• বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads

ছবি : সংগৃহীত

ধর্ম

বরিশালের ক্যালিগ্রাফি মসজিদ

  • প্রকাশিত ২০ এপ্রিল ২০১৮

শেরে বাংলা, জীবনানন্দ আর সুফিয়া কামালের বরিশাল। ইতিহাসের বাঁকে হারিয়ে যাওয়া নয়, ইতিহাসের বুকে স্বগর্বে দণ্ডায়মান একটি শহর বরিশাল। আকাশের বুকে জেগে ওঠা বাঁকা চাঁদের মতো একটি দ্বীপ। চন্দ্রদ্বীপ ও বর্তমানের বরিশাল হাজারো ঐতিহ্য আর প্রাকৃতিক নানা ঐশ্বর্য বুকে ধারণ করে আজো জেগে আছে এবং থাকবে চিরকাল। নগরজীবনের কোলাহল পেরিয়ে, বরিশাল শহর থেকে বিশ কিংবা পঁচিশ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে উজিরপুর থানাধীন গুঠিয়া গ্রাম। প্রাকৃতিক ছায়াঘেরা পাখিডাকা সবুজ এই গ্রামেই নয়নাভিরাম স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত হয়েছে ঐতিহাসিক এক নিদর্শন। এটি হলো বায়তুল আমান জামে মসজিদ। ২০০৬ সালে নির্মিত এই স্থাপত্যকীর্তিটি কেবল বরিশালের জন্য নয়, গোটা বাংলার অহঙ্কার। গৌরবজনক ঐতিহ্য-নিদর্শন। বায়তুল আমান কেবল মাত্র একটি মসজিদ-ই নয়, সুবিশাল একটি মসজিদ কমপ্লেক্স। প্রায় ১৪ একর জমির ওপর নির্মিত হয়েছে বিশাল আয়তনের এই মসজিদ কমপ্লেক্সটি।

মসজিদ কমপ্লেক্সের প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করতেই ডান পাশে নজর কাড়বে সুদর্শন ঘাট বাঁধানো একটি পুকুর। পুকুরের চারপাশ ঘিরে লাগানো হয়েছে বাহারি গাছ এবং চলাচলের সুবিধার্থে তৈরি করা হয়েছে সুন্দর সুন্দর পথ। পথের মাঝে মাঝে আবার বসানো হয়েছে ছোট ছোট বেঞ্চি। প্রধান ফটক থেকে সোজা একটি রাস্তা গিয়ে মিলেছে বিশাল আয়তন নিয়ে নির্মিত ঈদগাহ ময়দানের সঙ্গে। ঈদগাহের বাউন্ডারি দেয়ালে শিল্পীর কোলাজ ব্যঞ্জনা নতুন আলোর এক ভুবনের সন্ধান দেবে দর্শনার্থীদের। কমপ্লেক্সের বিভিন্ন স্থানে জুড়ে রয়েছে ছোট ছোট পথ এবং নানাভাবে তা শোভিত হয়েছে। বাহারি ফুলগাছ আর নানা বৈচিত্র্যময় বনজ নন্দনকলায় শোভিত বায়তুল আমানের চারপাশ। একটি আর্কেড গেট, মসজিদ নিম্নভাগের চার কোনায় চারটি গম্বুজ, প্রবেশ তোরণ, ভেতর গাত্রে অসংখ্য ক্যালিগ্রাফি, এতিমখানা, হেলিপ্যাড, বাগান, রেস্টহাউস, কবরস্থান এবং আরো নানা স্থাপত্য-আয়োজন মিলে বায়তুল আমানের গোটা অবয়ব। সব মিলিয়ে নিপুণ হাতের অনন্য সৃষ্টি।

মসজিদ কমপ্লেক্সের আরো একটি বিষয় বেশ কৌতূহল জাগানিয়া। প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশপথে হাতের বাঁয়ে একটি স্তম্ভ চোখে পড়ে। বিশ্বের ২১টি পবিত্র স্থানের মাটি এবং জমজম কূপের পানি মিশিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই স্তম্ভটি। এটি আবেগ-আপ্লুত করে তোলে দর্শকদের। এমন একটি আনকমন স্তম্ভ নির্মাণের কারণ জিজ্ঞাসা করলে বায়তুল আমান মসজিদ কমপ্লেক্সের প্রতিষ্ঠাতা এস. সরফুদ্দিন আহমদ সান্টু বলেন, এখানে পুরনো মসজিদটি ছিল। হুজুররা বললেন স্থানটিকে সংরক্ষণ করতে হবে। পুরনো মসজিদের স্থান সংরক্ষণ করার জন্য আমি এই বিশেষ পদ্ধতিটি বেছে নিয়েছি আর এটাই হলো এই স্তম্ভ নির্মাণের মহত্ত্ব। পবিত্র স্থানকে পবিত্রতম করার প্রয়াস।

রাতের আঁধার নেমে এলেই বায়তুল আমান যেন তার আসল রূপ খুঁজে পায়। সোনালি আলোকসজ্জার মোহনীয়তায় থমকে দাঁড়ান পথিক এবং অনায়াসে নিজেকে আবিষ্কার করেন বায়তুল আমানের চারদিকে, ধীরে  ধীরে মসজিদ অভ্যন্তরে- একজন দর্শন সৌভাগ্যবান পর্যটকের বেশে। এমন একটি নির্মাণ-স্থাপনার আলোচনা করতে গিয়ে প্রাসঙ্গিকভাবেই নির্মাতার আলোচনা চলে আসে। কবিতার স্নিগ্ধ পরশে আপ্লুত হয়ে কবিকে তালাশ করেন পাঠক। সুবিশাল আয়তন এবং নান্দনিক অবয়বের এই মসজিদ কমপ্লেক্সটি নির্মাণ করেছেন দক্ষিণাঞ্চলের বিশিষ্ট সমাজসেবী ও শিল্পানুরাগী এস. সরফুদ্দিন আহমদ সান্টু।

বায়তুল আমান মসজিদ কমপ্লেক্স তা কিন্তু নয়, নানা রকম সমাজসেবা এবং উন্নয়নধর্মী কর্মকাণ্ড পরিচালনার ফলে এলাকার লোকমুখে এ যুগের ‘হাজী মুহসীন’ নামে প্রশংসিত তিনি। মজার ব্যাপার হলো, মসজিদ কমপ্লেক্সের ক্যালিগ্রাফির কাজ সম্পাদনকারী শিল্পী আরিফুর রহমানের বাড়িও বরিশালেই। কাজে নিয়োজিত সব ব্যক্তি এবং শ্রমিকদের একটি বিশাল তালিকা তৈরি করা হয়েছে। পরিশেষে একটি কথা না বললেই নয়, বিশেষ বিশেষ দিবসগুলোকে কেন্দ্র করে তরুণ-তরুণীসহ অনেক পর্যটকের এক প্রকার ডেটিংস্পট হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে বরিশালের এই চিরায়ত শিল্পিত মসজিদ প্রাঙ্গণ। এমনটাই অভিযোগ রয়েছে এলাকার লোকজনের। এমন একটি পবিত্র স্থাপনাকে ঘিরে উল্লিখিত কার্যকলাপ বন্ধ করার জন্য জোর আবেদন রইল কমপ্লেক্স পরিচালনা কর্তৃপক্ষের কাছে।

 

ওয়ালি উল্লাহ সিরাজ

লেখক : কন্ট্রিবিউটর, পথ ও পাথেয়, বাংলাদেশের খবর

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads