঘণ্টায় ২৬৫ টাকা। উল্লেখিত বিষয়গুলো বিবেচনাপূর্বক একটি গ্রহণযোগ্য মজুরি পোশাককর্মীরা আশা করতেই পারেন।  

একজন মানুষের কর্মদক্ষতা অনেকাংশে নির্ভর করে তার ক্যালরি গ্রহণের ওপর। যথাযথ ক্যালরি পেলে একজন মানুষ তার সর্বোচ্চটা দিতে পারে। আমাদের ক্রমবর্ধমান পোশাক শিল্পের জন্য এখন দক্ষ পোশাককর্মীর বেশ প্রয়োজন। তাদের দক্ষতা বাড়ানো আমাদের জন্য খুব বেশি কঠিন কাজ নয়। বেশিরভাগ তৈরি পোশাক কারখানার কাজের পরিবেশ এখন অনেক ভালো। তৈরি পোশাক কারখানার আয়ও পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি পেয়েছে। পোশাক খাতকে কর্মীবান্ধব করতে হলে পোশাককর্মীদের মুজরি একটা যৌক্তিক পর্যায়ে উন্নীত করা প্রয়োজন। পোশাককর্মীদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিলে কার্যত দেশের পোশাক শিল্প এবং পোশাক শিল্পের মালিকরা উপকৃত হবেন। দেশের মানুষের জীবনমান উন্নত হবে। শুধু টাকার অঙ্কে হিসাব না করে প্রকৃত অর্থে মানুষের সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর চিন্তা মালিক সম্প্রদায়ের মধ্যে থাকলে পোশাককর্মীদের মজুরি বাড়ানোর কাজটা অনেক সহজ হয়ে যাবে। আশা করি, সব পক্ষ (সরকার, পোশাক শিল্পের মালিক, পোশাককর্মী) মিলে একটা যৌক্তিক সমাধানের দিকে খুব দ্রুত পৌঁছতে আমরা সক্ষম হব।

আনোয়ার ফারুক তালুকদার

ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads