• বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫
ads

শিল্পীর তুলিতে আঁকা বঙ্গবীর শমসের গাজী

ছবি : সংগৃহীত

ধর্ম

ত্রিপুরার প্রথম মুসলিম নবাব বঙ্গবীর শমসের গাজী মুসলিম নবাব

  • প্রকাশিত ২০ এপ্রিল ২০১৮

ইতিহাসের কিংবদন্তি, ভাটি অঞ্চলের বাঘ, ত্রিপুরা রাজ্যের প্রথম ও শেষ স্বাধীন মুসলিম নবাব ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী এবং ত্রিপুরার চাকলা রোশনাবাদের কৃষক বিদ্রোহের এক মহানায়ক শমসের গাজী। জন্ম ১৭০৬ সাল, বর্তমান ফেনী জেলার নিজকুঞ্জরা গ্রামে। পিতা পীর মুহাম্মদ মতান্তরে পেয়ার মুহাম্মদ খান এবং মাতা কৈয়্যারা বিবি। ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির আগ্রাসন প্রতিহত করতে গিয়ে শাহাদাত বরণ করেন। তিনি বঙ্গবীর, ভাটির বাঘ ও আলীবর্দি খাঁর নবাবসহ বিভিন্ন বিশেষণে বিশেষায়িত হন। নবাব সিরাজুদ্দৌলার পর শমসের গাজী ঔপনিবেশিক শক্তির হাতে প্রথম শাহাদাত বরণ করেন। শমসের গাজীর বাল্যকাল ছিল রহস্য ও বৈচিত্র্যময়। অতি অল্প বয়সে তিনি পিতৃহারা হন। বালক শমসের ছিলেন খুবই দুরন্ত স্বভাবের। একদিন মায়ের বকুনি খেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে তিনি বর্তমান ফেনী নদীর তীরে বসে কাঁদছিলেন। তখন শুভপুরের তালুকদার জগন্নাথ সেন শমসেরকে দেখতে পান। দয়াপরবশ হয়ে তিনি শমসেরকে শুভপুর নিয়ে যান। শুভপুরের তালুকদারের কোনো সন্তান ছিল না। সেখানে স্নেহ-মমতার মধ্যে বেড়ে উঠতে থাকেন শমসের গাজী। লেখাপড়ার পাশাপাশি কুস্তি, লাঠিখেলা, তীর-ধনুক চালনায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। এ ছাড়াও তিনি বিভিন্ন বিষয়ে হাতে-কলমে তালিম নিতে থাকেন। শমসের গাজী বৃহত্তর চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনী, কুমিল্লা, সিলেট ও ত্রিপুরা শাসন করেন। মগ-পর্তুগিজ জলদস্যুদের বিরুদ্ধে তিনি গড়ে তোলেন এক সুদক্ষ বাহিনী। গাজীর এই বাহিনীর সেনাপতি ছিল তার জ্ঞাতি ভাই ছাদু পালোয়ান। উপকূলীয় জনপদ থেকে বিতাড়িত করেন চোর, ডাকাত, জলদস্যু ও হার্মাদদের।

শিক্ষানুরাগী এই বীরের অন্তরে জ্ঞানপ্রদীপ জ্বালিয়ে দেন গদা হোসেন। জমিদারকন্যা দরিয়া বিবির সঙ্গে গাজীর ব্যর্থ প্রেম তার জীবনে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা। তালুকদার জগন্নাথ সেনের মৃত্যুর পর মাত্র ২২ বছর বয়সে এই রহস্য যুবক শুভপুরের খাজনা আদায় শুরু করেন। সেই থেকে তার উত্থান। ১৭৩৯ সালের দিকে ত্রিপুরার মহারাজের সেনাপতি শমসের গাজীর এলাকায় প্রবেশ করেন। গাজীর সেনাপতি ছাদু পালোয়ানের প্রতিরোধে তারা ধরাশায়ী এবং তাদের সেনাপতি বন্দি হন। ত্রিপুরা মহারাজ তার সেনাপতির মুক্তির শর্তে গাজীকে দক্ষিণশিকের বৈধ জমিদার হিসেবে স্বীকৃতি দেন। শমসের গাজী ছিলেন প্রজাদরদি। পাহাড়িয়া ঢলে ও খরায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হলে তিনি কৃষকের এক বছরের খাজনা মওকুফ করে দেন এবং পরবর্তী তিন বছর মহারাজের রাজকোষে খাজনা দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেন। এতে ত্রিপুরা মহারাজ ক্ষিপ্ত হয়ে প্রায় সাত হাজার মতান্তরে তিন হাজার সৈন্য পাঠায় গাজীকে উচ্ছেদ করার জন্য। ফল হয় বিপরীত। মহারাজের বাহিনীর শোচনীয় পরাজয় ঘটে। অন্যদিকে প্রাসাদ ছেড়ে জঙ্গলে আত্মগোপন করেন মহারাজ। ফলে ত্রিপুরা রাজ্যের বিরাট অংশ গাজীর করতলে এসে যায়। শমসের গাজীর রাজত্বকালে ত্রিপুরার রাজধানী ছিল উদয়পুর। তবে তিনি বেশিরভাগ সময় রঘুনন্দন পাহাড়ের পাদদেশে ফেনী নদীবেষ্টিত জগন্নাথ সোনাপুরস্থ চম্পকনগরে তার প্রধান কেল্লা ও রাজপ্রাসাদে থাকতে পছন্দ করতেন।

কৃষক-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই দেশপ্রেমিক বীরের জমিদারির গোড়াপত্তন। প্রজাবিদ্বেষী ত্রিপুরা রাজের সঙ্গে শুরু হয় তুমুল লড়াই। গর্জে ওঠে ভাটির বাঘ। শমসের তার বাহিনী ও ভুখানাঙা চাষাভুষাদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। হীরকডানায় ভর করে যুদ্ধক্ষেত্র দাপিয়ে বেড়ান তেজোদীপ্ত যুবক বীর শমসের গাজী। শত্রুসেনা বিনাশ করতে করতে হয়ে ওঠেন অবিনাশী যোদ্ধা, একই সঙ্গে হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য ন্যায়পরায়ণ শাসক। অধিষ্ঠিত হন রাজ-সিংহাসনে। রাজ-সিংহাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করতে কৃষক-প্রজা বিদ্রোহ, শোভাদত্ত দিঘির যুদ্ধ, খণ্ডলের যুদ্ধ, মোবারকগোনা যুদ্ধ, কুমিরা যুদ্ধ, চট্টগ্রাম বিজয়ের মধ্যদিয়ে খণ্ডল, জগৎপুর, দক্ষিণশিক, আরামরাবাদ-ফেনী, সীতাকুন্ড-চট্টগ্রাম, তিষ্ণা-চৌদ্দগ্রাম, খাঞ্জানগর, মেহেরপুর, বাগাসাইর, পার্টিকরা, বলদা খাল, কদবা, নূরনগর, গঙ্গামণ্ডল, সরাইল-কুমিল্লা, বিসালগড়-সিলেট, আটজঙ্গল, ভাটির দেশ ও শ্রীহউ-সিলেটসহ ত্রিপুরা অঞ্চল নিজের করায়ত্ত করেন বীর শমসের। তিনি ত্রিপুরার প্রথম ও একমাত্র মুসলিম নবাব পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর ত্রিপুরার ব্যাপক উন্নতি হয়। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম ছিল প্রজাদের হাতের নাগালে। খাবার পানির জন্য রাজ্যজুড়ে খনন করেন অসংখ্য দীঘি, পুকুর ও কূপ। সেকালে শিক্ষা বলতে ধর্মীয় শিক্ষাই মুখ্য ছিল। তিনি মুসলমান, হিন্দু, ব্রাহ্মণ প্রজাদের আলাদাভাবে শিক্ষাদানের জন্য মৌলভী, পণ্ডিত ও গুরুদের এনে প্রতিষ্ঠা করেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ ছাড়াও রাজ্যের চিকিৎসা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন ত্রিপুরার এই ক্ষণজন্মা বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ শাসক। তিনি ত্রিপুরা রাজ্য শাসন করেন টানা দেড় যুগ। তার কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়ে ইংরেজ বেনিয়ারা। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়।

বাংলার এমন দুর্যোগ মুহূর্তে স্থানীয় কুচক্রী মহল, বিতাড়িত পরাজিত ত্রিপুরার মহারাজ, ঢাকার নবাবের প্রতিনিধি ও ইংরেজ বেনিয়ারা একত্রিত হয় গাজীর বিরুদ্ধে। শমসের গাজীর দেশপ্রেম ও সাহসিকতা ইংরেজ এবং এ দেশীয় দালাল কুচক্রীদের ভীত করে তুলেছিল। নবাবের নামে মূলত ইংরেজরাই ষড়যন্ত্র করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত বাহিনী এবং যুবরাজ কৃষ্ণমাণিক্যের নেতৃত্বে পাহাড়ি উপজাতীয় যৌথবাহিনী শমসের গাজীর কেল্লা ও উদয়পুরে আক্রমণ চালিয়ে গাজীকে পরাজিত এবং আটক করে। তার প্রতি তাদের এতটাই আক্রোশ ছিল যে, ত্রিপুরার মহারাজ হাতিসহ হাজার হাজার সৈন্য পাঠিয়ে চম্পকনগরস্থ শমসের গাজীর প্রাসাদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেন। শুরু হয় আরেক লড়াই। নবাব চম্পকনগর যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বন্দি হলেও আবার পালিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। একদিকে তিনি অকুতোভয় বীর, প্রজাদরদি শাসক, বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, অন্যদিকে মনকাড়া বাঁশিওয়ালা। জনশ্রুতি আছে, গভীর রাতে বাঁশির সুর শুনে বেরিয়ে আসেন আত্মগোপন থেকে। পুনরায় বন্দি হন এই অকুতোভয় বীর।

অমীমাংসিত আজো এই শহীদ বীরের মৃত্যু রহস্য। ছাগলনাইয়ার চম্পকনগরে ভারতের সীমান্ত এলাকাটি শমসের গাজীর স্মৃতি বিজড়িত স্থান। এখানে রয়েছে শমসের গাজীর সুড়ঙ্গ, একখুইল্লা দীঘি, গড়খাই, কিল্লার পাড়ের ধ্বংসাবশেষ, নর্ধমা দীঘি, বুড়া সামন্তের দীঘি, কৈয়ারা দীঘি, জগন্নাথ সোনাপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ও জগন্নাথ মন্দির। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার সময় পাকিস্তান সরকার শমসের গাজীর বসতভিটা রক্ষার কোনো চেষ্টাই করেনি। ফলে নবাব বাড়ির প্রায় আশি ভাগই ভারতীয় এলাকায় থেকে গেছে। কিন্তু তার বংশধররা রয়ে গেছে বাংলাদেশ অংশে। বর্তমান ছাগলনাইয়ার জগন্নাথ সোনাপুর গ্রামের চৌধুরী বাড়িতে তাদের বসবাস।

 

অ্যাডভোকেট মো. আশ্রাফুল আলম চৌধুরী হায়দার

লেখক : আইনজীবী, সমাজকর্মী।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads