• মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫
ads
বিজ্ঞান আর বাণিজ্য এক নয়, ল্যাসিক থেকে সাবধান!

চোখে ল্যাসিক করালে সাময়িক উপকার হলেও কিছু দিন পর তা চোখে আরো জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে

ছবি : ইন্টারনেট

শারীরিক বিজ্ঞান

বিজ্ঞান আর বাণিজ্য এক নয়, ল্যাসিক থেকে সাবধান!

  • আসিফ খান
  • প্রকাশিত ২৩ জুন ২০১৮

চোখের কর্নিয়ার গঠনগত সমস্যার কারণে দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হলে কর্নিয়ার সামান্য অংশ অস্ত্রোপচার করে বাদ দিয়ে মোটা টিস্যুকে পাতলা করা হয়। এতে কর্নিয়ার তল ঠিক হয়। দৃষ্টিশক্তি হয় স্বাভাবিক। আগের দিনে ছুরি-কাঁচি দিয়ে এই কাজ করা হলেও হাল আমলে এই অস্ত্রোপচার করা হয় লেসার রশ্মির মাধ্যমে। এজন্যই এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘লেজার অ্যাসিস্টেড ইন-সিটু কেরাটোমিলিউসিস’ বা ল্যাসিক। চোখের চিকিৎসায় এই পদ্ধতিটির প্রচলন শুরু হয় সেই ১৯৯০ সালে, যুক্তরাষ্ট্রে।

তবে চিকিসকরা বলছেন, সকলের চোখ এই অস্ত্রোপচারের জন্য উপযুক্ত নয়। কোন চোখের ল্যাসিক করাতে হবে তার সিদ্ধান্ত নেওয়া চিকিৎসকের দায়িত্ব। কিন্তু অনেকে সেটা না করে বাণিজ্যিক কারণেই রোগীর চোখে লেজারের অপারেশন করান। আর তাতে রোগীর চোখের ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি থাকে।

বিজ্ঞানবিষয়ক অনলাইন সাময়িকী হাউ স্টাফ ওয়ার্কের এক নিবন্ধে সম্প্রতি দাবি করা হয়েছে, চোখে ল্যাসিক করালে সাময়িক উপকার হলেও কিছু দিন পর তা চোখে আরো জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। স্থায়ীভাবে দৃষ্টিহীনও করে ফেলতে পারে রোগীকে।  ল্যাসিকে সাধারণত রিফ্র্যাক্টিভ এরর, মাইওপিয়া (দূরে কম বা ঝাপসা দেখা) হাইপেরোপিয়া (কাছের জিনিস কম দেখা) বা অ্যাস্টিগম্যাটিজমার (ঝাপসা দৃষ্টি) চিকিৎসা হয়। তবে চিকিৎসকরা বলছেন এসব সমস্যার জন্য চশমা ব্যবহার করলেই ধীরে ধীরে তা চোখের সঙ্গে মানিয়ে যায়।

কিন্তু সমস্যা হয় সেই চমশা নিয়েই। হাল আমলে ফ্যাশন সচেতন তরুণ-তরুণীরা চশমা পরতেই চায় না। আর সেই সুযোগটাই নেয় কিছু অসাধু চিকিৎসক ও চক্ষু হাসপাতাল। এই পদ্ধতিতে কর্নিয়াকে অবশ করে অপারেশন করা হয় বলে রোগী ব্যথা অনুভব করেন না। কর্নিয়ার একটি পাতলা স্তর তৈরি করে সেটি উল্টে রাখা হয়। এরপর ১৫ থেকে ৬০ সেকেন্ড লেজার প্রয়োগ করা হয়। কীভাবে কতটা সময় লেজার প্রয়োগ করা হবে সেটা পাওয়ারের ওপর নির্ভর করে এবং কম্পিউটারের সাহায্যে তা হিসাব করে নেওয়া হয়। পুরো অপারেশনে ১০ মিনিটের মতো সময় লাগে। ১৫ থেকে ৩০ মিনিট অবস্থানের পর রোগী হাসপাতাল ত্যাগ করতে পারেন। প্রথম দিন রোগী কিছুটা ঝাপসা দেখতে পারেন, কয়েক দিনের মধ্যেই রোগী অপারেশনের কার্যকারিতা বুঝতে পারেন। তবে পুরো ফল পেতে এক মাস লেগে যেতে পারে। ল্যাসিকের সময় এবং পরে রোগী দুই-তিন ঘণ্টা চোখে কিছুটা ব্যথা ও চাপ অনুভব করতে পারেন।

তবে সমস্যাটা হলো ল্যাসিকের মাধ্যমে কর্নিয়ায় যে পরিবর্তন আনা হয়, তা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই কারা ল্যাসিক করাতে পারবেন আর কারা পারবেন না সে বিষয়টি জানা থাকা জরুরি।

কলকাতা মেডিকেল কলেজের চক্ষু বিশেষজ্ঞ সৌভিক বন্দোপাধ্যায়ের মতে, যাদের বয়স ১৮ বছরের কম তাদের ল্যাসিক করানো উচিত নয়। কারণ এই বয়সের আগে চোখের পাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে। এ ছাড়া যাদের চোখের পাওয়ার প্রতিবছরই অতিমাত্রায় পরিবর্তন হচ্ছে বা স্থিতিশীল হচ্ছে না তাদের এই পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত নয়। গর্ভবতীরা অবশ্যই এই পদ্ধতি এড়িয়ে চলবেন। এ ছাড়া শারীরিক কিছু রোগ যেমন- অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, এসএলই ইত্যাদি থাকলেও ল্যাসিক করা উচিত নয় বলে মনে করেন সৌভিক।

একই প্রতিষ্ঠানের রিজিওনাল ইনস্টিটিউট ফর অপথ্যালমোলজির সহ-অধিকর্তা হিমাদ্রি দত্ত বলেন, রোগীকে সেটাই বোঝাতে হবে যে, সবার চোখ এই সার্জারির উপযুক্ত নয়। সেটা চিকিৎসকের দায়িত্ব।

তিনি মনে করেন কোনো চিকিৎসক যদি সেটা না করেন, তাতে রোগীর ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি। বাণিজ্যের দিকটি দেখতে গিয়ে অনেকে চিকিৎসক বা হাসপাতালই ল্যাসিকে প্রলুব্ধ করে। অথচ তাদের মনে রাখা উচিত বিজ্ঞান এবং বাণিজ্য দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

চক্ষু বিশেষজ্ঞ এরিক ডোনেনফিল্ড হাউ স্টাফ ওয়ার্ককে বলেন, ল্যাসিকের মাধ্যমে কর্নিয়ায় যে পরিবর্তন আনা হয়, তা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় না। অনেক সময় কিছু জটিলতাও দেখা দেয়। সূর্যের আলোয় অসুবিধা, চোখ শুকিয়ে আসা, চোখে রংধনু দেখা, কালার ভিশন কমে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে। মাঝে কিছুদিন দৃষ্টির ওঠানামা বা পাওয়ারের দ্রুত হ্রাসবৃদ্ধি ঘটতে পারে। এরকম সমস্যা হলে সেটা চিকিৎসককে জানানো উচিত বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে এ বিষয়ে ব্র্যাকের অনলাইন স্বাস্থ্যসেবার ওয়েবসাইট মায় ডটকম বলছে, ল্যাসিক অপারেশন চোখের সমস্যার জন্য চক্ষু বিশেষজ্ঞ যদি পরামর্শ দিয়ে থাকেন, তাহলে কেবল একজন বিশেষজ্ঞ দ্বারা অপারেশন করানো যেতে পারে। সব অপারেশন বা চিকিৎসারই কিছু কিছু সাইড ইফেক্ট বা চিকিৎসা পরবর্তী জটিলতা হতে পারে, তবে এটি কখনো এমন নয় যে, সবার ক্ষেত্রেই একইভাবে হবে বা নিশ্চিতভাবে হবেই। অপারেশনের পরে নিয়মিত আপনার চক্ষু বিশেষজ্ঞের ফলোআপে থাকতে হবে এবং তার পরামর্শ মেনে চলতে হবে।

ল্যাসিক সাইট সেন্টার লিমিডেটের প্রতিষ্ঠাতা ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হারুন উর রশিদ বলেন, ল্যাসিক চিকিৎসায় ব্যবহূত এক্সাইমার লেজার আমাদের চোখের একেবারে সামনে কর্নিয়ার মাঝখানের এক-চতুর্থাংশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পাতলা করে দেয়। এটি এমনই এক প্রযুক্তি যাতে চোখের বাইরে বা চোখের মধ্যেও কোনো লেন্স বসানো হয় না। গত ২০ বছর যাবৎ পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে ল্যাসিক প্রযুক্তি সফলভাবে ব্যবহূত হয়ে আসছে, আর বাংলাদেশেও এ প্রযুক্তি প্রায় ১৫ বছর যাবৎ ব্যবহূত হচ্ছে। আমাদের চোখের নেত্রস্বচ্ছের মতো এমন প্রয়োজনীয় ও স্পর্শকাতর অঙ্গের ওপর এই লেজার ছাড়া এ পর্যন্ত আর কোনো প্রযুক্তিই এত নিখুঁতভাবে অপারেশন করতে পারেনি। তাই এই এক্সাইমার লেজারের সাহায্যে যে ল্যাসিক অপারেশন করা হয় তার ফলাফল হয় তেমনি অভূতপূর্ব। ল্যাসিক করাতে হাসপাতালে থাকতে হয় না, অজ্ঞান করা হয় না, এমনকি কোনো ইনজেকশন বা ব্যান্ডেজও দিতে হয় না। শুধু ড্রপ দিয়ে চোখ অবশ করে ল্যাসিক করা হয়। অপারেশনের পরদিন চোখ দেখে কেউ বলতেও পারবে না যে অপারেশন হয়েছে।

তবে ল্যাসিক করানোর আগে কিছু বিষয়ে খেয়াল রাখার পরামর্শ দিয়েছেন হারুন উর রশিদ। তিনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক প্ররোচনার শিকার না হয়ে ভালোভাবে জেনে ল্যাসিক করানোর উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

তার পরামর্শ, ল্যাসিক সার্জারির পূর্বে সম্মতিপত্রে সই করার আগে সবকিছু ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে। ল্যাসিকের পূর্বে চোখে যে অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ ব্যবহার করতে বলা হয় তাও নিয়ম মেনে করতে হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads