• শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads

তাসমানিয়ান ডেভিল

ছবি : জুস ভিক্টোরিয়া

শারীরিক বিজ্ঞান

ক্যানসার চিকিৎসায় আশা জাগিয়েছে তাসমানিয়ান ডেভিল

  • তপু রায়হান
  • প্রকাশিত ৩০ এপ্রিল ২০১৮

বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া দ্বীপের এনডেমিক প্রাণী তাসমানিয়ান ডেভিলের একটি বড় দল খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা। আর তাদের স্বাস্থ্যবান চেহারা গবেষকদের মনে আশা জাগিয়েছে, মুখের ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে প্রাণীটি।

শুধু তাই নয়, এই আবিষ্কার ২০১২ সালে তাসমানিয়ান ডেভিলের জিন-নকশা থেকে অস্ট্রেলিয়ার গবেষকরা মানুষের ক্যানসার চিকিৎসার যে সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছিলেন, সে সম্ভাবনাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে বলে জানাচ্ছে এবিসি নিউজ।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষকরা তখন বলেছিলেন, আবিষ্কারের ফলে মানবদেহে ক্যানসারের রোগ বিস্তারের রহস্যজট খুলে যেতে পারে। দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পর কারণ হিসেবে তারা বলেন, কোনো তাসমানিয়ান ডেভিল ক্যানসারে আক্রান্ত হলে সে যদি অন্য তাসমানিয়ান ডেভিলকে কামড়ে দেয় তবে মুখ থেকে সেই ক্ষতে ক্যানসার কোষের এক্সোজোম একটি কোষ থেকে আরেক কোষে ছড়াতে পারে প্রাণঘাতী ক্যানসার।

এবিসি নিউজ বলছে, গবেষকরা সম্প্রতি দক্ষিণ-পশ্চিম তাসমানিয়ার একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে স্বাস্থ্যবান চেহারার এসব তাসমানিয়ান ডেভিলের দেখা পান।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুসারে মুখের ক্যানসারের কারণে প্রাণীটির ৮০ শতাংশই ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে।

তাসমানিয়ান ডেভিল নিয়ে সাম্প্রতিক এই অনুসন্ধানের কাজটি যৌথভাবে করেছে সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের টোলেডো চিড়িয়াখানা, সেভ দ্য তাসমানিয়ান ডেভিল প্রোগ্রাম।

গবেষকদের একটি দল র্যাক বে ও নে বে’র বুনো এলাকায় টানা আট দিন তাসমানিয়ান ডেভিলদের পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় তারা কোষ ও কলার নমুনা সংগ্রহের জন্য কিছু তাসমানিয়ান ডেভিল আটক করে পরে ছেড়ে দেন।

তারা বলছেন, সংগৃহীত এসব কোষ ও কলার নমুনা নিয়ে স্বাস্থ্যবান তাসমানিয়ান ডেভিল ও ক্যানসার আক্রান্ত তাসমানিয়ান ডেভিলদের মধ্যে শিগগিরই একটু নতুন তুলনামূলক গবেষণা শুরু করা হবে।

গবেষক দলের প্রধান ও টোলেডো চিড়িয়াখানার জীববিজ্ঞানী ড. স্যাম ফক্স বলেন, তারা প্রায় ১৪টি ভালো স্বাস্থ্যের তাসমানিয়ান ডেভিল আটক করে তাদের কলার নমুনা সংগ্রহ করেছেন।

তিনি বলেন, বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে আটক প্রাণীগুলোর মধ্যে ক্যানসারের কোনো লক্ষণই দেখা যায়নি। আর তারা অন্যান্য তাসমানিয়ান ডেভিলের তুলনায় কিছুটা ছোট হলেও স্বাস্থ্যের দিক দিয়ে অনেক ভালো অবস্থায় আছে।

এদিকে সেভ দ্য তাসমানিয়ান ডেভিল প্রোগ্রামের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ড. ডেভিড পার্মবারটন এই আবিষ্কারকে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, ফ্রেশ জেনেটিক বৈচিত্র্যের এসব তাসমানিয়ান ডেভিলে খুঁজে পাওয়া ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই করার দারুণ সুযোগ এনে দিয়েছে।

ডেভিড পার্মবারটনের মতে, এই আবিষ্কার একদিকে যেমন তাসমানিয়ান ডেভিলদের টিকে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, আরেক দিকে এটি মানুষের ক্যানসার নিয়ে চলমান গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।

তাসমানিয়ান ডেভিল

তাসমানিয়ান ডেভিল কুকুরের মতো দেখতে এক প্রকার ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী। এদের আছে ইঁদুরের মতো তীক্ষ দাঁত এবং কালো বা বাদামী মোটা পশম। তবে আকারে ছোট হলেও অন্য প্রাণীকে আক্রমণ করার ক্ষেত্রে এদের বিশেষ কৌশলের জন্য খুবই ভয়ঙ্কর প্রাণী হিসেবে দুর্নাম আছে।

তাসমানিয়ান ডেভিল মাত্র ২০ থেকে ৩১ ইঞ্চি লম্বা এবং ওজনে মাত্র ৪ থেকে ১২ কেজি পর্যন্ত হয়। এরা ৫ থেকে ৮ বছর বাঁচে।

তাসমানিয়ান ডেভিলরা নিশাচর প্রাণী। মানে এরা দিনে ঘুমায় রাতে জেগে থাকে, ঘুরে বেড়ায়, শিকার করে। শিকার করার জন্য এরা রাতে ১৬ কিমি পর্যন্ত দূরত্ব অতিক্রম করে।

বেশিরভাগ সময় এরা পাখি, সাপ, মাছ এবং পোকামাকড় খায়। প্রায়ই এরা মৃতদেহের কাছেই খাবার খেয়ে নেয়।

সাধারণত তাসমানিয়ান ডেভিল বছরে একবার মিলন করে। একবারেই ২০-৩০টা পর্যন্ত বাচ্চা দেয়। জন্মের পর বাচ্চাগুলো মায়ের থলিতে স্থান নেয়। তবে মাত্র ৪টি বাঁট থাকায় চারটি বাচ্চাই দুধ খেতে পারে এবং বড় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বাচ্চাগুলো মায়ের থলেতে চার মাস পর্যন্ত থাকে। এরপর এরা নিজেরাই খেতে পারে। তবে প্রায় ৮-৯ মাস পর্যন্ত মা ডেভিল তার পিঠে করে সন্তানদের বহন করে।

ক্যানসার চিকিৎসায় সম্ভাবনা

সেই ২০১২ সালে তাসমানিয়ান ডেভিলের জিন-নকশা থেকে দেশটির বিজ্ঞানীরা মানুষের ক্যানসার চিকিৎসায় অগ্রগতির সম্ভাবনা খুঁজে পান অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা।

সে বছর বংশগতিবিদ্যা-বিষয়ক সাময়িকী পিএলওএসে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, তাসমানিয়ান ডেভিলের জিন-নকশা গঠন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রাণীটির বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণ এর মুখের এক ধরনের টিউমার। এ রোগ দমনের উদ্যোগ না নিলে অচিরেই প্রাণীটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

ওই গবেষণায় দেখা যায়, তাসমানিয়ান ডেভিলের মুখের টিউমার খুব ধীরে ধীরে ছড়ায়। এতে বিজ্ঞানীদের গবেষণা সহজতর হয়েছে। এই প্রাণীর ক্যানসারের গঠন পর্যবেক্ষণে মানবদেহের ক্যানসার গবেষণায় অগ্রগতি হতে পারে।

সেই সময়ের গবেষক দলের প্রধান জেনি ডেকিন বলেন, এর ফলে মানবদেহের ক্যানসার সংক্রান্ত গবেষণার ক্ষেত্রে অগ্রগতির একটি সুযোগ এসে যেতে পারে। তাসমানিয়ান ডেভিলের ক্যানসার রোগের ধরন অনেকটা মানুষের ক্যানসারের মতোই।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads