• মঙ্গলবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৩ আশ্বিন ১৪২৫
ads
সময়চক্র বদলাবে গুহায় আটকা কিশোরদের!

দেহঘড়ির প্রতীকী ছবি

শারীরিক বিজ্ঞান

সময়চক্র বদলাবে গুহায় আটকা কিশোরদের!

  • তপু রায়হান
  • প্রকাশিত ০৯ জুলাই ২০১৮

সব সংশয় কাটিয়ে থাইল্যান্ডের ‘থাম লুয়াং’ গুহায় আটকে পড়া ১২ কিশোর ফুটবলার ও তাদের কোচকে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। রোববার অভিযানের প্রথম দিনে প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ সেই গুহা সুড়ঙ্গ থেকে জীবীত বের করে আনা হয়েছে চার জনকে।  সোমবার চলে দ্বিতীয় দিনের অভিযান। আশা করা হচ্ছে সবাইকে জীবিত উদ্ধার করা যাবে।  উদ্ধারকারীরা বলছেন, আটকে পড়া কিশোরদের সবার স্বাস্থ্যই ভালো আছে। কিশোররাও উদ্ধারকারীদের মাধ্যমে তাদের মা-বাবাকে চিরকুট লিখে ভালো থাকার কথা জানিয়েছে। 

তবে বিবিসির বিশেষ প্রতিনিধি লিন্ডা গেড্ডেস প্রশ্ন তুলেছেন তাদের পরবর্তী শারীরিক ক্রিয়ায় দীর্ঘ দিন অন্ধকারে থাকার কোনো প্রভাব পড়বে কিনা সেই বিষয়ে। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন- যদি তাদের উদ্ধার আরো বিলম্ব হয় তবে তাদের শরীরে কোনো ট্রমা হবে কিনা?

উদ্ধার দলে থাকা চিকিৎসকরা ট্রমার শঙ্কা উড়িয়ে দিলেও শারীরিক ক্রিয়ায় দীর্ঘ দিন অন্ধকারে থাকার কোনো প্রভাব পড়বে কিনা- সে বিষয়ে বিশেষ কিছু বলেননি তারা।

আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই কিশোররা দিনের আলোতে এসে চমকে যেতে পারে। কারণ তাদের সময়চক্র (দিন-রাত-দিন) থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। তাদের কাছে আটকা থাকার কয়েকদিন রাত বা দিন সব সমান ছিল। এই অভ্যন্তরীণ সময়চক্র ভেঙ্গে গেলে হতাশা বিষাদগ্রস্ততাসহ আরা নানা সমস্যায় পড়তে পারে তারা।

কারণ দিন বা রাত হওয়ার প্রেক্ষিতে প্রাণীর দেহ যে ধরনের আচরণ করে বা যে রকম প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা আসলে শরীরের একটি অভ্যন্তরীণ আণবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয়। এই প্রক্রিয়াকেই সার্কাডিয়ান রিদম, বডি ক্লক বা দেহঘড়ি নাম দেওয়া হয়েছে। ক্রোনোবায়োলজিক্যাল গবেষণায় দেখা গেছে, দিন ফুরিয়ে রাত নামলে বা রাত কেটে গিয়ে সকাল হলে প্রাণীর দেহ যে প্রক্রিয়ায় পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়, সেই প্রক্রিয়ায় একটি বিশেষ জিনের ভূমিকা আছে। দিন-রাতের হিসাবে গরমিল হলে শরীরেরও মানিয়ে নিতে সমস্যা হয়। বডি ক্লকের জন্য রাতের বেলা  ঘুম আসে। মানুষের মানসিক অবস্থা, সজাগ থাকা এমনকি হৃদরোগের সঙ্গেও এর যোগাযোগ আছে। 

১৯৬২ সালে মানুষের শরীরে দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকারে থাকার ওপর একটি গবেষণা হয়। ওই গবেষণায় অংশ নেন এক ফরাসী ভূতত্ত্ববিদ মিশেল সিফ্রি। ওই সময় মিশেলকে প্রায় দুই মাস অন্ধাকার প্রকষ্টে আটকে রাখা হয়। সেখানে কোনো ঘড়ি, ক্যালেণ্ডার বা সূর্যালোক দেখার কোনো সুযোগ ছিল না। তবে টেলিফোনে তিনি অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন এবং তার অনেক কর্মকাণ্ড তাদের দিয়ে ডাইরিতে লিপিবন্ধ করাতেন। এইভাবে চলতে চলতে দুই মাস শেষ হলে টেলিফোনে তাকে জানানো হয় যে দুই মাস শেষ হয়েছে। কিন্তু মিশেল তা বিশ্বাস করতে পারেন না। তার দাবি, তিনি মাত্র মাস খানেক অন্ধকার ঘরে আটকা ছিলেন। পরবর্তীতে মিশেল পৃথিবীর স্বাভাবিক সময়চক্রে আর ফিরতে পারেননি। এছাড়া তার দেহঘড়িতেও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। 

একই ভাবে থাইল্যান্ডের এই বালকদের খুঁজে পাওয়ার পর প্রশ্ন করা হয়েছিল, কত দিন তারা সেখানে আটকে আছে? কিন্তু এই প্রশ্নের সঠিক জবাব গুহায় আটকে থাকা কোনো কিশোর দিতে পারেনি। দীর্ঘদিন টানা অন্ধকারে থাকার কারণে দিন বা রাতের গণনা তারা করতে পারেনি। তাদের ঘুমের চক্রও দিনে দিনে স্থানান্তিত হয়েছে।

সার্কাডিয়ান রিদম বা দেহঘড়ি চলে মূলত সুপ্রাসিয়াসমাটিক নামের এক ধরনের মস্তিষ্ক কলার মাধ্যমে, যা চোখে পাতা পড়ার সঙ্গে অতোপ্রতোভাবে জড়িত। মানুষের চোখের রেটিনায় আলোকসংবেদি যে রড ও কোণ নামের কোষ রয়েছে- তাতে যখন প্রতিদিন আলো এসে পড়ে তা সুপ্রাসিয়াসমাটিক নামের এক ধরনের মস্তিষ্ক কলার জন্য রিসেট বা রিস্টার্ট হিসেবে কাজ করে এবং বাইরের আলো-অন্ধকারের চক্রের সঙ্গে সার্কাডিয়ান রিদমের ভারসাম্য ও সমন্বয় সাধন করে। কিন্তু দীর্ঘসময় ধরে অন্ধকারে থাকলে সুপ্রাসিয়াসমাটিক কলাও অকেজো হয়ে যায়। ফলে বাইরের সময়ের সঙ্গে নিজের সময়ের কোনো মিল থাকে না। থাইল্যান্ডের গুহায় আটকে পড়া কিশোরদের ক্ষেত্রেও এখন এমনটিই ঘটতে শুরু করেছে। তবে সবাইকে উদ্ধারের পর বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই জানা যাবে আসলে তাদের দেহঘড়ি ও সময়চক্রে কোনো পরিবর্তন আসবে কিনা। 

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads