• বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
সিল্করুট বাস্তবায়নে চীনের উন্নয়ন ফাঁদ

দেশের বাইরে চীন প্রথম সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে আফ্রিকার জিবুতিতে

সংরক্ষিত ছবি

মতামত

সিল্করুট বাস্তবায়নে চীনের উন্নয়ন ফাঁদ

  • জি. কে. সাদিক
  • প্রকাশিত ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ভূরাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে চীন অন্য রাষ্ট্রগুলো থেকে ভিন্ন কৌশলে কাজ করছে। যেটাকে উন্নয়নের টোপ বলা যায়। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া বা ইউরোপীয় আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রগুলো অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বা বল প্রয়োগ করে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে, সেখানে চীনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার নীতি সম্পূর্ণ আলাদা। এক্ষেত্রে চীন কাজে লাগাচ্ছে মুক্ত বাণিজ্য নীতি, ঋণ প্রকল্প ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিনিয়োগ পদ্ধতিকে। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতেও চীন এই নীতি প্রয়োগ করছে। বিশেষ করে ট্রাম্প যখন একের পর এক মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি থেকে সরে যাচ্ছে এবং বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছে, তখন চীন সে স্থান দখল করছে। যুক্তরাষ্ট্রের বলয় থেকে বের হয়ে আসা রাষ্ট্রগুলো নিয়ে চীনভিত্তিক একটি বলয় গড়ে উঠছে।

সম্প্রতি সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিনিয়োগ, মুক্ত বাণিজ্য নীতি, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সরবরাহ, শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন ও তুলনামূলক সুবিধাজনক পদ্ধতিতে অস্ত্র রফতানিসহ নানা কৌশলে অপ্রতিরোধ্যভাবে চীন তার আধিপত্য বিস্তার করছে।

দেশের বাইরে চীন প্রথম সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে আফ্রিকার জিবুতিতে। এটা কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ। আফ্রিকায় প্রভাব বাড়ানো ও ২০১৩ সালে ঘোষিত ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ (স্থল ও নৌ) প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কৌশলগত কারণে জিবুতিতে চীনের উপস্থিতি দরকার। দেশটির কৌশলগত অবস্থান চীনা নৌঘাঁটি স্থাপনের অন্যতম কারণ। এটি লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খালের প্রবেশদ্বারের কাছে। দেশটি ভারত মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। এর ফলে ভারতকে ঘিরে ফেলার যে নীতি চীন নিয়েছে তা একধাপ এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে চীনের যে ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ (মুক্তার মালা) পরিকল্পনা আছে, জিবুতিও চীনের নতুন আরেক ‘স্ট্রিং অব পার্লস’। এরই ধারাবাহিকতায় চীন জিবুতির অবকাঠামো খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডেভেলপমেন্ট তাদের ২০১৮ সালের রিপোর্টে উল্লেখ করেছে যে, চীন জিবুতির অবকাঠামো উন্নয়নে ১৪০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। যা দেশটির মোট জিডিপির ৭৫ শতাংশ। একইভাবে চীন আফ্রিকার ইথিওপিয়ার অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। গত দুই দশকে চীন ইথিওপিয়ায় ৮ কোটি ৬০ লাখ ডলারের সড়ক নির্মাণ, ১ কোটি ২৭ লাখ ডলারের গোরেটা ক্রসরোড, ৮০ কোটি ডলারের ৬ লেনের হাইওয়ে নির্মাণে ব্যয় করেছে। এই বিগ-বাজেটের বিনিয়োগ শুধু ইথিওপিয়ার রাজধানীর (আদ্দিস আবাবা) উন্নয়নেই ব্যয় করেছে। এ ছাড়াও চার বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ইথিওপিয়া-জিবুতি রেলওয়ে নির্মাণ করেছে। ৬৫ দেশ নিয়ে চীনের ঘোষিত সিল্করুটের আওতায় নৌসিল্ক রুটের মাধ্যমে দেশটি আফ্রিকার জিবুতি, ইথিওপিয়া, কেনিয়া, সোমালিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে সংযুক্ত করতে চেষ্টা করছে। চীন আফ্রিকা দখলের নীতি হিসেবে আফ্রিকার দেশগুলোতে ঋণ দিচ্ছে, অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিচ্ছে এবং আফ্রিকার শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়েও কাজ করছে। এরই আওতায় ২০১৫ সালে আফ্রিকায় শান্তি মিশনে আট হাজার সৈন্য পাঠানোর ঘোষণা দেয়। আফ্রিকা জুড়ে ‘ব্লু হেলমেট’ মিশনে চীনের আড়াই হাজার সৈন্য ও পুলিশ মোতায়েন রয়েছে (দক্ষিণ সুদানে ১ হাজার ৫২ জন, লিবিয়াতে ৬৬৬ জন এবং মালিতে ৪০২ জন)। ২০১৫ সালে শি চিনপিং আফ্রিকা ইউনিয়নের সামরিক খাতে ১০ কোটি ডলার ও আফ্রিকার জন্য জাতিসংঘ শান্তি ও উন্নয়ন ফান্ডে ১০০ কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। ঋণ প্রদানে ঊর্ধ্বগতি ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক বিনিয়োগের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএফএম) আফ্রিকার দেশগুলোর ঋণ সঙ্কট চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে।

অন্যদিকে ট্রাম্প ক্ষমতায় বসার পর থেকে চীনের প্রভাব বৃদ্ধির মোক্ষম সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে এশিয়ায় বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে ১১টি দেশের সঙ্গে মিলে ‘ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ’ চুক্তি সই করা হয়। ২০১৭ সালে ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই এ চুক্তি বাতিল করে। যার ফলে চুক্তিতে সই করা ১১টি দেশের মধ্যে ৭টি দেশ এখন চীনের বাণিজ্যিক গোষ্ঠী রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপের অংশ হিসেবে কাজ করছে। একইভাবে ট্রাম্পের সংরক্ষণ নীতির ফলে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতেও চীনকে একই রকম সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। চীন এখন লাতিন আমেরিকার ১২টি দেশে ৫টি শীর্ষ রফতানিকারক দেশের তালিকায় অবস্থান করছে। শি চিনপিং ২০২৯ সালের মধ্যে লাতিন আমেরিকায় ২৫ হাজার কোটি ডলার সরাসরি বিনিয়োগ করবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। গত এক দশকে চীন এ অঞ্চলে ১৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। নাফটা চুক্তির বিষয়েও চীন একই সুযোগ নিয়েছে। যার ফলে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় চীনের প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। লাতিন আমেরিকার যে দেশগুলোতে চীন প্রভাব বিস্তার করছে সে দেশগুলো ক্রমে চীনের ঋণ ও বিনিয়োগের জালে আটকা পড়ছে।

দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোতে চীনের প্রভাব দুর্দান্ত গতিতে বাড়ছে। দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র ভারত বাদে অন্য রাষ্ট্রগুলোতে চীনের প্রভাব পুরোদমে চলছে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর নির্মাণে চীনের কাছ থেকে কোটি কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে পাকিস্তান। এ ঋণ ফেরত দিতে পারবে কি না তা নিয়ে শঙ্কার মধ্যে রয়েছে দেশটি। গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রবন্দর ৯৯ বছরের জন্য লিজ দিয়ে চীন থেকে ঋণ নেওয়ার মাশুল দিতে হচ্ছে শ্রীলঙ্কাকে। মালদ্বীপে বৈদেশিক ঋণের ৮০ শতাংশ আসে চীন থেকে। যার ফলে দেশটির উন্নয়ন ও রাজনীতি অনেকটা চীনের ইচ্ছার কাছে জিম্মি। ঋণ দেওয়া ও অবকাঠামো উন্নয়নের নামে নেপাল ও বাংলাদেশেও চীনের প্রভাব ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে।

সম্প্রতি উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ঋণ গ্রহণের শেষ গন্তব্য হচ্ছে চীন। চীন তাদের এই ঋণ গেলাচ্ছে সিল্করুট প্রকল্প বাস্তবায়নের আওতায়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট তাদের এক গবেষণায় সিল্ক রোডের আওতায় ঋণ গ্রহণকারী দেশগুলোর স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দেশগুলো হচ্ছে- পাকিস্তান, মালদ্বীপ, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, মঙ্গোলিয়া, লাওস, মন্টিনিগ্রো, জিবুতি। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১১টি দেশ (একমাত্র ফিলিপাইন বাদে) এখন চীনের প্রভাব বলয়ে রয়েছে। মিয়ানমার, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডে, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইন্দোনেশিয়াতে প্রচুর পরিমাণে চীনা ঋণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার মোট রফতানির ২৫ শতাংশ করেছে চীন। তেমনিভাবে ওশেনিয়া মহাদেশের বৃহৎ রাষ্ট্র আমেরিকার দীর্ঘ দিনের মিত্র অস্ট্রেলিয়ার মোট রফতানির ২৫ শতাংশ চীনের নিয়ন্ত্রণে। মাত্র ৭ শতাংশ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। এ মহাদেশের দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর অবস্থা একই রকম।

৬৫ দেশ নিয়ে চীন প্রায় দুই হাজার বছরের পুরনো সিল্করুট প্রকল্প বাস্তবায়নের যে মহাপরিকল্পনা নিয়েছে যদি সেটা সফলভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়, তাহলে আগামী দিনে একটি চীনকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠবে। এ প্রকল্পের রূপকার শি চিনপিং বলেছেন, ‘এটা চীনা ক্লাব নয়।’ তিনি এটাকে ‘উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ প্রকল্প বলছেন। এ পর্যন্ত চীন প্রকল্পের আওতাভুক্ত দেশগুলোতে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। সিল্করুট বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত এ ঋণ আরো বাড়বে। আর চীনের উন্নয়ন দর্শনের ফাঁদে পা দেবে অনেক দেশ।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads