• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads

ছবি : সংগৃহীত

পূরাকীর্তি

উয়ারী-বটেশ্বর : যেভাবে জেগে উঠল এক প্রাচীন সভ্যতা

  • জান্নাত জয়া
  • প্রকাশিত ১২ এপ্রিল ২০১৮

মেঘলা দিন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। শো শো বাতাস। ঝড় শুরু হয়েছে। চারদিক নির্জন। ধূ ধূ প্রান্তর। গ্রামের বাড়িঘরগুলো অনেক দূরে। চারদিকে ধানক্ষেত। মধ্যে মধ্যে জঙ্গল। উঁচু টিলা। এর মধ্যে একজন লোক মাটির দিকে উবু হয়ে কী যেন খুঁজছেন। একটু পর ১২-১৩ বছরের ছোট্ট একটা ছেলেকে দৌড়ে আসতে দেখা যায়। দূর থেকেই সে চিৎকার করে ডাকে, ‘বাবা, বাবা।’ লোকটি ফিরে তাকান। ছেলেটি কাছে এসে বাবার হাত ধরে বলে, ‘বাড়ি চল, বাবা, ঝড় আসছে। মা ডাকছে।’ লোকটি ছেলের হাত ধরে কাতর স্বরে বলেন, ‘হাবিব, এখানে ঘুমিয়ে আছে আমাদের প্রাচীন জনপদ। মাটি খুঁড়ে সব বের করতে হবে। জাগাতে হবে সেই সভ্যতাকে। সবাইকে জানাতে হবে।’ ছেলে হাবিবুল্লাহ পাঠান বাবা হানিফ পাঠানের হাত ধরে বলে, ‘হ্যাঁ, বাবা, সব হবে। এখন তুমি বাড়ি আসো।’

হানিফ পাঠান একজন স্কুল-শিক্ষক। তার জন্ম ১৯০১ সালে। ছোটবেলাতেই তিনি বাবা-দাদা, মুরুব্বিদের কাছে শুনেছেন এ অঞ্চলের জমিতে কাজ করতে গেলে কৃষকরা অনেক সময়ই পুরনো সব জিনিসপত্র পান। হানিফ পাঠানও কিছু মুদ্রা পেয়েছিলেন। লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে তার নেশা ছিল বিরানভূমিতে ঘুরে ঘুরে মুদ্রা খোঁজা। তার ধারণা ছিল, এখানে ঘুমিয়ে আছে এক প্রাচীন সভ্যতা। ১৯৩০ সাল থেকে তিনি সেই প্রাচীন সভ্যতা সুধী সমাজের নজরে আনার জন্য বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন। বাচ্চাদের চকলেট, টাকাপয়সা দিয়ে নিয়োগ করেন পুরনো জিনিসপত্র খুঁজতে। ১৯৩৩ সালে মাটি খনন করতে গিয়ে শ্রমিকরা একটি পাত্রে কিছু সঞ্চিত মুদ্রাভান্ডার পেয়েছিল। তাও তারা এনে দেন হানিফ পাঠানের কাছে। হানিফ পাঠান সাপ্তাহিক মোহাম্মদীতে ‘প্রাচীন মুদ্রা প্রাপ্তি’ শীর্ষক সংবাদটি ছাপেন। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে বটেশ্বর গ্রামে কৃষকরা মাটি খনন করতে গেলে দুটো লৌহপিণ্ড পান। ওই বছরের ৩০ জানুয়ারি দৈনিক আজাদ পত্রিকার রবিবাসরীয় সংখ্যায় ‘পূর্ব পাকিস্তানে প্রাগৈতিহাসিক সভ্যতা’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন হানিফ পাঠান। তখনই তিনি ধারণা করেছিলেন এ মাটিতে ঘুমিয়ে আছে প্রাচীন এক সভ্যতা। তার বয়স কত তা তিনি ধারণা করতে পারেননি। অবশেষে এই আধুনিক সময়ে এসে কিছু প্রত্ন নিদর্শনের কার্বন পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া গেছে উয়ারী-বটেশ্বরের প্রাচীন সভ্যতার বয়স প্রায় আড়াই হাজার বছর।

এভাবেই ধরতে গেলে হানিফ পাঠানের প্রায় একক প্রচেষ্টায় উয়ারী-বটেশ্বর সুধী সমাজের নজরে আসে। পরে তার সঙ্গে কাজ করেন তার ছেলে হাবিবুল্লাহ পাঠান। হাবিবুল্লাহ পাঠানও অনেক কিছু সংগ্রহ করেছেন এবং নানা সময়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে লিখেছেন। অবশেষে, এই ২০০০ খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের উদ্যোগে শুরু হয় উৎখনন। খননকাজে নেতৃত্ব দেন ওই বিভাগের প্রধান সুফি মোস্তাফিজুর রহমান, উপনেতা হিসেবে ছিলেন মিজানুর রহমান, আর পুরো খননকাজেই সক্রিয় ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থীবৃন্দ। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে নবম ধাপের উৎখনন যখন শুরু হয় তখন প্রথমবারের মতো আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা দিতে এগিয়ে আসে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

নানা গবেষণায় জানা যায়, ব্রহ্মপুত্র ও আড়িয়াল খাঁ নদের এক মিলনস্থল ছিল এখানে। এখনো সেই নদের শুকিয়ে যাওয়া রেখার ছাপ রয়ে গেছে ধানি জমির নিচে। একদিন এখান থেকে রওয়ানা হতো পালতোলা জাহাজ। মসলিন নিয়ে তারা বাণিজ্য করতে যেত বিভিন্ন বন্দরে। রোমান সাম্রাজের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল। ধারণা করা হয়, গ্রিকরা উয়ারী জনপদের কথা জানতেন। কারণ গ্রিক ভূগোলবিদ টলেমির লেখায় উল্লেখ আছে প্রাচীন ভারতবর্ষের সৌনাগড়া নামের এক স্থানের। সৌনাগড়া-সুবর্ণগ্রামই সেই প্রাচীন সোনারগাঁওয়ের বিস্তৃত চরাভূমি। উয়ারী-বটেশ্বর থেকে প্রাপ্ত বর্ণিল কাচের পুঁতি ও স্যান্ডউইচ কাচের গুটিকা থেকে এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (থাইল্যান্ড) ও ভূমধ্যসাগর অঞ্চলের (রোমান সাম্রাজ্য) বহিঃবাণিজ্যের উপর ভিত্তি করে প্রত্নতাত্ত্বিকদের অনেকেই উয়ারী-বটেশ্বরকে টলেমির উল্লিখিত ‘সৌনাগড়া’ বলে উল্লেখ করছেন।

প্রত্ন খননে এখানে পাওয়া গেছে প্রাচীন দুর্গ-নগর, বন্দর, রাস্তা, পার্শ্ব-রাস্তা, পোড়ামাটির ফলক, মূূল্যবান পাথর ও কাচের পুঁতি, মুদ্রাভান্ডারসহ উপমহাদেশের প্রাচীনতম ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা। প্রাচীন নির্দেশক দেখে বোঝা যায়, এখানে ছিল সমৃদ্ধ এক নগর। আবিষ্কৃত প্রাচীন রাস্তা দেখে  ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক দিলীপ কুমার চক্রবর্তী বলেছেন,  এত দীর্ঘ ও চওড়া রাস্তা এর আগে পুরো গাঙ্গেয় উপত্যকায় দ্বিতীয় নগরায়ণ সভ্যতায় কোথাও আবিষ্কৃত হয়নি। গাঙ্গেয় উপত্যকায় দ্বিতীয় নগরায়ণ বলতে সিন্ধু সভ্যতার পরের নগরায়ণের সময়কে বোঝায়। ফলে উয়ারী-বটেশ্বর শুধু বাংলাদেশেই নয়, সিন্ধু সভ্যতার পর ভারতবর্ষের সবচেয়ে পুরনো সভ্যতা।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads