• শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
চামড়া শিল্পের সম্ভাবনা

বাংলাদেশের চামড়াই বিশ্বের সেরা বলে মনে করেন চামড়া বিশেষজ্ঞরা

সংগৃহতি ছবি

মতামত

চামড়া শিল্পের সম্ভাবনা

  • প্রকাশিত ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

আবু আফজাল মোহা. সালেহ

তিন দশক আগেও আমাদের রফতানি বাণিজ্য ছিল স্বল্পসংখ্যক পণ্যের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। সে সময় রফতানি পণ্য তালিকা প্রণয়ন করতে গেলে পাট ও চায়ের পর অনিবার্যভাবে যে পণ্যটির নাম চলে আসত, তা হলো চামড়া। তবে আমাদের চামড়া খাত বাজার ধরতে পারছে না। পরিবেশ দূষণের কারণে বাংলাদেশের ট্যানারি শিল্প বৈশ্বিক সংস্থা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) মান সনদ পাচ্ছে না। বিশ্বের ৬৬টি বড় ব্র্যান্ড এর সদস্য। এলডব্লিউজির মান সনদহীন ট্যানারি থেকে তারা চামড়া কেনে না। পরিবেশ সুরক্ষা, বর্জ্য পরিশোধন, কাঁচামালের উৎস, জ্বালানি ও পানির ব্যবহার ইত্যাদি বিবেচনা করা হয় সনদের ক্ষেত্রে। বিশ্বের ৪৪০টি কারখানা এলডব্লিউজি সনদ পেয়েছে। এর মধ্যে ২৪২টি গোল্ড সনদ- ভারত ১০৫টি, চীন ৭৫টি, ব্রাজিল ৬৩টি, ইতালি ২৬টি, ভিয়েতনাম ১৪টি, পাকিস্তান ৩টি, বাংলাদেশ ১টি। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশের আয় হয় ১০৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ কম। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের চামড়া খাতের সার্বিক রফতানি আয় কমেছে। বেশ কয়েক বছর ধরে বৃদ্ধির প্রবণতার পর গত বছরই এ খাতে রফতানি আয় কমেছে। অন্যদিকে ভারত ও পাকিস্তানের রফতানি আয় ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। 

বর্তমানে রফতানি বাণিজ্যে যেসব পণ্য সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে, সেগুলো পুরোপুরি স্থানীয় কাঁচামালনির্ভর নয়। অথচ রফতানি বাণিজ্যের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে আমাদের অবশ্যই স্থানীয় কাঁচামালভিত্তিক অধিক মূল্য সংযোজনকারী পণ্য রফতানিতে মনোযোগী হতে হবে। চামড়া খাতের বৈশ্বিক সংস্থা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) নিরীক্ষিত কারখানার সংখ্যা বাংলাদেশে মাত্র একটি। ২০১৫ সালে এপেক্স ফুটওয়্যারের ট্যানারি ইউনিট এলডব্লিউজির নিরীক্ষায় সেরা মান অর্থাৎ গোল্ড কারখানার মর্যাদা পায়। এখন পর্যন্ত এপেক্স ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো কারখানা এলডব্লিউজির সনদ পায়নি। তবে বাংলাদেশে চামড়া শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনার কথা বলছেন বিশ্লেষকরা৷ বিশ্ববাজারে চামড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশে তৈরি চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের চামড়াজাত পণ্য তৈরির প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে। ফরাসিদের ফ্রেঞ্চ কাফে’র পর মানের দিক থেকে বাংলাদেশের চামড়াই বিশ্বের সেরা বলে মনে করেন চামড়া বিশেষজ্ঞরা। এ ধরনের স্মুথ গ্রেইনের চামড়া বিশ্বের অন্য কোথাও মেলে না।

রফতানি বাণিজ্য এখনো স্বল্পসংখ্যক দেশ ও সীমিত পরিমাণ পণ্যের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে রয়েছে। তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, চামড়া, হিমায়িত খাদ্য, জুট গুডস- এই পাঁচটি পণ্য থেকে আসে মোট রফতানি আয়ের ৬৫ দশমিক ৯০ শতাংশ। অন্যদিকে দেড় শতাধিক দেশে পণ্য রফতানি করা হলেও আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আসে ৮৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ রফতানি আয়। এটা মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। অন্য দেশগুলোতেও রফতানি বাড়াতে হবে। তার মানে আমাদের বিশেষ পরিকল্পনা করতে হবে। মান উন্নয়নের পাশাপাশি বাজার সম্প্রসারণেও উদ্যোগী হতে হবে।

আমাদের একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, তা হলো জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে অবশ্যই রফতানি বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে চামড়া খাত হতে পারে এক দারুণ সম্ভাবনা। চামড়া শিল্প সম্পূর্ণ স্থানীয় কাঁচামালনির্ভর এবং অন্য যে কোনো খাতের চেয়ে এ খাতের সম্ভাবনা উজ্জ্বল।

কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ চামড়ার জুতা রফতানি করছে। বাংলাদেশে আগে জুতা তৈরি হলেও তা দিয়ে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করা হতো। এখন জুতা রফতানি করা হচ্ছে। বাংলাদেশে জুতা শিল্পের বিকাশের চমৎকার সম্ভাবনা রয়েছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, আমাদের দেশে শ্রম সস্তা ও উৎপাদন খরচ অন্য দেশের তুলনায় কম। উন্নত দেশগুলোতে জুতা তৈরির মোট খরচের ৪০-৪৫ শতাংশ ব্যয় হয় শ্রমিকের মজুরি বাবদ। আমাদের দেশে তা মাত্র ৫ শতাংশের মতো। জাপানে একজন জুতা শ্রমিকের প্রতি ঘণ্টায় মজুরি ২৩ দশমিক ৬৫ ডলার। বাংলাদেশে এ হার মাত্র ০.২৩ ডলার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একজোড়া চামড়ার জুতা তৈরি করতে খরচ হয় ৩২ ডলার, যা বাংলাদেশে ১৪ ডলার। একটু উদ্যোগী আর ব্যবসায়ীরা আন্তরিক হলেই এ সুযোগ কাজে লাগানো যাবে। অবশ্য এ সুযোগ অন্য শিল্পের ক্ষেত্রেও প্রায় একই। উৎপাদন-খরচ ও আউটপুটের হারের ব্যবধান অনেক বেশি। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জুতা প্রস্তুতকারী দেশ চীন এখন বিশ্ববাজার থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছে। ফলে গার্মেন্টের মতো আমাদের দেশে এখন এ খাতের ব্যবসা খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। বিপুল সম্ভাবনাও আছে এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়ার। চীনে চামড়ার তৈরি জুতা শিল্পের উৎপাদন ধীরে ধীরে কমছে বলে সে দেশের পত্রপত্রিকা থেকে জানা যাচ্ছে। চীনের ছেড়ে দেওয়া বিশ্বের জুতার বাজারে আমাদের প্রবেশ করতে হবে। মান বাড়িয়ে বাজার ধরতে অন্যান্য শিল্পবান্ধব সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে।

চামড়া খাতকে শক্তিশালী করতে ট্যানারি কারখানার আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে হবে, চামড়া শিল্পে ব্যবহূত উপকরণের উৎপাদন বৃদ্ধি, সঠিক পদ্ধতিতে পশুর শরীর থেকে চামড়া ছাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণ, সংরক্ষণ এবং পাচার রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণসহ ইত্যাদি বিষয়ে ব্যাপক প্রচার ও সচেতনতা বাড়াতে হবে।

লেখক : উপপরিচালক (বিআরডিবি), লালমনিরহাট

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads