• সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
কিশোর অপরাধ নিয়ে কিছু কথা

বিখ্যাতদের এসব দেখতেও হয় না, ভাবতেও হয় না

সংগৃহীত ছবি

মতামত

কিশোর অপরাধ নিয়ে কিছু কথা

  • প্রকাশিত ১৭ আগস্ট ২০১৮

নিজের দেখা একটি ঘটনার বর্ণনায় লেখাটি শুরু করতে চাই। গত পরশু প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছি। সকাল সাড়ে সাতটা বাজে। পার্কের সামনে একটি অটো টেম্পো থেকে ছয় ছেলেমেয়ে নামল আমার সামনেই। এত সকালে পার্কের সামনে কিশোর-কিশোরীদের দেখে মনে সন্দেহ জাগল। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম তাদের আগমনের কারণ। একটি মেয়ে উত্তর দিল তার আজ জন্মদিন, তাই তারা পার্কে জন্মদিন উদযাপন করবে। লক্ষ করলাম কারো হাতেই জন্মদিনের কেক, ফুল কিছুই নেই। সবার পিঠে স্কুলব্যাগ। সেই কিশোরীকে জিজ্ঞেস করলাম, জন্মদিনের কেক কোথায়, আর তোমার বাবা-মা কি জানে তুমি পার্কে জন্মদিন পালন করতে এসেছ? কিশোর-কিশোরীরা আর কোনো কথা না বলে পার্কের ভেতরে ঢুকে পড়ল। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। নিশ্চয়ই কিশোর-কিশোরীরা বাড়িতে কোচিং বা প্রাইভেট পড়ার কথা বলে এসেছে। এত সকালে তারা কেন পার্কে এলো? একবার ভাবলাম পুলিশকে খবর দিই। আবার ভাবলাম, আমি অকিঞ্চিৎকর একজন মানুষ। বিখ্যাত কেউ নই। বিখ্যাতদের এসব দেখতেও হয় না, ভাবতেও হয় না। তারপরও নিজেকে অপরাধী মনে হলো? এ কোন সর্বনাশা সময় এলো? কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে আজকাল পার্কের ভেতরের অনেক আপত্তিকর ছবি, খবর বের হচ্ছে।

বিশ্বকবি রবীন্দনাথ ঠাকুর বলেছেন, তেরো-চৌদ্দ বছর বয়সের বালকদের নিয়ে সমস্যার অন্ত নাই। যে কিশোরদের নিয়ে আমরা নতুন স্বপ্ন দেখব, যে তরুণদের নিয়ে আমরা আশায় বুক বাঁধব, সেই কিশোররা নানা রকম অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। যে পরিবারে এখন একটি-দুটি কিশোর-তরুণ আছে, সেই পরিবারের পিতা-মাতা বেশিরভাগ সময় সন্তানকে নিয়ে নানা শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। প্রতিদিনের সংবাদপত্রের পাতায় কিশোরদের নানা রকম অপরাধপ্রবণতার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। আবার কিশোর অপরাধের ধরনও পাল্টাচ্ছে। নানা ধরনের ভয়াবহ সব অপরাধ সংঘটিত হতে দেখছি অনেক কিশোরের দ্বারা। অথচ কত কষ্ট করে একজন পিতা-মাতা তার সন্তানকে শিশুবয়স থেকে সযত্নে লালন-পালন করেন। সেই সন্তানকে ঘিরে প্রত্যেক বাবা-মায়ের সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন থাকে। বাবা-মায়ের সেসব স্বপ্ন কোনো কোনো সন্তান কিশোর বয়সেই ভেঙে দিচ্ছে। নানা অপরাধে তারা জড়িয়ে পড়ছে, নেশায় আক্রান্ত হচ্ছে, জেলে যাচ্ছে। এক কিশোর বন্ধু আরেক কিশোর বন্ধুকে খুন করছে। একটি সম্ভাবনাময় জীবন জেলখানার চার দেয়ালে বন্দি হয়ে পড়ছে সারা জীবনের জন্য। লজ্জায়, ঘৃণায় সমাজে মুখ দেখাতে পারছেন না সেই বিপথগামী সন্তানের বাবা-মা। এ কেমন সর্বনাশা সময় এলো? কেন এমন হচ্ছে? কেন এমন হয়?

ইতিহাস সাক্ষী, আমাদের অনেক কিশোর হাজারো মুক্তিকামী যোদ্ধার মতো একাত্তরে পাকিস্তানি শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়েছে, প্রাণ দিয়েছে। সত্তর এমনকি আশির দশক পর্যন্ত  কিশোর-তরুণদের নিয়ে শঙ্কিত হতে হয়নি। সে সময়ের একটি কিশোরের স্বভাব, আচরণ, মেধা, বুদ্ধি, বিবেচনা ভালো ছিল। বিদ্যালয়, গৃহে সে সময়ের কিশোররা শিক্ষক, বাবা-মাকে শ্রদ্ধা করেছে। অভিভাবকদের কিশোর সন্তান নিয়ে তেমন উদ্বিগ্ন হতে হয়নি। সময় বদলেছে। সেই সঙ্গে বদলেছে কিশোরদের আচরণ। ঘরে-বাইরে অনেকেই হয়ে পড়েছে বেপরোয়া। বাবা-মায়ের সঙ্গে অতি সামান্য বিষয় নিয়ে তর্ক করছে, ঝগড়া করছে। দেড়, দুইদিন অভিমান করে না খেয়ে থাকছে। অনেক কিশোরের চুলের স্টাইল, পোশাকের স্টাইল, আচরণ অনেকটাই আপত্তিকর। সবাই না, তারপরও কিছু কিছু কিশোরের প্রায় সারাক্ষণ পিঠে থাকে ব্যাগ, হাতে দামি মোবাইল। এদের শার্টের বোতাম থাকে খোলা, কোয়ার্টার প্যান্ট পরে সারা শহর নির্দ্বিধায় ঘুরে বেড়ায়। যেহেতু কোচিং, প্রাইভেটের সময় বলতে কিছু নেই, স্বাভাবিকভাবে রাত আটটা-নয়টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা কোচিং করছে। আড্ডা মারছে, বাসায় ফিরছে রাত দশটায়। এরপর সে কি পড়াশোনা করবে ঘরে? কারণ ঘরে ফিরবে সে ক্লান্ত দেহে। এরপর ঘরে ফিরে ভারতীয় সিরিয়াল অথবা কিশোররা ফেসবুকে ডুবে যায়। ভার্চুয়াল সুখের অন্বেষায় অনেকে একসময় ধূমপানে আসক্ত হয়। একজন মেয়েবন্ধু অথবা একজন প্রেমিকাবিহীন জীবনকে অর্থহীন ভাবতে থাকে অনেক কিশোর, তরুণ। এই কিশোরদের অনেকে সবকিছুর মধ্যে ‘পাওয়াটা’কে বড় করে দেখে। সবক্ষেত্রে সে নিজেকে হিরো ভাবতে থাকে। কেউ তার প্রতিদ্বন্দ্বী হোক সেটি সে চায় না। বাবা-মায়ের অজান্তে অনেক কিশোরের হাতে হালকা অস্ত্র এখন। সামান্য স্বার্থের ব্যাঘাত ঘটলে সে ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে ক্ষমা করছে না। বুকে ছুরি বসিয়ে দিচ্ছে।

কিশোর অপরাধের ধরন পাল্টাচ্ছে। একসময় কোনো কোনো কিশোর-তরুণ অভিমান করে ঘর পালানোর মতো কাজ করত। সে অধ্যায় গত হয়ে গেছে। এখন শুনতে বা লিখতে খারাপ লাগলেও অনেক কিশোর খুন, মাদক, ধর্ষণের মতো ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। সিগারেট থেকে শুরু করে নানা নেশায় আসক্ত হচ্ছে তারা। সারা রাত ফেসবুকে ডুবে থাকে অনেকে। যারা এ কাজগুলো করছে, তাদের মধ্যে দরিদ্র পরিবারের সদস্য যেমন আছে, আছে উচ্চবিত্ত ঘরের কিশোররাও।

দেশের দুই কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সেখানে থাকা কিশোরদের ২০ শতাংশ খুনের মামলার আর ২৪ শতাংশ নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার আসামি। নারী ও শিশু নির্যাতন মামলাগুলোর বেশিরভাগই ধর্ষণের অভিযোগে করা।

বাংলাদেশের ২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী, ৯ থেকে ১৮ বছরের কোনো ছেলেশিশু অপরাধে জড়ালে তাদের গাজীপুরের টঙ্গী ও যশোরের পুলেরহাটের কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে রাখা হয়। বর্তমানে ওই দুটি কেন্দ্রে হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, তথ্যপ্রযুক্তি ও পর্নোগ্রাফি আইন, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক, অস্ত্র ও বিস্ফোরক মামলার মতো মারাত্মক ধরনের কিশোর অপরাধী আছে।

জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ এবং আমাদের দেশের ২০১৩ সালের শিশু আইন বলে, ৯ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা যদি কোনো অপরাধ করে, তাহলে তাদের সাধারণ কারাগারে পাঠানো যাবে না। বড়দের মতো তাদের বিচার করে শাস্তি দেওয়া যাবে না। তাদের ‘উন্নয়ন কেন্দ্র’ নামের একধরনের প্রতিষ্ঠানে আটকে রাখতে হবে, সেখানে তাদের মানসিকভাবে ‘শোধন’ করার ব্যবস্থা থাকবে। 

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, পরিচর্যার অভাব, মৌলিক চাহিদা পূরণ না হওয়া, স্যাটেলাইট চ্যানেল, ইন্টারনেটের অপব্যবহারসহ বেশকিছু কারণ রয়েছে। অনেক বাবা-মা আছেন, সন্তান কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে, ইন্টারনেটে কী দেখছে, সে সম্পর্কে তারা খোঁজখবর রাখেন না। ফলে সন্তান বিপথগামী হচ্ছে।

সর্বশেষ যেটি বলা যায়, আমাদের যার যার অবস্থানে থেকে আমাদের সন্তানদের প্রতি সুদৃষ্টি দিতে হবে। কিশোর বয়সী সন্তানটি কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, তার বন্ধুদের স্বভাব-চরিত্র খারাপ কি-না ইত্যাদি লক্ষ করতে হবে।

আ ব ম রবিউল ইসলাম

শিক্ষক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads