• মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫
ads
আন্দোলন : কোচিং ও গাইড বাণিজ্যের বিরুদ্ধে

জনসমর্থনযোগ্য ওই আন্দোলনটি শুরুতে ছিল একটি অরাজনৈতিক আন্দোলন

আর্ট : রাকিব

মতামত

আন্দোলন : কোচিং ও গাইড বাণিজ্যের বিরুদ্ধে

  • প্রকাশিত ১৩ আগস্ট ২০১৮

মূলত ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই শিক্ষার্থীরা দাবি আদায়ে সোচ্চার ছিলেন। স্বদেশি আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অগ্রণী ভূমিকা ছিল এক গৌরবান্বিত ইতিহাস। আর বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন; সে তো ইতিহাসের মধ্যে আরেক ইতিহাস। যে ইতিহাস সৃষ্টির ফলে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসের স্বীকৃতি অর্জন সম্ভব হয়েছে। বীজ বপন হয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধেরও। বিশ্বের দরবারে আমরা গৌরবান্বিত বোধ করছি তাই। সেই ধারাবাহিকতায় দেশের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে রাজপথে নেমেছেন। ঘটিয়েছেন স্বৈরসরকারের পতন। নব্বইয়ের সেই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল ব্যাপক প্রশংসনীয়। আমরা দেখেছি তখন শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী স্বৈরসরকারের অনিবার্য পতন।

যাই হোক, ছাত্র আন্দোলনের সফলতার কথাই তুলে ধরার চেষ্টা করছিলাম। ফিরে আসছি সেই প্রসঙ্গে আবার। আমরা দেখে আসছি যুগ যুগ ধরেই ছাত্র আন্দোলনের সফলতা। এবারের আন্দোলনেও দেখেছি তদ্রূপ। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া স্কুল-কলেজে পড়ুয়াদের অন্দোলনের কথা বলছি। যার সফলতা এসেছে খুবই দ্রুত। আন্দোলনের দুই-তিন দিনের মধ্যেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাদের দাবিদাওয়া মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। তা হচ্ছে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কয়েকটি প্রশংসনীয় উদ্যোগের মধ্যে অন্যতম একটি। আমরা দেখেছি এবারের ছাত্র আন্দোলনটি একটু ভিন্ন ধরনের ছিল। বলা যায়, দেশের ইতিহাসে এটি একটি বিরল ঘটনা। সড়ক দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে এবং যানবাহনের নৈরাজ্যের ফলে নিরাপদ সড়কের দাবিতে সোচ্চার হয়ে কিশোর শিক্ষার্থীরা অন্দোলনে নেমেছে। যে আন্দোলনের প্রথম দু’দিন সর্বস্তরের মানুষের ব্যাপক সমর্থনও পেয়েছে তারা। ফলে আন্দোলন বেগবান হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ দাবির প্রেক্ষিতে জনদুর্ভোগ নেমে এলেও রাজধানীবাসী তা মেনে নিয়েছেন; সমর্থন করেছেন স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের। শিক্ষার্থীরা যৌক্তিক দাবির প্রতিফলন ঘটাতে রাস্তায় নেমে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নিয়ে দেশবাসীকে দেখিয়ে দিয়েছে যানবাহন সেক্টরের অনিয়মের রকমফের। যাতে করে প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে সক্ষম হয়েছে ওরা।

জনসমর্থনযোগ্য ওই আন্দোলনটি শুরুতে ছিল একটি অরাজনৈতিক আন্দোলন। নৌপরিবহন মন্ত্রীর বেফাঁস মন্তব্যে এবং বাস-ট্রাক কিংবা বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের নৈরাজ্য ঠেকাতে এ আন্দোলন অনেক গতি পেয়েছিল ভিন্নমাত্রায়। কিন্তু সেই আন্দোলন অপশক্তির ছোঁয়ায় মূলধারা থেকে গড়িয়ে গিয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়েছে ওদের আদর্শ বিসর্জন দিতে, যা তারা বুঝতে সক্ষম হয়নি মোটেও।

শুরুতেই আমরা দেখেছি যানবাহনের নৈরাজ্য ঠেকাতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে নিজেরাই নৈরাজ্য শুরু করে দিয়েছে। লাঠিসোটা হাতে নিয়ে, যানবাহন ভাঙচুরের পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বও পালন করেছে। অর্থাৎ নৈরাজ্যের প্রতিকার চাইতে গিয়ে নিজেরাও নৈরাজ্য কায়েম করেছে। ড্রাইভিং লাইসেন্স তল্লাশির পাশাপাশি খিস্তিখেউড়ও ছুড়েছে। অভদ্র ভাষায় কত কি প্ল্যাকার্ডে লিখে জনসম্মুখে তা মেলে ধরেছে। তারপরও সরকার যথেষ্ট ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে, তাদের বিভিন্নভাবে মোটিভেশন করার চেষ্টা করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দুর্ঘটনাকবলিত দুটি পরিবারকে ২০ লাখ টাকা করে সঞ্চয়পত্র সহায়তা করেছেন। শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিশ্রুত পাঁচটি বাসও দিয়েছেন। গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান বাসগুলো ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড স্কুল ও কলেজের প্রধানের কাছে হস্তান্তরও করেছেন। অর্থাৎ তড়িৎগতিতে দাবি পূরণের উদ্যোগ নিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। ক্ষমা চেয়েছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী। তিনি বাস চাপাপড়া শিক্ষার্থীদের বাসায় গিয়ে সমবেদনা জানিয়েও এসেছেন। যদিও সেই সমবেদনাটি তিনি আগে জানালেই পারতেন। তাহলে হয়তো এত ঘটনার মুখোমুখি হতে হতো না সরকারকে। পুলিশের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ির কারণে ডিএমপি কমিশনার লজ্জিত হলেন। শিক্ষার্থীদের প্রশংসা করে তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি স্যালুট জানালেন তিনি। তার পরও শিক্ষার্থীরা রাজপথে সমবেত হয়ে জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলতে লাগল। সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে কারো কারো হাতিয়ার হয়ে গেলেও তা বুঝতে সক্ষম হয়নি কোমলমতিরা। কারণ ওদের কচি মাথায় অপশক্তির এতসব কূটচাল ধারণের ক্ষমতা রাখে না। ফলে ওরা বিচ্যুত হয়ে পড়ছে জনসমর্থন থেকে। যেই আন্দোলনের প্রথম দিকে সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন ছিল ব্যাপক। কিন্তু যখনই ওরা ভিন্নভাবে প্রভাবিত হয়ে রাজপথ দখলের জন্য মরিয়া হয়ে উঠল, তখন আর ওদের শিশু-কিশোর হিসেবে ভাবতে পারেনি সর্বসাধারণ। ওরা রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, যা নিজেরা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি। ইতোমধ্যে ঘটে গেছে বহু ধরনের ঘটনা। যেই ঘটনার আড়ালের ঘটনায় রোম শিউরে উঠেছে আমাদেরও। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে বস্তির ছেলেরাও। কিশোরদের বিপথগামী করতে নানান কিচ্ছা কাহিনী বানানো হয়েছে। গুজব ছড়ানো হয়েছে। তাতে করে ওরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ওরা সরকার পরিবর্তন নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। অর্থাৎ শিশু-কিশোরসুলভ আচরণ থেকে বেরিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। রাজনৈতিক নেতাদের মতো বলছে, ‘নয় দফা না মানলে এক দফা।’

শিক্ষার্থীদের সেই দাবিতে আমরা হতবাক না হয়ে পারলাম না। কী বলছে কোমলমতিরা! ওরা প্রাপ্তবয়স্কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। ফলে শারীরিক নির্যাতনের শিকারও হতে হয়েছে। সেই নির্যাতন থেকে বাদ পড়েনি গণমাধ্যমকর্মীরাও। যা ছিল সত্যিই দুঃখজনক ঘটনা।

শিক্ষার্থীদের মারমুখী আচরণে নিরপেক্ষ ভীতসন্ত্রস্ত সর্বসাধারণের সুর পাল্টে গেছে মুহূর্তেই। এবার ক্ষিপ্ত হয়ে সর্বসাধারণ বলতে লাগলেন, ‘তোমরা যদি এতই পার, তবে কেন নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলনি। অতিরিক্ত টিউশন ফি, গাইড বাণিজ্য, কোচিং বাণিজ্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওনি কেন? ধর্ষক শিক্ষকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারনি কেন? সোচ্চার হওনি কেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মাদকমুক্ত করতে? ওই আন্দোলনটিই তোমাদের জন্য শ্রেয়। তোমরা সরকার পতনের চিন্তা করছ কেন; সে তো তোমাদের কাজ নয়।’

নিরপেক্ষ ভীতসন্ত্রস্ত সর্বসাধারণের যৌক্তিক পরামর্শে আমরাও ভাবিত হলাম। ঠিকই বলছেন তারা, যানবাহনের নৈরাজ্য সরকার দেখবে; আশ্বাসও দিয়েছে সরকার। সড়ক ও পরিবহন আইনের খসড়াও করেছে সরকার। কাজেই তোমাদের আরো সংযত হওয়া উচিত ছিল বলে মনে করছি আমরা। বড্ড বাড়াবাড়ি করে ফেলেছ তোমরা। তাই বলছি, অনেক হয়েছে, এবার অভিভাবকের অর্থ সাশ্রয়ের বিষয়টি ভাবনায় আন। বেসরকারি স্কুল-কলেজ-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও। বিশেষ করে সাজেশন বিক্রি, কোচিং এবং গাইড বাণিজ্যের প্রতিকার চাও। নির্দিষ্ট শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট না পড়লে নাজেহালের শিকার হতে হয়; তার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোল। তাহলে সর্বসাধারণ তোমাদের সঙ্গে থাকবে; থাকবে সরকারও। কারণ বর্তমান সরকার শিক্ষাবান্ধব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনিয়ম সরকার বরদাস্ত করবে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে সর্বদাই সোচ্চার। কাজেই আমরা বলতে পারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলে সর্বস্তরের মানুষের পাশাপাশি পাবে সরকারের সহায়তাও। তবে জেনে রেখ, সেই আন্দোলন যেন না হয় আবার ভাঙচুরের আন্দোলন। খেয়াল রাখতে হবে সেই আন্দোলনে যেন রাজনীতির রশ্মি না লাগে। সে দিকটায় সজাগ থেকে আন্দোলন করতে পারলে তোমরা কামিয়াবি হবেই।

আলম শাইন

বন্যপ্রাণী বিশারদ

alamshine@gmail.com

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads