• রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

খসে পড়ল এক তারা

  • চৌধুরী আফতাবুল ইসলাম
  • প্রকাশিত ২২ মার্চ ২০১৮

একটি হুইলচেয়ার আর তার মধ্যে ডান দিকে হেলানো মাথার একটি অবয়ব হয়ে উঠেছিল সম্ভবত বিশ্বের একটি সেরা আইকন। শুধু যান্ত্রিক হুইলচেয়ারটাই ঘুরত-ফিরত। ছিপছিপে রোগা শরীরটা এক রকম জড়বস্তু। ঠোঁটও নড়ত না তার। ভারী চশমার আড়ালে থাকা চোখ দুটোই ভীষণ প্রাণবন্ত। অনেক কথা, অনেক ভাবনা সেখানে অব্যক্ত ভাষা হয়ে ঘুরে বেড়াত। শরীরের ভেতরের অর্গানগুলো হয়তো ঠিকঠাক চলত। তবে বাজি রেখে বলা যায়, সবচেয়ে বেশি চলত তার মস্তিষ্ক। তা না হলে কি আর অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের পর বিশ্বের প্রধানতম বিজ্ঞানী হয়ে ওঠা সম্ভব? চলৎশক্তিহীন স্থবির এই মানুষটাই পদার্থবিজ্ঞান, গণিতে নতুন নতুন সূত্র গড়েছেন, ভেঙেছেন। চুটিয়ে করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা। ঘুরে বেড়িয়েছেন মহাবিশ্বের অলিগলি। তার এই বিস্ময়কর অভিযাত্রা কাল শেষ হলো। হ্যাঁ, চলতি সময়ের সেরা বিজ্ঞানী স্টিফেন উইলিয়াম হকিং আর আমাদের মাঝে নেই। ৭৬ বছর বয়সে মারা গেছেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই লুকাসিয়ান অধ্যাপক, যে পদে ছিলেন স্বয়ং আইজ্যাক নিউটন।

পরিবারের মুখপাত্রের বরাতে জানা গেছে, বুধবার সকালে যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজের নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহান বিজ্ঞানী। হকিংয়ের তিন সন্তান লুসি, রবার্ট ও টিম এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা ভারাক্রান্ত হূদয়ে জানাচ্ছি, আমাদের পরমতম ভালোবাসার বাবা আর নেই। তিনি একজন জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী এবং একজন অসাধারণ মানুষ ছিলেন।’ স্টিফেন হকিংয়ের ‘সাহস ও অধ্যবসায়ের’ প্রশংসা করে তার সন্তানরা বলেন, ‘বাবার প্রতিভা এবং রসবোধ সারা বিশ্বের মানুষকে অনুপ্রেরণা জোগাবে। তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’

তিনি এমন এক দিনে চলে গেলেন, যেই ৮ মার্চ জন্ম মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইনের। আর এ দিনেই পৃথিবী ছেড়েছিলেন আরেক কিংবদন্তি পদার্থবিদ গ্যালিলিও গ্যালিলি। ১৯৪২ সালের ৮ জানুয়ারি অক্সফোর্ডে জন্ম নেন স্টিফেন হকিং। বাবা ড. ফ্রাঙ্ক হকিং ছিলেন জীববিজ্ঞানের গবেষক আর মা ইসাবেলা ছিলেন রাজনৈতিক কর্মী। তারা ছিলেন চার ভাই-বোন।

পদার্থবিদ্যার ইতিহাসে অন্যতম সেরা তাত্ত্বিক হিসেবে বিবেচনা করা হয় স্টিফেন হকিংকে। খুব ছোটবেলা থেকেই হকিংয়ের আগ্রহ ছিল বিজ্ঞান আর গণিতে। তাই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু সেখানে গণিত কোর্স না থাকায় পরে পদার্থবিজ্ঞানে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। পদার্থবিজ্ঞানে হকিংয়ের আগ্রহের বিষয়গুলো ছিল অপগতিবিদ্যা, আপেক্ষিকতা, কোয়ান্টামবিদ্যা। কিন্তু মাত্র ২১ বছর বয়সে হকিং মোটর নিউরন নামে এক জটিল রোগে আক্রান্ত হন। যাকে বলা হয় অ্যামিওট্রপিক লেটারেল স্কেলরোসিস বা এএলএস। চিকিৎসক বলেছিলেন, আর মাত্র দুই বছর বাঁচবেন তিনি। কিন্তু চিকিৎসকদের ভবিষ্যদ্বাণীকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি দিব্যি টিকে ছিলেন আরো ৫৫ বছর। মোটর নিউরনে আক্রান্ত হওয়ার পর তার বাকি জীবন কাটে হুইলচেয়ারে। কথা বলেছেন যন্ত্রের সহায়তায়, কম্পিউটার স্পিক সিন্থেসাইজার ব্যবস্থায়। তবে কোনো প্রতিবন্ধকতাই তাকে দমাতে পারেনি। নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তিনি একবার বলেছিলেন, ‘আমার কোনো রোগ আছে সেটা ভাবিই না। চেষ্টা করি স্বাভাবিক জীবন কাটাতে। আমার কাজে বাধা সৃষ্টি করে এমন কোনো কিছুকেই পাত্তা দিই না।’

হকিংয়ের কাজের বেশিরভাগ জুড়েই ছিল থিওরি অব রিলেটিভিটি, কোয়ান্টাম ফিজিকস এবং অবশ্যই মহাবিশ্ব ও ব্ল্যাকহোল। ১৯৭৪ সালে তিনি ব্ল্যাকহোলের ওপর তার বিখ্যাত তত্ত্ব ‘হকিং রেডিয়েশন’ প্রকাশ করেন, যা রীতিমতো ভূমিকম্প সৃষ্টি করেছিল পদার্থবিজ্ঞানের জগতে। তবে অন্য বিজ্ঞানীদের ব্ল্যাকহোলবিষয়ক প্রশ্নে একটু বিব্রতও ছিলেন তিনি। বিভিন্ন জনের কথার পরিপ্রেক্ষিতে তারও মনে হয়েছিল হিসাবে হয়তো কোথাও ভুল হয়েছে। এক রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে হঠাৎ তার মাথায় খেলে গেল বিদ্যুতের ঝলক। উঠে বসলেন তিনি। নিজেই নিজেকে বললেন, তার তত্ত্ব ঠিকই আছে। তিনি যে বিকিরণের কথা বলছেন, সেটা আসছে ব্ল্যাকহোল থেকে। সাধারণ পদার্থবিদ্যায় এর ব্যাখ্যা মিলবে না। এর সঙ্গে লাগবে কোয়ান্টাম তত্ত্ব। এরপরই আবির্ভাব ঘটে দুই তত্ত্বের মিশেলে স্টিং তত্ত্ব। এ আবিষ্কারের কয়েক বছর আগে আইনস্টাইনের ‘থিওরি অব রিলেটিভিটি’ তত্ত্ব সমাধান করে তিনি এবং রজার পেনরোজ মিলে দেন ‘পেনরোজ হকিং সিঙ্গুলারিটি’ তত্ত্ব, যেখানে স্পেস-টাইম কিছুই নেই। আছে শুধু বিন্দু।

সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে ‘ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম’ বা কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস গ্রন্থটি হকিংকে সাধারণ বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিত করে তোলে। মহাবিশ্বের জটিল সমীকরণ সহজ ভাষায় লেখার কারণে এ বইয়ের ইংরেজি ভার্সন বিক্রি হয়েছিল এক কোটি কপি। বাংলাসহ বিশ্বের অন্যান্য ভাষায়ও এ বইয়ের অনুবাদ প্রকাশিত হয়। মহাবিশ্ব নিয়ে প্রকাশিত তার আলোচিত আরো দুটি বই ‘দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন’ এবং ‘দ্য ইউনিভার্স ইন আ নাটশেল’। তিনিই প্রথম জানিয়েছিলেন, মহাবিশ্ব আর কখনো সঙ্কুচিত হবে না। অনন্তকাল প্রসারিত হতে থাকবে। হকিং-ই বলেছিলেন টাইম ট্রাভেল সম্ভব, তবে অতীতে নয়, যাওয়া যাবে শুধু ভবিষ্যতে। তিনি বলেছিলেন, পৃথিবীতে ধেয়ে আসছে চরম বিপদ। মানবসভ্যতা বাঁচাতে শিগগির পৃথিবীর বাইরে নতুন একটা ঠিকানা খুঁজতে হবে।

১৯৭৪ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে সম্মানজনক প্রতিষ্ঠান রয়্যাল সোসাইটির ফেলো হন স্টিফেন হকিং। ১৯৭৯ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের লুকেসিয়ান প্রফেসর হন তিনি। পরে সেখান থেকে হকিং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিদ্যা ও মহাজাগতিক বিদ্যা পড়াতে যান।

২৫ বছরের বিবাহিত জীবনে তিন সন্তানের জনক হকিং। প্রথম স্ত্রী জেন হকিংয়ের সঙ্গে ১৯৯৫ সালে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় তার। ১৯৯৬ সালে নার্স এলাইন মেসনকে বিয়ে করেন তিনি।

হকিং প্রিন্স অব অস্ট্রিয়ানস, জুলিয়াস এডগার লিলিয়েনফেল্ড পুরস্কার, উলফ পুরস্কার, কোপলি পদক, এডিংটন পদক, হিউ পদক, আলবার্ট আইনস্টাইন পদকসহ এক ডজনেরও বেশি ডিগ্রি লাভ করেন। ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাকে প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম পুরস্কারে ভূষিত করেন।

শুধু বিজ্ঞানচর্চাই নয়, রাজনীতি নিয়েও সরব ছিলেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। ব্রেক্সিটেরও বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি।

মহান এই বিজ্ঞানীর মৃত্যুতে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ব্যথিত। শোক জানিয়েছেন তারা। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল, মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলা, ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের প্রতিষ্ঠাতা স্যার টিম বার্নাস-লি, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য স্টিফেন টুপিই, মার্কিন নভোচারী ক্রিস হ্যাডফিল্ডের মতো আরো অনেকেই শোক প্রকাশ করেছেন। তার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে নাসা, রয়েল সোসাইটি, দ্য প্ল্যানেটরি সোসাইটির মতো সংস্থাও।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads