• বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads

মতামত

উই ওয়ান্ট জাস্টিস

  • মহিউদ্দিন খান মোহন
  • প্রকাশিত ১৮ আগস্ট ২০১৮

তিনটি শব্দের একটি ছোট্ট বাক্য। যা শিশুদের সাম্প্রতিক আন্দোলনে স্লোগান হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে, তার ব্যাপ্তি ও তাৎপর্য যে কত বড় তা ভেবে দেখার মতো। বাসচাপায় সহপাঠীদের করুণ মৃত্যু শিশুদের করে তুলেছিল বিক্ষুব্ধ। তারা সেটাকে হত্যা হিসেবে অভিহিত করে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছিল। নেমে এসেছিল রাজপথে। উচ্চকিত হয়েছিল সহপাঠীদের হত্যার বিচার এবং সড়কে চলা নৈরাজ্য বন্ধ করার দাবিতে। তাদের সে স্লোগানটি ছিল, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’-আমরা ন্যায়বিচার চাই। তাদের এ স্লোগান আপাত দৃষ্টিতে রাজীব-দিয়ার মৃত্যুর বিচার দাবি মনে হলেও তা যে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অসঙ্গতির প্রতিবাদ, একটু চিন্তা করলেই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, আমাদের সমাজে বর্তমানে অন্যায়-অবিচারের আগ্রাসন চলছে। আর সে আগ্রাসনের শিকার হয়ে সমাজের দুর্বল মানুষগুলো হাঁসফাঁস করছে। সবল দুর্বলের ওপর অত্যাচার করছে, কিন্তু দেখার কেউ নেই। এমনকি বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো সাজা পাওয়ার নজিরের অভাব নেই। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে হত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়নের খবর প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু সেগুলোর কয়টির বিচার হচ্ছে তা কেউ জানে না। এর মধ্যে যেগুলো গণমাধ্যমের সুবাদে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে, জানাজানি হয়ে যায়, সেগুলো নিয়ে হইচই হয় এবং নিন্দা-প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। তখন তা কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ে, অপরাধী যাতে ছাড়া না পায় তার কঠোর নির্দেশ আসে ওপর থেকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যায় নানা কৌশলে।

বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে বলে একটি কথা চালু আছে আমাদের সমাজে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে নীরবে-নিভৃতে নয়, বিচারের বাণী যেন চিৎকার করে কেঁদেই তার অসহায়ত্বের জানান দিচ্ছে। এখন বিচার চাইতে গেলে অপরাধী হতে হয়, হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে গুম হয়ে যেতে হয়। কন্যার ধর্ষণের বিচার চেয়ে লাঞ্ছিত হয়ে কন্যাসহ পিতাকে আত্মহননের পথ বেছে নিতে হয়।

আইনের হাত অনেক লম্বা এবং বিচারের হাত অত্যন্ত শক্ত- এমন একটি আপ্তবাক্য আমাদের সবারই জানা। কিন্তু বাস্তবে তার কোনো নিদর্শন আমরা কি দেখতে পাই? বরং আইনের হাতের চেয়ে অপরাধীর হাতের দৈর্ঘ্য অনেক বেশি- এমন নজির প্রতিনিয়তই স্থাপিত হচ্ছে। আর বিচার? সে তো দীর্ঘ প্রক্রিয়া আর নানা প্রতিবন্ধকতা পেরুনো পরের ব্যাপার। আইনের বন্ধুর পথ পেরুতে পারলেই না বিচারের দোরগোড়ায় পৌঁছানো যাবে! আইন এবং বিচার পরস্পর সম্পর্কীয় বিষয়। একটি আরেকটির সঙ্গে সম্পর্কিত। অপরাধীকে শনাক্ত করে আইন, তারপর তাকে তুলে দেওয়া হয় বিচারের হাতে। যেখানে আইনের সঠিক প্রয়োগ নেই, ক্ষেত্র বিশেষে হাত গুটিয়ে থাকে, সেখানে বিচারের বাণীর না কেঁদে উপায় আছে কি?

একটু পেছনের দিকে যাই। মডেল তিন্নির কথা মনে থাকার কথা সবারই। আজ থেকে প্রায় পনের বছর আগে সে খুন হলো নৃশংসভাবে। হতভাগ্য মেয়েটির লাশ পাওয়া গিয়েছিল পোস্তগোলা বুড়িগঙ্গা সেতুর নিচে। তোলপাড় হলো সে সময় ওই হত্যাকাণ্ড নিয়ে। ব্যাপক তদন্ত হলো। শেষে বেরিয়ে এলো থলের বিড়াল। পরিচয় পাওয়া গেল হত্যাকারীর। দুর্ভাগ্যক্রমে তিনি ছিলেন একজন আইন প্রণেতা। ততক্ষণে তিনি পগারপার। দেশ ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশে। আর মডেল তিন্নি হত্যার বিচার প্রক্রিয়াও চলে গেছে হিমঘরে। ওটা আর কোনো দিন উষ্ণতার পরশ পেয়ে সচল হবে কিনা কেউ বলতে পারে না।

সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড। অর্ধ যুগ পার হয়ে গেছে, কিন্তু সে রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের তদন্তই শেষ হয়নি। বিচার শুরু হওয়া তো দূর কি বাত! কতবার তাদের লাশ কবর থেকে তোলা হলো, একাধিকবার পোস্টমর্টেম হলো, ডিএনএ টেস্ট হলো, কিন্তু খুনিদের এখনো পর্যন্ত শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। সাগর-রুনি দম্পতির একমাত্র সন্তান মেঘ। তারা যখন খুন হন মেঘের বয়স খুবই কম। মৃত্যু কি সে হয়তো বুঝত না। তার বাবা-মা যে আর ফিরে আসবে না, সেটা হয়তো সে তখন উপলব্ধি করতে পারেনি। এখন সে নিশ্চয় জানতে পেরেছে, তার বাবা-মাকে হত্যা করা হয়েছে। বাবা-মাকে হারানোর বেদনাও সে হয়তো এখন অনুভব করছে। শুধু জানতে পারছে না, কারা তাকে শিশু অবস্থায় এতিম করেছে, চিরবঞ্চিত করেছে বাবা-মায়ের আদর স্নেহ থেকে। কোনোদিন তা জানতে পারবে কি না তাও সন্দেহ। অথচ সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের পর সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল হত্যাকারীদের ধরে বিচারের আওতায় আনার। দেশবাসী আশ্বস্ত হয়েছিল, কিন্তু সে আশ্বাসের বাস্তবায়ন আজো হয়নি। ওই হত্যাকারীরা আজো অধরা থেকে গেছে। অপরাধ তদন্ত বিশেষজ্ঞরা বলেন, যেকোনো খুনের ঘটনায় খুনি তার মনের অজান্তেই একটা না একটা ক্লু রেখে যায়, যার সূত্র ধরে খুনিকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। সাগর-রুনির খুনিরা কি তাও রেখে যায়নি? কে জানে কী রহস্য রয়েছে এর পেছনে!

কুমিল্লার ভাগ্যাহত তরুণী সোহাগী জাহান তনু। নির্মমভাবে খুন হলো সেখানকার একটি স্পর্শকাতর এলাকায়। একটি অত্যন্ত নিরাপদ ও সংরক্ষিত এলাকায় সংঘটিত এ খুনের ঘটনা দেশবাসীর মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। তবে যেভাবে তদন্ত শুরু হয়েছিল, তাতে সবাই ধরে নিয়েছিলেন যে, ওই খুনের হোতারা ধরা পড়বে অচিরেই। বেরিয়ে আসবে এক নিরপরাধ তরুণীর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কাহিনী। কিন্তু সে ঘটনাও এখনো পর্যন্ত রয়ে গেছে রহস্যময় মেঘের আড়ালে। সে মেঘ সরবে কিনা কে জানে! 

এমন অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে। তাতে শুধু নিবন্ধের কলেবরই বৃদ্ধি পাবে। আমাদের সমাজ আজ বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম, অত্যাচার, অনাচারের বেড়াজালে বন্দি। নিরীহ শান্তিপ্রিয় মানুষেরা নিজেদের জীবন ও সম্পদ নিয়ে মুখবুজে সবকিছু সহ্য করে যাচ্ছে। না করে তো উপায় নেই। কার কাছে যাবে সে বিচার চাইতে? পাড়ার যে বখাটে ছেলেটা তরুণী মেয়েটিকে প্রতিনিয়ত উত্ত্যক্ত করছে, ওর বিরুদ্ধে কার কাছে নালিশ করবে তার বাবা? ওই বখাটের আছে ‘বড়ভাই’, যে তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়, বিপদে রক্ষা করে। কিন্তু ওই তরুণীর পিতার যে কেউ নেই! তাকে সাহায্য করবে কে? প্রতিকার চাওয়ারও কোনো জায়গা তার নেই। যাদের কাছে প্রতিকার চাইবে তারা যে ওই অপরাধীদের ছায়াবৃক্ষ! বিপদে আপদে তারাই যে সহায় ওই দুষ্কৃতকারীদের। পারস্পরিক স্বার্থের কারণে এরা একে অপরের ‘মাসতুতো ভাই’।

অনেকে বলে থাকেন আমাদের সমাজে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির কারণ অপরাধের বিচার না হওয়া। কথাটি অমূলক নয়। তবে বেশিরভাগ সময় অপরাধীরা পার পেয়ে যায় প্রয়োজনীয় সাক্ষীর অভাবে। চোখের সামনে অপরাধ সংঘটিত হতে দেখেও কেউ সাক্ষী হতে চায় না। বলাই বাহুল্য, নিরাপত্তাজনিত কারণেই কেউ অপরাধ সংক্রান্ত মামলার সাক্ষী হতে চায় না। কারণ তারা জানে, আইনের ফাঁকফোকর গলে অপরাধী বেরিয়ে এসেই সাক্ষী হওয়ার অপরাধে তার ওপর প্রতিশোধ নেবে। আর সেজন্যই চোখের সামনে খুন হতে দেখেও সবাই চোখবুজে থাকতে চায়।

বর্তমানে আমাদের দেশে যে পরিবেশ বিরাজ করছে তাকে স্বাভাবিক বলার সুযোগ কম। অরাজকতা গ্রাস করেছে গোটা সমাজকে। যেকোনো ঘটনার গায়ে রাজনীতির রঙ চড়িয়ে ফায়দা লুটতে ব্যস্ত আমাদের ‘শ্রদ্ধেয়’ রাজনীতিকরা। কিন্তু তারা এ বিষয়টি ভেবে দেখেন না যে, আজ সরকারে না থাকার কারণে তিনি যা বলছেন বা করছেন, কাল সরকারে গেলে তাকেও এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। আবার ক্ষমতাসীনরা বোঝেন না যে, কাল যদি তারা বিরোধী দলে যান, তাহলে আজ বিরোধী দল যে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে, তাদেরও সে পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে। দেশে আজ যে বিচারহীনতার পরিবেশ বিরাজ করছে এর দায় কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না। আর এর জন্য আমাদের রাজনীতিকদের দায় বেশি। তারা সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে কখনো কখনো এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন যে, ন্যায়-অন্যায় পার্থক্য করার ফুরসত পান না। আর এ সুযোগটি গ্রহণ করে অন্যরা। তারাও রাজনৈতিক ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়ে দুর্নীতি-অপরাধে প্রবৃত্ত হয় নির্ভাবনায়। বলা বাহুল্য, এ অবস্থা কোনো সুস্থ সমাজের নিদর্শন নয়। আমরা যে একটি অসুস্থ সমাজে ততোধিক অসুস্থ মানসিকতা নিয়ে বসবাস করছি তা প্রতিনিয়ত সংঘটিত ঘটনাবলি থেকেই অনুমান করা সম্ভব। আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আমাদের ব্যর্থতাই যে এ পরিস্থিতি সৃষ্টির মূলে সেটা কি অস্বীকার করা যাবে?

উই ওয়ান্ট জাস্টিস। আমরা ন্যায়বিচার চাই। শিশুদের এ স্লোগান তথা দাবির সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন বা করেন এমন একজন লোকও খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। এ স্লোগান এদেশের প্রতিটি মানুষের অন্তরের কথার প্রতিধ্বনি। মানুষ ন্যায়বিচার চায়। আর একটি সমাজকে সুস্থ ও সুন্দর করতে হলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। শিশুরা এ স্লোগান উচ্চারণের মধ্য দিয়ে একটি সত্যকে তুলে ধরেছে। তা হলো, আমরা মানে ওদের অভিভাবকরা ওদেরকে নিরাপদে জীবনযাপনের মতো একটি সমাজ বা পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছি। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার ছাড়পত্র কবিতায় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন- ‘এ পৃথিবীকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি,/ নবজাতকের কাছে এই হোক আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’ তিনি অকাল প্রয়াত হয়েছেন। পৃথিবীকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য করে যাওয়ার সময় তিনি পাননি। বেঁচে থাকলে কতটা পারতেন তা এখন বলা সম্ভব নয়। তবে এটা তো অস্বীকার করা যাবে না, আমরা তার উত্তরসূরিরা কবির সে অঙ্গীকার বাস্তবায়নে শোচনীয় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছি। যে জন্য আজ আমাদের সন্তানরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলছে, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস, আমরা ন্যায় বিচার চাই।’ অন্যায়ের প্রতিবাদ করার যে সাহস আমাদের সন্তানরা এবার দেখিয়েছে, তা আমাদের আশাবাদী করে তুলেছে। যে বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলতে পারিনি, ওরাই সে বাংলাদেশ গড়বে। একাত্তরে যে সোনার বাংলার জন্য আমরা যুদ্ধ করেছিলাম, ওদের হাতেই হয়তো গড়ে উঠবে স্বপ্নের সে বাংলাদেশ। সে বাংলাদেশে কাউকে চিৎকার করে হয়তো বলতে হবে না- উই ওয়ান্ট জাস্টিস।

লেখক : সাংবাদিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads