• বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
নিজেরে কেবলই করি অপমান

সমিতি সংঘের জায়গা দখল করেছে চতুর বেনিয়া কুসিদজীবী এনজিও সমাজ

আর্ট : রাকিব

মতামত

নিজেরে কেবলই করি অপমান

  • ফাইজুস সালেহীন
  • প্রকাশিত ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবার লোক একালে খুঁজে পাওয়া কঠিন। বিষয়বুদ্ধিতে টনটনে না হলে আজকের সমাজে কল্কে পাওয়া কঠিন। সে কারণেই নিজের লাভ ছাড়া এক কদমও সরে না আমাদের। এমনকি অতিমাত্রায় বৈষয়িক হয়ে গেছে এ দেশের তথাকথিত সমাজসেবা খাতটিও। পরের ধনে পোদ্দারি এবং চুরিদারি করতে পারা লোকদের অনেকে এখন সমাজের বড় বড় খেদমতগার। দেশি-বিদেশি এবং প্রেসটিজিয়াস পুরস্কারও বাগিয়ে নিতে অসুবিধা হচ্ছে না তাদের কারো কারো। অনেকে অনেক রকম পুরস্কার পান— সাহিত্য, নাটক, অভিনয়, বিজ্ঞান, খেলাধুলাসহ নানান বিষয়ে। এসবের কোনো যোগ্যতাই যাদের নেই, অথচ পুরস্কৃত হওয়ার বাসনা যাদের প্রবল, তারা পান সমাজসেবকের পদক। কবে কোথায় কার কী সেবা তিনি করেছেন, তার কোনো হদিস না থাকলেও পুরস্কার বাগিয়ে নিতে তারা দ্বিধা করেন না। এভাবে আমরা সমাজসেবা বিষয়টিকে একটি অর্থহীন হাস্যকর উপপাদ্যে পরিণত করেছি।

অথচ সমাজসেবা বা সমাজকল্যাণের যে ধারা সেটিই কিন্তু যুগ হতে যুগান্তরে সমাজবিকাশের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে এসেছে। নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোদের একালে আমরা যতই বোকা মনে করি না কেন, এরাই কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসনামলে তিমিরাচ্ছন্ন সমাজে ঘুম ভাঙার গান শুনিয়েছেন, এরাই এনেছেন নবজাগরণ। তারাই চক্ষু উন্মীলিত করেছেন নিদ্রামগ্ন মানুষের। রাজা রামমোহন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর অথবা বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন— এরা প্রত্যেকেই আসলে তো সেই দলভুক্ত, যাদের জীবনের ব্রত ছিল নিজের সর্বস্ব দিয়ে হলেও পরের এবং সমষ্টির কল্যাণ সাধন। এরা ব্যক্তিগত পর্যায়ে এবং সংঘবদ্ধভাবে মানুষের ভালো করার কাজে ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। রাজা রামমোহনের প্রচেষ্টা ছাড়া হিন্দু নারীর সতীদাহের মতো অমানুষিক জুলুম থেকে রেহাই পাওয়া ছিল অসম্ভব। বিদ্যাসাগর পথ দেখালেন বিধবা বিবাহের। বাঙালি মুসলমান অবরোধবাসিনীর মুক্তির জানালা খুলে দিলেন বেগম রোকেয়া। এরা নমস্য, প্রাতঃস্মরণীয়। যারা পরহিতৈষী, ইতিহাস দেখেছে, ঔপনিবেশিক শাসনামলে তারা ব্যক্তিগত চেষ্টার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে নির্মাণ করেন মানবকল্যাণের প্রশস্ত পথ। ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্রতচারী ও আঞ্জুমানের মতো বিবিধ সামাজিক আন্দোলনে গ্রাম এবং শহরের অভিজাত ও অনভিজাত উভয় শ্রেণির মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদান রাখেন। ১৯০৫ সালে কলকাতায় আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পঞ্চাশ বছর আগে ১৮৫৫ সালে এদেশে সূত্রপাত ঘটে আঞ্জুমান আন্দোলনের। আঞ্জুমান মানে সমিতি। সমিতিবদ্ধ আন্দোলনের সূচনা করেন কলকাতা আদালতের কর্মচারী আল কুজ্জত ফজলুর রহমান ও মোহাম্মদ মজহার নামের দুই সমাজসেবক। ইতিহাসে বড় বড় মানুষের পাশে এই দুই প্রান্তজনের জায়গা হয়নি। তাদের নাম লুকিয়ে আছে ইতিহাসের ছিন্নপত্রে। অভিজাতের ইতিহাস তাদের নাম মনে না রাখলেও বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে তাদের এঁকে দেওয়া পথরেখাটি দৃশ্যমান ছিল গত শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত। গ্রামে গ্রামে মানুষকে সমিতিবদ্ধ দেখেছি। শিক্ষিত এবং অল্প শিক্ষিত তরুণদের দেখেছি নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে। নিজেরা মাসে মাসে চাঁদা দিয়ে ক্লাব সমিতি চালিয়েছেন। যেখানে ক্লাব, সেখানেই ছোট একটি লাইব্রেরি, সেখানেই একটা ক্রীড়াচক্র। লাইব্রেরি ও ক্রীড়াচক্রের পাশাপাশি এই সমিতিগুলো দুঃখী-দরিদ্র অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে নিজেদের যা আছে, তাই নিয়ে। কলেরা মহামারীতে এসব সমিতির সদস্যরা রাতদিন মানুষের সেবা করেছেন। এই নিঃস্বার্থ মানুষের জন্যই সমাজে সম্মানের আসনটিও পাতা ছিল। এই শ্রেণির মানুষ কখনই সরকারি অনুদানের আশায় কোনোরকম চাতুর্যের আশ্রয় গ্রহণ করেননি। রাজনীতিতেও এই শ্রেণিটি ছিল অগ্রগামী। বাংলাদেশে রাজনীতি এবং সমাজসেবা প্রায় সমার্থক ছিল। রাজনীতির পথে জনগণের সম্পদ লোপাট করে বড়লোক হওয়ার চিন্তা তাদের বেশিরভাগের মধ্যেই ছিল না।

এখন সময় বদলেছে। সমিতি সংঘের জায়গা দখল করেছে চতুর বেনিয়া কুসিদজীবী এনজিও সমাজ। এদেরই পালকসন্তান একালের সুশীল সমাজ। বিদেশি অনুদান পাওয়ার জন্য এরা দেশের দারিদ্র্য, মানুষের অসহায়ত্ব, রোগজীর্ণতা এবং যাবতীয় দুর্ভাগ্যকে জামানত হিসেবে ব্যবহার করছে। সামাজিক সমিতির নামে সরকারি নিবন্ধন নিয়ে এরা ব্যক্তির করতলগত সংস্থা বানিয়ে চলেছে। রাজনীতিও বহুলাংশে হয়ে গেছে এদের মতোই। সবাই মিলে আমরা এমন সমাজ তৈরি করতে শুরু করেছি যেখানে ইন্টেলিজেন্টদের কোনো জায়গা নেই, জায়গা ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের, যারা ধূর্ত শৃগালস্বভাবের। আজকের দিনে যে প্রশ্ন করে, যে সুলুক সন্ধান করে, যে সাদাকে সাদা বলে, কালোকে কালো— তার মতো বিপন্ন মানুষ আর নেই। সে পদে পদে প্রবঞ্চিত, অপমানিত।

প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এমন হলো! কিসের মোহে আমরা শুভবোধ জলাঞ্জলি দিয়ে আত্মনং বৃদ্ধির নিশান উড়িয়ে চলেছি। এর জন্য দায়ী একটিমাত্র বোধের একদেশদর্শিতা। সেই বোধের নাম ‘আমি’। কালে কালে  আমিত্বের বিপদ এখানে সর্বগ্রাসী হয়ে উঠতে চাইছে। সে কেটে চলেছে সর্বনাশের খাল। আমি ও আমার আপাত নিরীহ এই শব্দ দুটি বলতে এবং লিখতে যতটা সহজ, এর ভার বহন করা ততটাই কঠিন। সাবধানী না হলে এই বোধ ব্যক্তি মানুষের সর্বসত্তা গ্রাস করে নিতে পারে। মনের জমিনে জন্ম নিতে পারে প্রকাণ্ড এক বিষবৃক্ষ। এর পাতায় বিষ, ফলে বিষ, বিষাক্ত তার বাতাস। অহংকার, ঔদ্ধত্য, হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ ও আত্মপরতা— এ সবই ওই বিষবৃক্ষের জাতক। আমিত্বের কেতাবি নাম অহং। ইংরেজিতে একেই বলা হয় ইগো। অহং হতে উৎপন্ন অহংকার এমনই দুর্দমনীয় ও দুর্বিনীত যে, সে কেবলই প্রবল হতে প্রবলতর হয়ে উঠতে চায়। সীমার মধ্যে সে থাকতে চায় না। তার আরো চাই, আরো চাই। আত্মগৌরবের সীমানা বাড়িয়ে নিতে সে অবিশ্রান্ত। সমাজের ভেতরের যত অশান্তি ও অনাচার তার মূল কারণই হলো একশ্রেণির মানুষের অনিয়ন্ত্রিত আত্মপরতা। সে জন্যই আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে মানুষকে বারংবার সতর্ক করে দিয়েছেন আত্মপরতা ও অহংকার সম্পর্কে। উদ্ধত ও সীমা লঙ্ঘনকারীদের আল্লাহ পছন্দ করেন না। তিনি নিষেধ করেন দম্ভভরে জমিনে বিচরণ করতে। তিনি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেন তার জীবনের অনিত্যতার কথা। আসমান-জমিন সর্বব্যাপী তার ক্ষমতা। তিনিই মালিক জগৎসমূহের।

অনাদিকাল ধরে মহান স্রষ্টা মানুষকে ঐশী বাণীর মাধ্যমে এবং মানুষের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পথে, আমিত্বের বিপদ হতে বেঁচে থাকার উপদেশ দেন। বাইবেলে বলা হয়, ঈশ্বর অহংকারীদের প্রতিপক্ষ। কিন্তু বিনীত-নম্র যারা, তাদের তিনি অনুগ্রহ করেন। বৌদ্ধ ধর্মের গ্রন্থ ধম্মপদের একটি শ্লোকও এই প্রসঙ্গে পাঠ করা যেতে পারে। শ্লোকটি এই : ‘আমার ধন, আমার পুত্র—এইরূপ চিন্তা করে অজ্ঞ লোক দুঃখ পায়। আপনই আপনার নয়, পুত্র কিংবা ধন আপনার হয় কী প্রকারে?’

মানুষ নিশ্চিতভাবেই জানে যে, এই জগতের কোনো কিছুই তার নিজের নয়। সে নিজে যা কিছু অধিকার করে, যা কিছু ভোগ করে, তার সবই অন্য কারো, নিজের নয়। যিনি দেন তিনি মুহূর্তের মধ্যেই তা কেড়ে নিতে পারেন। কোরআন শরিফে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইতিহাসের নানা ঘটনা ও উপমা দিয়ে এই সত্য বিবৃত করেন। আসলে মানুষ তো জিম্মাদার মাত্র। নিজের জীবন, সম্পদ, ক্ষমতা, সম্মান ও মর্যাদা, জ্ঞান-গরিমা সবকিছুই তার অনুগ্রহ। মানুষ কিছুকালের জন্য জিম্মাদারি করার অধিকার লাভ করে মাত্র। জানা থাকা সত্ত্বেও মানুষ আমিত্বের মায়াজালে আচ্ছন্ন হয়ে ভুলে যায়। আমি ও আমার এই বিপজ্জনক বিবেচনা তাকে ভুলিয়ে দেয় নশ্বরতার অলঙ্ঘনীয় সত্য। নিজেকে গৌরব দান করার জন্য সে সীমা লঙ্ঘন করতে দ্বিধা করে না। এরই আরেক নাম আমিত্ব। এর মধ্য দিয়ে মানুষ প্রকৃতপক্ষে অপমানিত করে নিজের মানবিক সত্তাকে। এই আক্ষেপ আমরা দেখতে পাই রবীন্দ্রনাথের কবিতাতেও। তিনি লেখেন, ‘সকল অহংকার হে আমার /ডুবাও চোখের জলে। /নিজেরে করিতে গৌরবদান /নিজেরে কেবলই করি অপমান।’

অতঃপর প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, আমি ও আমার বোধ যদি এতই বিপজ্জনক হয়ে থাকে, তবে অভিধানে এই শব্দ দুটি বহাল তবিয়তে থাকার প্রয়োজন কী? আসলে দোষ শব্দের নয়, বরং এর মধ্যে লুকিয়ে থাকা অহংবোধটাই সমস্যা। বিনয় ও সমর্পণের জন্য আমি শব্দটি কোমল ও যথার্থ। পক্ষান্তরে এ যখন অহংকারের নামরূপ হয়ে ওঠে, তখন বিনয় ও কোমলতা নির্বাসিত হয়ে যায়। ব্যবধান অতি সূক্ষ্ম। কাজেই সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত সবারই, যাতে আমিত্বের বিপদ হতে বেঁচে থাকা যায়। আর এই বেঁচে থাকা খুবই দরকার। মানবসেবা এবং মানুষে সংঘবদ্ধতার মধ্য দিয়ে সামাজিক প্রগতির যে ধারাটি আজ বিলুপ্তপ্রায়, সেটিকে আবার কল্লোলিত করতে না পারলে, যথার্থ প্রগতির পথ কখনই খুঁজে পাওয়া যাবে না। সময় বয়ে যাচ্ছে, আরো একবার বুদ্ধির মুক্তির আন্দোলনের। তবে কেউ কি ডাক নিয়ে আসবে না নতুন রেনেসাঁর!

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সিনিয়র সাংবাদিক

e-mail : saleheenfa@gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads