• সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
কাঁদলে অশ্রু ঝরে কেন?

আনন্দে মানুষ হাসে, দুঃখে কাঁদে

ছবি : ইন্টারনেট

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

কাঁদলে অশ্রু ঝরে কেন?

  • আসিফ খান
  • প্রকাশিত ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণীর থেকে মানুষ বরাবরই আলাদা। শারীরিক গঠন, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াই তাকে দিয়েছে অনন্যতা, শ্রেষ্ঠত্ব। অন্য প্রাণী যেখানে তার মনের ভাব সরাসরি প্রকাশে ব্যর্থ, সেখানে মানুষ অবলীলায় প্রকাশ করতে পারে তার ভেতরের অনুভূতিগুলো। আনন্দে মানুষ হাসে, দুঃখে কাঁদে। এই হাসি-কান্না মানুষের সহজাত। বিশেষ করে কান্না। জন্মের পর থেকেই মানুষের সেই যে কান্নার শুরু হয়েছে, সে কান্না বড় হওয়ার পরও বিভিন্ন সময়ে ফিরে ফিরে আসে। বিস্ময়কর হলো, কান্নার সময় বেশিরভাগ মানুষেরই চোখে নামে পানির ধারা, যাকে আমরা অশ্রু বলি। কিন্তু আমরা কি জানি, কাঁদলে কেন অশ্রুধারা নামে আমাদের চোখে? এর উৎসই বা কোথায়?

বিভিন্ন গবেষণায় জানা গেছে, মানুষ ছাড়াও প্রাণিজগতের আরো কয়েকটি সদস্য কাঁঁদে। তবে আবেগে কান্নার বৈশিষ্ট্যটি মানুষের মৌলিক। মানুষই কেবল কষ্টের পাশাপাশি আনন্দেও কাঁদে। কান্না করে হতাশায়। সাধারণত বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মানুষ তার শারীরিক ও মানসিক ব্যথা প্রকাশের জন্য কাঁদে। তবে পিটাসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট ডক্টরেট লরেন বিলস্মা মনে করেন, মানুষ নিজের আবেগময় মুহূর্তে পাশের মানুষটির সমর্থন লাভের উদ্দেশ্যেও কাঁদে। যেমন বাচ্চারা মায়ের মনোযোগের উদ্দেশ্যে কাঁদে। তবে যে কারণেই মানুষ কান্না করুক না কেন, তার চোখে পানি বা অশ্রু আসে কেন?

অশ্রু আসে কেন?

বিজ্ঞানীদের মতে, অশ্রু সাধারণত অক্ষিগোলকের বাইরের ওপরের অংশে অবস্থিত ল্যাক্রিমাল গ্রন্থি থেকে উৎপন্ন হয়। গুয়েলফ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক মার্ক ফেন্সকের মতে, মস্তিষ্কের আবেগপ্রবণ অঞ্চল হাইপোথ্যালামাস ও ব্যাসাল গ্যাংগিলার সঙ্গে ব্রেইন্সটেম-এর (ল্যাক্রিমাল নিউক্লিয়াস যুক্ত থাকে। মানুষের মনে যখন যখন আবেগ উথলে ওঠে তখন ল্যাক্রিমাল গ্রন্থি অশ্রু উৎপাদন করে। উৎপাদিত অশ্রু অক্ষিগোলক ও অক্ষিপটের মাঝে পিচ্ছিল স্তরের সৃষ্টি করে।

প্রতিবার আমরা যখন চোখের পলক ফেলি তখন সেই তরলের কিছু অংশ বাইরে বেরিয়ে আসে। এটাই চোখকে ভেজা রাখে এবং চোখের শুকিয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করে। আর আমরা যখন কাঁদি তখন তরল চোখের বাইরে বেরিয়ে আসে, যাকে আমরা চোখের পানি বা অশ্রু বলি।

অশ্রু ঝরা নিয়ে আরো কয়েকটি ব্যাখ্যা আছে। তার একটি হচ্ছে- মানুষ যখন কোনো কিছু নিয়ে হতাশ হয় বা তার মধ্যে তীব্র আবেগ উৎপন্ন হয়, তখন মানুষের মস্তিষ্ক ও শরীর সেটি নিয়ে ওভাররিঅ্যাক্ট করে। সহজে বলা যায়, ওভারটাইম কাজ করে। এর ফলে মানুষের শরীরের ভেতর নানা রকম রসায়ন আর হরমোন উৎপন্ন হয়। শরীরের সেই অতিরিক্ত রাসায়নিক আর হরমোন নিঃসরণের জন্যই চোখের ভেতর দিয়ে সেটা অশ্রু হিসেবে বেরিয়ে আসে। আর এ রাসায়নিক আর হরমোনগুলো বেরিয়ে যায় বলেই কান্নার পরে মানুষ অনেক হালকা বোধ করে।

অশ্রু ঝরার আরো কারণ

আবেগের বাইরে আরেকটি কারণে মানুষের চোখে অশ্রু ঝরতে পারে। শরীরের কোনো সমস্যার কারণেও এমন হতে পারে। যেমন, অশ্রুনালি বন্ধ হয়ে গেলেও চোখে অশ্রুর প্লাবন নামতে পারে। এ ধরনের কান্নার প্রতি আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। একে বলে প্যাথলজিক্যাল কান্না। আবার কিছু কিছু রোগ যেমন- স্ট্রোক, আলঝেইমার, মাল্টিপল সেরোসিস ইত্যাদির কারণেও চোখ থেকে পানি পড়তে পারে। গবেষকরা বলেন, এ রকম অতিরিক্ত কান্নাকাটি বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ উদ্দীপনা ছাড়াও হতে পারে।

বেশি কাঁদলে মাথা ব্যথা কেন হয়?

আরেকটি তথ্য হচ্ছে, বেশিক্ষণ কাঁদলে বা বেশি অশ্রু ঝরলে মানুষের মাথা ব্যথা হয়। কিন্তু কেন এ বৈপরীত্য দেখা যায় অশ্রুপ্রবাহে? বিজ্ঞানীদের দাবি, ল্যাক্রিমালে যখন অতিরিক্ত অশ্রু উৎপাদিত হয় তখন এ অতিরিক্ত অংশ নাসারন্ধ্রের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে বাস্তবে ‘চোখের জল নাকের জল’ এক হয়ে যাওয়া ব্যাপারটা ঘটে। নাকের ভেতর দিয়ে পানিপ্রবাহের এ ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা নাকের জন্যে ভালো বলে মনে করেন। তবে অতিরিক্ত কান্নার ফলে মাথা ব্যথা হতে পারে। বিজ্ঞানীরা এর ব্যাখ্যায় দাবি করেন, অতিরিক্ত কাঁদলে অতিরিক্ত অশ্রু উৎপাদিত হয়। এর ফলে ল্যাক্রিমালে পানিশূন্যতা দেখা দেয়, যার ফলে হয় মাথা ব্যথা হয়।

অশ্রুর প্রকার

এতক্ষণ তো জানা গেলে অশ্রু কেন ঝরে। কিন্তু অশ্রু কত প্রকার হয় বা সব অশ্রু কি এক কারণেই ঝরে কিংবা সব অশ্রুর উপাদানই কি এক? না। গবেষকরা বলছেন, জৈব রাসায়নিকভাবে অশ্রু উপাদান প্রধানত তিনটি; প্রোটিন, লবণ এবং কয়েক প্রকার হরমোন, যা আমাদের লালাসদৃশ। সাধারণ দৃষ্টিতে অশ্রুকে পার্থক্য করা না গেলেও কাজের ধরন অনুযায়ী একে তিন ভাগে ভাগ করা হয়।

মৌলিক অশ্রু : ল্যাক্রিমাল থেকে এর উৎপাদন বিরতিহীনভাবে চলে। এটি অক্ষিগোলককে পিচ্ছিল করে, পুষ্টি জোগায় এবং রক্ষা করে।

প্রতিরোধী অশ্রু : বহিরাগত বস্তু যেমন বাতাস, ধোঁয়া, ধুলাবালি অথবা তীব্র আলো চোখে প্রবেশের ফলে এ ধরনের অশ্রু উৎপন্ন হয় এবং চোখকে রক্ষা করে।

আবেগময় অশ্রু : আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের উদ্দেশ্যে এ প্রকার অশ্রুর উৎপত্তি হয় এবং চোখের বাইরে ঝরতে থাকে।

তিন ধরনের অশ্রু একই উৎস থেকে উৎপন্ন হলেও তাদের রাসায়নিক উপাদানের অনুপাতে তারতম্য দেখা যায়। যেমন, আবেগময় অশ্রুতে প্রোটিনের মাত্রা বেশি থাকে। এ ছাড়া এতে লিউসিন নামক প্রাকৃতিক ব্যথানাশক, এনকেফ্যালিনও পাওয়া যায় এবং ধারণা করা হয় যে এ উপাদানগুলোর জন্যই কাঁদার পর মানসিকভাবে হালকা অনুভূত হয়।

অশ্রুর লিঙ্গভেদ

একজন স্বাভাবিক সুস্থ মানুষের ল্যাক্রিমাল গ্রন্থিতে গড়ে প্রতিদিন ১০ আউন্স অশ্রু উৎপাদিত হয়। তবে লিঙ্গভেদে এর পরিমাণের পার্থক্যও আছে। স্বাভাবিকভাবে একজন নারী একজন পুরুষ থেকে বেশি কাঁদেন। গবেষকদের দাবি, একজন নারী গড়ে একজন পুরুষের তুলনায় চারগুণ বেশি কান্না করেন। এ ছাড়া পুরুষের অশ্রুগ্রন্থির কোষ নারীদের অশ্রুগ্রন্থির কোষের তুলনায় বড়। ফলে নারীরা কাঁদলে অশ্রু খুব দ্রুত তাদের গাল বেয়ে নেমে যায়, কিন্তু পুরুষের ক্ষেত্রে জলের ধারা কিছুটা পাইপের আকার ধারণ করে ও ঝরে যেতে সময় বেশি নেয়।

বয়স বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শারীরিক অনেক পরিবর্তন হয়। ছোট থেকে বড় হওয়া, তারপর বার্ধক্য, চামড়ায় ভাঁজ, দুর্বলতা, চুলে পাক ধরা, চুল পড়ে যাওয়াসহ আরো অনেক পরিবর্তন। কিন্তু একমাত্র অক্ষিগোলকের আয়তন এবং চোখের পানি উৎপাদন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত চলে। ভূমিষ্ঠ হয়ে যেমন মানুষ কাঁদে তেমনি মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তেও চোখের কোনা বেয়ে গড়িয়ে পড়ে নোনা জলের ধারা।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads