• বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫
ads

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

বাংলাদেশে কম্পিউটারের ৫০ বছর

  • প্রকাশিত ১৮ মার্চ ২০১৮

সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। প্রান্তিক পর্যায়ে মোবাইল, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ ও ডেস্কটপে ইন্টারনেট সংযোগের ফলে এ গতি আরো বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির প্রচার ও প্রসারের ফলে গত এক দশকে বাংলাদেশ আমূল বদলে গেছে। তবে বাংলাদেশে প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহার শুরু হয়েছে আরো পঞ্চাশ বছর আগে! আধুনিক কম্পিউটারের বিকাশ শুরু হয় ষাটের দশকের প্রথম ভাগ থেকে। সে সময় থেকেই ইউরোপ-আমেরিকায়ও কম্পিউটারের ব্যবহার ও প্রসার লাভ করতে থাকে। ঠিক একই সময়ে বাংলাদেশে কম্পিউটার ব্যবহার শুরু হয়। বাংলাদেশে প্রথম কম্পিউটার স্থাপিত হয় ১৯৬৪ সালে পরমাণু শক্তি কেন্দ্র ঢাকায়। তখন পরমাণু শক্তি কেন্দ্র ঢাকা ছিল তৎকালীন পাকিস্তান পরমাণু শক্তি কমিশনের পূর্বাঞ্চলীয় শাখা। বাংলাদেশে প্রথম কম্পিউটার ছিল আইবিএম মেইনফ্রেম ১৬২০ মডেলের।

কম্পিউটারের র্যাম ছিল মাত্র ২০ কিলোবাইট। পরে এর পরিমাণ বাড়িয়ে ৬৪ কিলোবাইট করা হয়। বাংলাদেশে স্থাপিত প্রথম কম্পিউটারে ইনপুট দিতে হতো পাঞ্চকার্ডের সাহায্যে এবং আউটপুট পাওয়া যেত পাঞ্চকার্ডে। ১৯৮২-৮৩ সালে চতুর্থ প্রজন্মের আইবিএম ৪৩৪১ মেইনফ্রেম কম্পিউটারটি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাভারে অবস্থিত পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার ইনস্টিটিউটে স্থাপন করা হয়। বাংলাদেশে দ্বিতীয় কম্পিউটারটি স্থাপিত হয় ১৯৬৫ সালে আদমজী জুট মিলে। কম্পিউটারটি ছিল আইবিএম ১৪০০ সিরিজের।

এরপর ষাটের দশকের শেষ দিকে তদানীন্তন হাবিব ব্যাংক আইবিএম ১৪০১ কম্পিউটার এবং ইউনাইটেড ব্যাংক লিমিটেড (বর্তমানে জনতা ব্যাংক) স্থাপন করে আইবিএম ১৯০১ কম্পিউটার। স্বাধীনতার পূর্বে ১৯৬৯ সালে পরিসংখ্যান ব্যুরোতে স্থাপিত হয় একটি আইবিএম ৩৬০ কম্পিউটার। ১৯৭২ সালের পর থেকে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো নামক প্রতিষ্ঠানে স্থাপিত হয় আইবিএম ৩৭০, আইবিএম ৯১০০ এবং আইবিএম ৪৩৪১ প্রভৃতি বৃহৎ কম্পিউটার। ১৯৭৮-৭৯ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম আইবিএম ৩৭০ এবং পরে আইবিএম ৪৩০০ সিরিজের কম্পিউটার স্থাপন করে।

প্রথমে বাংলাদেশে বিদেশ থেকে লাগেজে করে মাইক্রো কম্পিউটার আনা হতো ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য। সেগুলো ছিল ট্যাঁন্ডি, রেদিওশ্যাক, সিনক্লেয়ার ইত্যাদি ব্র্যান্ডের। ১৯৮৫-৮৬ সালে অ্যাপল কম্পিউটার বাংলাদেশে আসে। ১৯৮৭ সালের ১৬ মে সেই কম্পিউটার দিয়ে আনন্দপত্র নামের একটি বাংলা পত্রিকা প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশে কম্পিউটার চর্চার ইতিহাস সুদীর্ঘ হলেও এর জনপ্রিয়তার সূচনা হয় মাইক্রো কম্পিউটার বা ডেক্সটপ কম্পিউটার দিয়ে। 

৫৪ বছর আগে ১৯৬৪ সালে আইয়ুব খানের আমলে জাহাজে চড়ে বাংলাদেশে প্রথম যে কম্পিউটার এসেছিল সেটি বন্ধুরাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিল। ঢাকার আণবিক শক্তি কমিশনের দুটি বড় রুমে জায়গা মিলেছিল আইবিএম মেইনফ্রেম ১৬২০ কম্পিউটারটির। তৎকালীন যন্ত্রটির প্রধান ব্যবহার ছিল জটিল গবেষণা কাজে গাণিতিক হিসাব সম্পন্নকরণ। বিশাল আকৃতির সেই কম্পিউটারের ব্যবহার বাংলাদেশে জানতেন একজন ব্যক্তি। অ্যানালগ কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ থাকায় কম্পিউটারটি ব্যবহারের দায়িত্বও জুটেছিল তার ওপর। তিনি বাংলাদেশ অ্যাটোমিক এনার্জি কমিশনের কম্পিউটার সার্ভিস ডিভিশনের সাবেক পরিচালক পরমাণুবিজ্ঞানী হানিফউদ্দিন মিয়া।

আকারে প্রমাণসাইজের একটি ঘরের চেয়ে বড়। যন্ত্র তো দেশে এলো; কিন্তু বাধল বিপত্তি যন্ত্রের ব্যবহার নিয়ে। তৎকালীন শাসকরা পড়লেন মহাবিপদে। যুক্তরাষ্ট্রের বদান্যতায় যন্ত্র পাওয়া গেছে বটে, শেষে কি যন্ত্র চালাতেও তাদেরই শরণাপন্ন হতে হবে! কেউ কি নেই দেশে যে চালাতে পারবে ওই যন্তর-মন্তর! অনেক খোঁজাখুঁজির পর পাওয়া গেল একজনকে। তার নাম মো. হানিফউদ্দিন মিয়া।

বর্তমান ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘বাংলাদেশে কম্পিউটার আসার ৫০ বছর পূর্ণ হলো ২০১৪ সালে। সঠিক তারিখটা জানি না বলে এটিও জানি না, কবে সেটি পার হয়েছে। পরমাণু শক্তি কমিশনসহ অনেকের সঙ্গে বার বার যোগাযোগ করেও এখনো জানতে পারিনি, পরমাণু শক্তি কমিশন কোন তারিখে সেই কম্পিউটার স্থাপন করেছিল। তবে ১৯৬৪ সালে পরমাণু শক্তি কমিশনে একটি আইবিএম-১৬২০ যে স্থাপিত হয়েছিল, সে বিষয়ে কারো কোনো সন্দেহ নেই।’

৫০ বছর পরে এসে বাংলাদেশে কম্পিউটার ব্যবহার এখন কতটা বৃদ্ধি পেয়েছে?

সম্প্রতি দেশের প্রথম কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক ম্যাগাজিন মাসিক কমপিউটার জগৎ দেশে কম্পিউটার আমদানির তথ্য নিয়ে এক গবেষণার ফল প্রকাশ করেছে। কমপিউটার জগৎ গবেষণা সেল কর্তৃক তৈরিকৃত পরিসংখ্যানে জানানো হয়েছে যে, ২০১৫ সালে দেশে সর্বমোট ৬ লাখ ৮৮ হাজার ৮০০টি কম্পিউটার বাংলাদেশে আমদানি করা হয়। এগুলোর মধ্যে সর্বাধিক আমদানি করা হয় ল্যাপটপ, যা সংখ্যায় ৩ লাখ ৬২ হাজার ৮৮০টি। এ ছাড়া ব্র্যান্ড পিসি ১ লাখ ৫১ হাজার ২০০টি এবং ক্লোন পিসি ১ লাখ ৭৪ হাজার ৭২০টি আমদানি করা হয়। ২০১৬ সালে সর্বমোট ৮ লাখ ২০ হাজার কম্পিউটার আমদানি করা হয়। এগুলোর মধ্যে ল্যাপটপ ৪ লাখ ৩২ হাজারটি, ব্র্যান্ড পিসি ১ লাখ ৮০ হাজারটি এবং ক্লোন পিসি ছিল ২ লাখ ৮ হাজারটি। ২০১৭ সালে সর্বমোট ১০ লাখ ২৫ হাজারটি কম্পিউটার আমদানি করা হয়। এগুলোর মধ্যে ছিল ল্যাপটপ ৫ লাখ ৪০ হাজারটি, ব্র্যান্ড পিসি ২ লাখ ২৫ হাজারটি এবং ক্লোন পিসি ২ লাখ ৬০ হাজারটি। প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে প্রতিবছরই কম্পিউটার আমদানির প্রবৃদ্ধি হচ্ছে।

 

লেখক : এম. মিজানুর রহমান সোহেল

হেড অব অনলাইন, দৈনিক যুগান্তর

ইমেইল : mmrsohelbd¦gmail.com  

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads